
একটি শিশুর মৃত্যু কতবার “সর্বশেষ ঘটনা” হতে পারে, তারপরও যদি পরের সপ্তাহেই আরেকটি নতুন নাম যুক্ত হয় একই তালিকায়? পল্লবীর রামিসা থেকে নড়াইলের জান্নাতুল, টঙ্গী থেকে নাটোর— গত কয়েক মাসে বাংলাদেশজুড়ে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাপ্রবাহ এমন এক প্রশ্ন তুলে ধরেছে, যার উত্তর আইন প্রণয়নের চেয়েও গভীরে প্রোথিত— বিচারহীনতার সংস্কৃতি।
পরিসংখ্যানের আড়ালে যে বাস্তবতা
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে অন্তত ১ হাজার ৮৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮৩ জন শিশু নিহত হয়েছে, ৫৮০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পর্যবেক্ষণ আরও স্পষ্ট— তাদের ভাষায়, এসব নিষ্ঠুরতা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতিরই প্রতিফলন।
একের পর এক ঘটনা, একই প্রতিক্রিয়া
গত কয়েক মাসের ঘটনাক্রম দেখলে একটি ভয়াবহ প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মে মাসে রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়— তার মাথা ও দেহ আলাদা করে ফেলা হয়েছিল, যা সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। জুলাইয়ে গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছরের আরেক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। একই মাসে নড়াইলে শিশু জান্নাতুলকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে আদালত চত্বরে মানববন্ধন হয়। এর বাইরে নাটোর ও ঠাকুরগাঁওয়ের মতো জেলাগুলোতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে জাতীয় নারী শক্তির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
প্রতিটি ঘটনার পরই দেখা যায় একই চক্র— এলাকাবাসীর বিক্ষোভ, মানববন্ধন, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের বিবৃতি, এবং দ্রুত বিচারের দাবি।
রাজপথের ক্ষোভ ও বিকল্প বিচারের দাবি
রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি ঘোষণা দেন, যতদিন না দ্রুততম সময়ে বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হয়, ততদিন ছাত্রসমাজ রাজপথে থাকবে। জাতীয় নারী শক্তি একাধিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে ৯০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি জানিয়েছে।
এই ক্ষোভ অনেক ক্ষেত্রেই মূলধারার আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থা থেকে বিকল্প বিচারব্যবস্থার দাবিতে রূপ নিচ্ছে। একজন পরিচিত ইসলামি বক্তা সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, শিশুরাও যাদের কাছে নিরাপদ নয় তারা মানুষ নয়— এবং এ ধরনের নৃশংসতা কমানোর একমাত্র সমাধান শরিয়া আইন। বিশ্লেষকরা অবশ্য এই প্রবণতাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধিকারকর্মী তাজুল ইসলাম বলেন, মানুষ মূলত ন্যায়বিচার না পাওয়ার হতাশা থেকেই এই ধরনের বিকল্প দাবি তুলছে— তারাও প্রচলিত আইনের মাধ্যমেই বিচার চান, কিন্তু তা না পাওয়ার কারণেই দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওয়াজ জোরালো হচ্ছে।
আইনের কাঠামো: সংস্কার হচ্ছে, তবু কেন যথেষ্ট নয়
বিষয়টিকে শুধু আইনি শূন্যতা বলা যায় না— বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আইনি কাঠামোয় ধারাবাহিক সংস্কারও হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর অধীনে এরই মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত আছে, যার মূল লক্ষ্য দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। ২০২৫ সালে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনটি আরও সংশোধন করা হয়, এবং চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল-২০২৬। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, এই সংশোধনীর লক্ষ্য নারী ও শিশুর নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা সুদৃঢ় করা।
তবে আইন সংস্কার ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে যে ব্যবধান রয়ে গেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে অধিকারকর্মীদের পক্ষ থেকে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আইনি সহায়তা সংস্থা ব্লাস্ট এ বছরের মার্চে একটি বিবৃতিতে দাবি জানায়, ধর্ষণসহ সব ধরনের যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রাসঙ্গিক অধ্যাদেশগুলো (সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংশোধন অধ্যাদেশসহ) প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তরিত করা হোক। অর্থাৎ, আইন প্রণয়নের গতি নিয়েও যেখানে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, সেখানে তদন্ত ও বিচার-পরবর্তী পর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়নের ঘাটতি স্বাভাবিকভাবেই আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
এখানেই মূল সংকট নিহিত— আইনের কাঠামোগত দুর্বলতার চেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ঘাটতি। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থাকা সত্ত্বেও মামলার জট, দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তে দুর্বলতা এবং ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহে বিলম্বের মতো বাস্তব বাধা প্রতিনিয়ত আইনের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ফলে আইন যতই কঠোর হোক, তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দুর্বল থাকলে তা ভুক্তভোগীর পরিবার কিংবা সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে পারছে না।
একটি ব্যতিক্রম, তবে যথেষ্ট নয়
রামিসা হত্যা মামলায় জুন মাসে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে অভিযুক্ত দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে— মাত্র উনিশ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল থেকে রায় পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই দ্রুততা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা থাকলে দ্রুত বিচার অসম্ভব নয়। কিন্তু এটি ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়— এবং একটি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সামগ্রিক পরিসংখ্যানে যে ধারাবাহিক সহিংসতার চিত্র ফুটে উঠছে, তার সমাধান দিতে পারছে না।
মূল প্রশ্ন
শিশু নিরাপত্তার এই সংকট কোনো একক সরকার বা প্রশাসনের ব্যর্থতা নয়— এটি দীর্ঘমেয়াদী একটি প্রাতিষ্ঠানিক ফাঁক, যেখানে তদন্ত, বিচার ও শাস্তি কার্যকরের প্রতিটি ধাপে বিলম্ব সমাজের আস্থাকে ক্ষয় করে চলেছে। রামিসার মামলায় যে দ্রুততা দেখা গিয়েছিল, তা মূলত জনরোষের তীব্রতা ও গণমাধ্যমের ব্যাপক মনোযোগের ফল বলেই অনেকে মনে করেন— অর্থাৎ বিচারের গতি নির্ভর করছে ঘটনার প্রচারের মাত্রার ওপর, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ধারাবাহিকতার ওপর নয়। এই বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক, কারণ প্রতিটি শিশু নির্যাতনের ঘটনা সমান মাত্রায় জাতীয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে না— যেসব ঘটনা প্রচারমাধ্যমের নজর এড়িয়ে যায়, সেগুলোর বিচার কতটা ধীরগতিতে এগোয়, তা নিয়ে পরিসংখ্যান খুব একটা সামনে আসে না।
দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় তিনটি স্তরে মনোযোগ জরুরি বলে অধিকারকর্মীরা বারবার বলে আসছেন— তদন্তকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ফরেনসিক অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, ট্রাইব্যুনালগুলোতে জনবল ও সম্পদ বৃদ্ধি করে মামলাজট কমানো, এবং প্রতিটি মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে ভুক্তভোগী পরিবার ও জনগণের কাছে স্বচ্ছ তথ্য উপস্থাপন। এসবের যেকোনো একটির অনুপস্থিতিতে আইনি সংস্কার কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
যতক্ষণ না বিচারপ্রক্রিয়া নিয়মিতভাবে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে, ততক্ষণ প্রতিটি নতুন ঘটনা কেবল রাজপথে ক্ষোভ আর বিকল্প বিচারের দাবিকেই আরও জোরালো করবে। আর রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা যত কমবে, ততই মানুষ বিকল্প ও কখনো কখনো উশৃঙ্খল ন্যায়বিচারের দিকে ঝুঁকবে— যা দীর্ঘমেয়াদে আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর জন্যই একটি বিপজ্জনক প্রবণতা।
আপনার মতামত জানানঃ