বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের সংকট এখন আর কেবল ব্যাংক, ঋণগ্রহীতা কিংবা আমানতকারীদের সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বড় সংকট। বছরের পর বছর ধরে নানা নিয়ম, পুনঃ তফসিল, ছাড় এবং হিসাবের সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে সমস্যাটিকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সমস্যাটি কমার বদলে আরও গভীরে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত জুন শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন খেলাপি। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক খাত থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার প্রায় ৩৩ টাকাই সময়মতো ফেরত আসছে না। খেলাপি ঋণের অনুপাতের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ সারির দেশগুলোর একটি।
তবে এই সংখ্যাটিও পুরো চিত্র তুলে ধরে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, গত বছরের শেষে সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৯১ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। একই সময়ে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের সংকটাপন্ন ঋণ হিসাব করলে মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশই কোনো না কোনো ঝুঁকির মধ্যে ছিল। এক বছরে এই পরিমাণ বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
এই সংকটাপন্ন ঋণের মধ্যে শ্রেণীকৃত খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। পুনঃ তফসিল করা ঋণের অপরিশোধিত স্থিতি ছিল প্রায় ৪ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আদায় আটকে থাকা ঋণও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি হলো, এসব শ্রেণির ঋণ একসঙ্গে যোগ করে একটি মোট সংখ্যা তৈরি করা কারিগরিভাবে যথাযথ নয়। এই হিসাবপদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু যে বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তা হলো—এই প্রতিটি শ্রেণিই ব্যাংক খাতের বাস্তব ঝুঁকির প্রতিনিধিত্ব করে। পুনঃ তফসিল করা ঋণের কিস্তি যদি নিয়মিতভাবে পরিশোধ না হয়, তাহলে কাগজে সেটিকে নিয়মিত ঋণ হিসেবে দেখালেও বাস্তব ঝুঁকি তো দূর হয় না।
সমস্যাটি তাই কেবল একটি পরিসংখ্যানের নয়; বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার। ঋণ দেওয়ার সময় যেসব তথ্যের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেই তথ্যের বড় অংশই সরবরাহ করে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান। ফলে কোনো ঋণকে ভালো অবস্থায় দেখানোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ থাকলে তথ্যের উপস্থাপনেও তার প্রভাব পড়ার সুযোগ থাকে। বিচারাধীন মামলা, বিরোধ, পুনঃ তফসিলের প্রকৃত অবস্থা কিংবা ঋণের ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য সব সময় একইভাবে প্রতিফলিত হয় না।
ক্রেডিট রেটিং ব্যবস্থাতেও রয়েছে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন। যে ঋণগ্রহীতা রেটিং করাচ্ছেন, তিনিই রেটিং সংস্থার ফি পরিশোধ করেন। ফলে স্বাধীন মূল্যায়নের জায়গায় স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। বড় ঋণের ক্ষেত্রে একটি রেটিং কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল, সেই রেটিংয়ের ভিত্তিতে অনুমোদিত ঋণের কত অংশ পরে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে বিশ্লেষণ করার ব্যবস্থাও শক্তিশালী নয়।
ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়াতেও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু শাখা বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অসমানুপাতিক হারে খেলাপি ঋণ তৈরি হওয়ার ঘটনা ব্যাংক খাতে নতুন নয়। কিন্তু এমন প্রবণতা শনাক্ত হওয়ার পরও যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো সতর্কতা বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সক্রিয় না হয়, তাহলে সমস্যা আরও বড় হয়। একটি ঋণ অনুমোদনের সময় ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন, কোন তথ্যের ভিত্তিতে নিয়েছেন এবং কেন প্রচলিত সীমা অতিক্রম করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ৯০ দিনের শ্রেণীকরণ বিধি কার্যকর হয়েছে। এর ফলে আগে বিভিন্ন হিসাবগত সমন্বয় কিংবা পুনঃ তফসিলের মাধ্যমে যে ঋণগুলোকে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় দেখানো যেত, সেগুলোর প্রকৃত ঝুঁকি সামনে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে খেলাপি ঋণের অঙ্ক বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হলো এত দিন আড়ালে থাকা সমস্যার দৃশ্যমান হয়ে ওঠা।
কিন্তু এখানেই নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠনের বিধি শিথিল করেছে। নতুন ব্যবস্থায় ডাউন পেমেন্টের হার নির্ধারণে ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্ক বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। সুদ মওকুফের সুযোগ রয়েছে। পুনঃ তফসিলের মেয়াদ ১০ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৫ বছর করা হয়েছে, সঙ্গে রয়েছে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড। এমনকি হাজার কোটি টাকার বেশি এক্সপোজার থাকা বড় ঋণগ্রহীতারাও এই সুবিধার আওতায় এসেছেন।
এখানেই তৈরি হচ্ছে নীতির বড় দ্বন্দ্ব। একদিকে ৯০ দিনের শ্রেণীকরণ বিধির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ দ্রুত শনাক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে, অন্যদিকে পুনঃ তফসিলের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে ঋণকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে সামনের দরজায় যদি নিয়ম কঠোর করা হয়, কিন্তু পেছনের দরজা দিয়ে ছাড় অব্যাহত থাকে, তাহলে কাগজে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো সম্ভব হলেও প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি কমবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশ এর আগেও এমন নীতি দেখেছে। ২০১৫ ও ২০১৯ সালে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে বড় ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমানো এবং ঋণগ্রহীতাদের পুনরায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে খেলাপি ঋণের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সংকট আরও বড় হয়েছে।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো, খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিলের ক্ষেত্রে নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া হলেও ঋণ আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও প্রতিষ্ঠানগত সংস্কারের গতি তুলনামূলক ধীর। সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনের খসড়া এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়। অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর সংশোধনীও একইভাবে প্রক্রিয়াধীন। ফলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—যদি খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর হয়, কিন্তু তার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ থাকে, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রণোদনাটি কোন দিকে যাচ্ছে?
এই সংকট থেকে বের হতে হলে শুধু ব্যাংক ভেঙে পড়ার পর কীভাবে সেটিকে উদ্ধার করা হবে, সেই ব্যবস্থা থাকলেই হবে না। বরং ঋণ দেওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
এর জন্য একটি জাতীয় ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব সামনে আসতে পারে। ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ে শুধু ব্যাংকের নিজস্ব তথ্যের ওপর নির্ভর না করে কর ও ভ্যাটের রেকর্ড, ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনের প্রবাহ, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল, মোবাইল রিচার্জ, ভূমি রেজিস্ট্রি, কোম্পানি নিবন্ধন এবং অর্থঋণ আদালতের মামলার তথ্য—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।
এই ব্যবস্থায় ভালো আর্থিক রেকর্ডের ঋণগ্রহীতা সহজ শর্তে ঋণ পেতে পারেন, আর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করা যেতে পারে। এতে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত পছন্দ বা সম্পর্কের ওপর কম এবং তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর বেশি নির্ভর করবে।
তবে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করার সময় নাগরিকের গোপনীয়তা ও তথ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। একজন নাগরিকের আর্থিক স্কোর কীভাবে তৈরি হলো, কোন তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হলো এবং সেখানে ভুল থাকলে কীভাবে সংশোধন করা যাবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট আইনি অধিকার থাকতে হবে। খেলাপি ঋণ শনাক্ত করার জন্য তৈরি কোনো ডেটাবেজ যেন শেষ পর্যন্ত নাগরিক নজরদারির অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রে পরিণত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমার বাইরে যেতে হলে লিখিত ব্যতিক্রম নোট, একাধিক স্তরের অনুমোদন এবং পরিচালনা পর্ষদে প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা চালু করা প্রয়োজন। কোন শাখা, কোন কর্মকর্তা এবং কোন পরিচালকের সিদ্ধান্তে ব্যতিক্রম ঘটেছে, তার রেকর্ড সংরক্ষিত থাকলে পরবর্তী সময়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে।
মিথ্যা বা অসম্পূর্ণ ঋণতথ্য দাখিলের বিষয়টিও আলাদা করে দেখা দরকার। কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা বা অনুমোদনকারী যদি জেনেশুনে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বড় ঋণ অনুমোদন করেন, তাহলে শুধু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করলেই সব সময় যথেষ্ট জবাবদিহি তৈরি হয় না। ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে দায়বদ্ধতা যুক্ত না হলে প্রতিষ্ঠানগত জরিমানার বোঝাও শেষ পর্যন্ত আমানতকারী কিংবা ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার ওপর গিয়ে পড়তে পারে।
একইভাবে ক্রেডিট রেটিংয়ের স্বার্থের সংঘাত কমাতে বড় ঋণের ক্ষেত্রে রেটিং সংস্থা বাছাই ও ফি পরিশোধের কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রতিটি রেটিং সংস্থার পূর্ববর্তী মূল্যায়নের সঙ্গে পরবর্তী খেলাপির তথ্য প্রকাশ করা হলে বাজারও বুঝতে পারবে কোন সংস্থার মূল্যায়ন কতটা কার্যকর ছিল।
সবশেষে প্রশ্নটি কেবল খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত—সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, কেন এই ঋণগুলো তৈরি হচ্ছে এবং একই ধরনের পরিস্থিতি বারবার ফিরে আসছে কেন। ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ এক দিনে তৈরি হয়নি। হাজার হাজার ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এই বিপুল সংকট তৈরি হয়েছে। প্রতিটি ঋণের পেছনে ছিল কোনো না কোনো সিদ্ধান্ত, কোনো তথ্য, কোনো অনুমোদন এবং কোনো পর্যায়ের জবাবদিহি।
ব্যাংক খাতের সংস্কার তাই শুধু পুরোনো ক্ষত সারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নতুন করে যেন একই ক্ষত তৈরি না হয়, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ব্যাংক ভেঙে পড়ার পর রাষ্ট্র কীভাবে হস্তক্ষেপ করবে—তার আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি ব্যাংক যাতে ভেঙে পড়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ তৈরি না করে, সেই প্রতিরোধব্যবস্থাও জরুরি।
নইলে আজকের খেলাপি ঋণের হিসাব হয়তো কোনো এক সময় কাগজে কমে আসবে, কিন্তু সমস্যাটি থেকে যাবে ব্যাংকের ভেতরেই। আর কয়েক বছর পর একই প্রশ্ন আবার সামনে আসবে—ঋণ দেওয়া হয়েছিল কাকে, কেন দেওয়া হয়েছিল, কার অনুমোদনে দেওয়া হয়েছিল এবং সেই ঋণের টাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেল?
আপনার মতামত জানানঃ