রাতের শহর। চারপাশে নীরবতা, সড়কের বাতিগুলো জ্বলছে, মাঝেমধ্যে ছুটে যাচ্ছে দু-একটি যানবাহন। জীবিকার তাগিদে কেউ ফিরছেন কর্মস্থল থেকে, কেউ বের হচ্ছেন জরুরি প্রয়োজনে, আবার কেউ ভোরের বাস কিংবা ট্রেন ধরতে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নামছেন। তাঁদের সবার প্রত্যাশা, রাস্তায় বিপদে পড়লে পাশে পাবেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। কিন্তু সেই বাহিনীর সদস্যদেরই যদি রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়। খুলনায় পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশনা এমনই এক প্রশ্ন সামনে এনেছে—নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরাই যখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?
২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর রাতে খুলনা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে জারি করা একটি দাফতরিক নির্দেশনার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এর আগে ৮ অক্টোবর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে নগরীর খানজাহান আলী রোডে খুলনা কলেজিয়েট স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম। তাঁর বয়স ৪৩ বছর। হামলায় তাঁর হাতের আঙুল এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে সেটি কেটে ফেলার প্রয়োজন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। খুলনার পুলিশ সুপার ওমর ফারুক জানিয়েছেন, আহত পুলিশ কর্মকর্তা তখন শঙ্কামুক্ত ছিলেন।
একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার ওপর এমন হামলা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন পুলিশ সদস্যের জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে তা শুধু একটি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকে না; বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ, পুলিশ রাষ্ট্রের এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে বিপদের সময় সহায়তা পাওয়ার আস্থা তৈরি করে। সেই পুলিশ সদস্যই যখন সড়কে হামলার শিকার হন, তখন নাগরিকদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—একই ধরনের পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হলে তাঁর পাশে দাঁড়াবে কে?
শাহ আলমের ওপর হামলার পর খুলনা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সদস্যদের রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনাটি বিশেষভাবে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানা এলাকায় চলমান বিশেষ অভিযানের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সদস্যদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ অভিযান কিংবা অন্য দায়িত্ব পালনের সময় রাতে কোনো পুলিশ সদস্য যেন একা চলাচল না করেন, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটপ্রধানদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই নির্দেশনা কি কেবল পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, নাকি এর মধ্য দিয়ে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীরতর কোনো সংকটের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে? বিষয়টিকে একমাত্রিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই নির্দেশনার সামাজিক বার্তা এবং সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হওয়া উদ্বেগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
খুলনার আইনজীবী বাচ্চু শেখের বক্তব্যে এই উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর মতে, পুলিশকে রাতে একা চলাচলের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হলে সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভরসার জায়গা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করেও তিনি নির্দেশনাটি প্রকাশ্যে জানানোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবস্থাপনার সুযোগ ছিল; প্রকাশ্যে এমন সতর্কতা জানানোয় সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। পুলিশ সদস্যদের একা চলাচল না করার নির্দেশ মানেই এই নয় যে পুরো খুলনায় পুলিশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে কিংবা সব এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বরং নির্দেশনাটি নির্দিষ্ট নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকি কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, এমন নির্দেশনা জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। ফলে পুলিশের দায়িত্ব শুধু নিজেদের সদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিত করায় সীমাবদ্ধ নয়; পরিস্থিতি সম্পর্কে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য দেওয়া এবং নাগরিকদের আস্থা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তার প্রশ্নে নারীদের উদ্বেগ আরও গভীর। নারী নেত্রী সিলভী হারুনের বক্তব্যে উঠে এসেছে রাতের যাতায়াতের বাস্তবতা। ভোর চারটা থেকে ঢাকাগামী বাস চলাচল করে, ভোর ছয়টার ট্রেন ধরতেও অনেক মানুষকে রাতের শেষ ভাগে কিংবা ভোরের আলো ফোটার আগেই বাড়ি থেকে বের হতে হয়। এসব যাত্রীর মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশুরা থাকেন। তাঁদের অনেকের জন্য রাত বা ভোরের সময়টুকু এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। চাকরি, ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে তাঁদের পথে নামতেই হয়।
বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াতের প্রশ্নটি দীর্ঘদিনের। রাতের রাস্তায় পর্যাপ্ত আলো না থাকা, নির্জন সড়ক, গণপরিবহনের সীমিত প্রাপ্যতা, ছিনতাইয়ের ভয় এবং হয়রানির আশঙ্কা—সব মিলিয়ে অনেক নারীকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। কোথাও যাওয়ার আগে তাঁরা সময় হিসাব করেন, পরিচিত কাউকে সঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করেন, পরিবারের সদস্যদের যাত্রাপথ জানিয়ে রাখেন। নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো তাঁদের কাছে অনেক সময় স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার না হয়ে বাড়তি প্রস্তুতি ও সতর্কতার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এই বাস্তবতায় পুলিশ সদস্যদের রাতের চলাচল নিয়ে সতর্কবার্তা সাধারণ মানুষের মনে বাড়তি প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। কারণ, নাগরিকেরা আশা করেন, পুলিশের উপস্থিতি তাঁদের নিরাপত্তার অনুভূতিকে শক্তিশালী করবে। পুলিশের নিরাপত্তা ঝুঁকির খবর যখন সামনে আসে, তখন নারী, বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু কিংবা একা যাতায়াতকারী মানুষের উদ্বেগও বেড়ে যেতে পারে। তবে এই উদ্বেগের সমাধান পুলিশের নিরাপত্তা নির্দেশনা নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো নয়; বরং ঝুঁকির প্রকৃতি চিহ্নিত করে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, পুলিশ সদস্যরাও এই সমাজেরই মানুষ। তাঁরা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হলে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। একজন পুলিশ কর্মকর্তা অপরাধীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন—এই ঘটনাকে শুধু বাহিনীর ভাবমূর্তির প্রশ্ন হিসেবে দেখলে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত দুর্ভোগ আড়ালে পড়ে যায়। তাঁর চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনাও প্রয়োজন।
পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণকে তাই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কারণ নেই। বরং একটি কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থায় দুই পক্ষের নিরাপত্তাই পরস্পরের পরিপূরক। পুলিশ নিরাপদ থাকলে তারা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারে। আবার পুলিশ যদি জননিরাপত্তার ঝুঁকি চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষও নিরাপদ বোধ করেন। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সতর্কতামূলক নির্দেশনার পাশাপাশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ কিংবা পরিষ্কার তথ্যের ঘাটতি থাকে।
খুলনার পরিস্থিতিতে প্রথম প্রয়োজন হলো ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোর ধরন, সময়, স্থান এবং অপরাধীদের কার্যপদ্ধতি বিশ্লেষণ করা। রাতের কোন সড়কগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় পর্যাপ্ত আলোর অভাব রয়েছে, কোন এলাকায় নিয়মিত টহল প্রয়োজন এবং কোথায় জরুরি সহায়তা দ্রুত পৌঁছানো কঠিন—এসব বিষয় চিহ্নিত করা জরুরি। অপরাধ প্রতিরোধে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; অভিযানের ফলাফল মূল্যায়ন, গোয়েন্দা তথ্যের যথাযথ ব্যবহার এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত নজরদারিও নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকা, হাসপাতালের আশপাশ এবং রাতের বেলায় যাতায়াত বেশি হয় এমন স্থানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পুলিশের টহল যেন শুধু নির্দিষ্ট সময় বা পরিচিত স্থানে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়েও নজর দিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী দলগত টহল, দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো যেতে পারে। তবে এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা নির্ভর করবে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকির ওপর।
নাগরিকদেরও সচেতন থাকা প্রয়োজন। রাতে যাতায়াতের সময় সম্ভব হলে আলোকিত ও জনবহুল পথ ব্যবহার করা, অপরিচিত নির্জন স্থানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে না থামা, জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতি সম্পর্কে পুলিশকে জানানো সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এসব সতর্কতা কখনোই অপরাধ প্রতিরোধের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অজুহাত হতে পারে না। একজন মানুষ নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারবেন—এটি তাঁর মৌলিক প্রত্যাশা। তাঁকে সব সময় সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা মাথায় রেখে চলতে বাধ্য করা নিরাপদ সমাজের লক্ষণ নয়।
এখানে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শোনা প্রয়োজন। কোথায় অপরাধ বাড়ছে, কেন বাড়ছে এবং বিদ্যমান ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নের উত্তর তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হলে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের উচিত পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানানো, গুজব প্রতিরোধ করা এবং অপরাধ দমনে নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—অপরাধীরা কীভাবে এমন হামলা চালানোর সুযোগ পাচ্ছে? রাতের বেলায় দায়িত্ব পালনরত একজন পুলিশ কর্মকর্তার ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনা তদন্ত করে অপরাধের পেছনের কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু সতর্কবার্তা জারি করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; এমন হামলার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তবে নিরাপত্তার নামে নাগরিকদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা কোনো একটি ঘটনার ভিত্তিতে পুরো শহরকে অনিরাপদ ঘোষণা করাও যুক্তিযুক্ত নয়। বাস্তবতা বুঝতে প্রয়োজন অপরাধের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, ঘটনার তদন্ত এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য। একই সঙ্গে একটি গুরুতর হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ধরে নিয়ে উপেক্ষা করাও ভুল। কারণ, অপরাধের ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা এবং যথাসময়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই বড় ধরনের বিপর্যয় প্রতিরোধের অন্যতম উপায়।
খুলনার পুলিশ সুপার ওমর ফারুক জানিয়েছেন, পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলমের ওপর হামলার পর অন্য কর্মকর্তারা যেন একই ধরনের হামলার শিকার না হন, সে জন্য সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনরত এম এম শাকিলুজ্জামান বলেছেন, পুলিশের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে এবং এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সচেতন রয়েছে। এসব বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন। এখন প্রয়োজন সেই উদ্বেগকে এমন কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়া, যার সুফল সাধারণ মানুষও অনুভব করতে পারেন।
একটি নিরাপদ শহর মানে এমন শহর নয়, যেখানে কখনো অপরাধ ঘটে না। বরং নিরাপদ শহর হলো এমন জায়গা, যেখানে অপরাধের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা থাকে, অপরাধ ঘটলে দ্রুত সহায়তা পাওয়া যায়, অপরাধীরা আইনের আওতায় আসে এবং নাগরিকেরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে পারেন। রাতের অন্ধকারে একজন পুলিশ সদস্য কিংবা একজন সাধারণ নাগরিক—কেউই যেন অসহায় বোধ না করেন, সেটিই হওয়া উচিত নিরাপত্তাব্যবস্থার লক্ষ্য।
খুলনায় পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশ তাই কেবল একটি দাপ্তরিক চিঠির বিষয় নয়; এটি নাগরিক নিরাপত্তা, পুলিশের কর্মপরিবেশ এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পুলিশকে নিরাপদ রাখতে হবে, একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, নিরাপত্তা কোনো বিশেষ শ্রেণির মানুষের জন্য সংরক্ষিত সুবিধা নয়; এটি সবার অধিকার।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়—পুলিশ যদি রাতে একা চলাচল করতে গিয়ে হামলার ঝুঁকি অনুভব করে, তাহলে নিরুপায় সাধারণ মানুষ কোথায় আশ্রয় খুঁজবেন? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তব্য কিংবা আশ্বাসে দেওয়া সম্ভব নয়। উত্তর দিতে হবে নিরাপদ সড়ক, কার্যকর টহল, দ্রুত পুলিশি সহায়তা, অপরাধীদের বিচার এবং জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে। খুলনার রাত আবার মানুষের কাছে স্বাভাবিক ও নিরাপদ হয়ে উঠবে কি না, তা নির্ভর করবে সতর্কবার্তার পর কী ধরনের বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তার ওপর। নাগরিকেরা আতঙ্ক নয়, নিরাপত্তা চান; তাঁরা শুধু আশ্বাস নয়, এমন একটি পরিবেশ চান যেখানে রাতের পথে বের হওয়ার আগে নিজেদের অসহায় ভাবতে হবে না।
আপনার মতামত জানানঃ