কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু আমাদের সামনে এমন একটি প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একটি রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স নেই, সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এমনকি লাইসেন্স নেওয়ার জন্য সময় বেঁধে নোটিশও দেওয়া হয়েছে—তারপরও সেখানে পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার কার্যক্রম চলেছে। শেষ পর্যন্ত আগুন লেগেছে, প্রাণ গেছে ১০ জনের। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, রিসোর্টটি ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই তথ্য কি আগুন লাগার আগেই জানা ছিল না? যদি জানা থাকে, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? আর যদি ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কোথায়?
আজকের পত্রিকায় ১৭ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁর অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। গত ১১ জুন ফায়ার সার্ভিসের একজন পরিদর্শক সেখানে গিয়ে ই-ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ার জন্য ২১ দিনের সময় দিয়ে নোটিশ দেন। রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলেও সতর্ক করা হয়েছিল। তারপরও সেটির কার্যক্রম চালু ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। শনিবার সকালে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের ইনানী পাটুয়ারটেক এলাকায় রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং বেলা ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নেভানো হয়। কিন্তু আগুন নেভানোর পর যে ক্ষতি থেকে গেল, তা কোনোভাবেই সহজে পূরণ হওয়ার নয়। দশটি পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। একটি পর্যটনকেন্দ্রে বেড়াতে গিয়ে মানুষের জীবন এভাবে শেষ হয়ে যাবে, এমন বাস্তবতা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন নেই—এই তথ্য আগুন লাগার পরে আবিষ্কৃত হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগেই বিষয়টি তাদের নজরে এসেছিল। অর্থাৎ ঝুঁকি শনাক্ত করার একটি প্রক্রিয়া ছিল। পরিদর্শক সেখানে গিয়েছিলেন। নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার জন্য সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাহলে এরপর কী হয়েছিল? রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ কি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছিল? না নিয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? কর্তৃপক্ষকে কি আবার পরিদর্শন করে পরিস্থিতি যাচাই করতে হয়েছিল? রিসোর্টটি অতিথিদের জন্য নিরাপদ কি না, সেটি নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।
কোনো স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি পাওয়া গেলে শুধু একটি নোটিশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নোটিশের উদ্দেশ্য হলো সমস্যা সংশোধন করা এবং মানুষকে ঝুঁকিমুক্ত রাখা। কেউ নির্দেশনা মেনে ব্যবস্থা নিলে তা যাচাই করতে হবে। আর কেউ নির্দেশনা অমান্য করলে আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে। ঝুঁকি যদি এমন পর্যায়ে থাকে, যেখানে মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাদের আইনগত ক্ষমতা অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে অন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। কারণ একটি নোটিশ নিজে থেকে কোনো ভবনকে নিরাপদ করে না। একটি কাগজ আগুন নেভাতে পারে না, জরুরি বহির্গমনপথ তৈরি করতে পারে না, দাহ্য কাঠামোকে নিরাপদ করে না কিংবা বিপদের সময় আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে পারে না। বাস্তব পদক্ষেপই মানুষের জীবন রক্ষা করে।
বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সামনে আসে। বলা হয়, স্থাপনাটির অনুমোদন ছিল না, নিয়ম মানা হয়নি, আগে সতর্ক করা হয়েছিল অথবা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু দুর্ঘটনার আগে এসব অনিয়ম প্রতিরোধে কী করা হয়েছিল, সেটি নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম হয়। অথচ একটি কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থার সাফল্য দুর্ঘটনার পর কত দ্রুত তদন্ত করা হলো, শুধু তার ওপর নির্ভর করে না; বরং দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি কমানো গেল কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই নীতিটি আরও বেশি প্রযোজ্য। আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের কাজ হলো আগুন নিয়ন্ত্রণ, উদ্ধার এবং প্রাণহানি কমানোর চেষ্টা করা। কিন্তু তার আগে ভবন বা স্থাপনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং নিয়ম অমান্য করার বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার অংশ।
টুপটুপ রিসোর্টের ঘটনা সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এখানে কাউকে তদন্তের আগেই অপরাধী ঘোষণা করার প্রয়োজন নেই। আগুনের প্রকৃত কারণ কী, কোথা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ছিল কি না, জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা কেমন ছিল কিংবা ভবনের কাঠামো কীভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। তবে অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং আগে ঝুঁকি চিহ্নিত হওয়ার বিষয়গুলো নিজেরাই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো নিয়ে আলাদা করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার। আগুনের কারণ নির্ধারণের তদন্ত এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পর্যালোচনা—দুটিই জরুরি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিসোর্টটি ছিল তিনতলা কাঠের স্থাপনা। নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং দোতলা ও তিনতলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। কাঠসহ দাহ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি স্থাপনায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এ ধরনের ভবনে নিরাপত্তার পরিকল্পনা আরও সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন। আগুন লাগলে মানুষ কোন পথে বের হবে, সিঁড়ি ব্যবহার করা সম্ভব হবে কি না, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার ব্যবস্থা আছে কি না, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রয়েছে কি না এবং জরুরি অবস্থায় কর্মীরা কীভাবে অতিথিদের সরিয়ে নেবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা দরকার। বিশেষ করে আবাসিক রিসোর্টে রাতের বেলায় অতিথিরা ঘুমিয়ে থাকলে আগুনের ঝুঁকি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। নিরাপত্তার সামান্য ঘাটতিও তখন বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
পর্যটনশিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেশে নানা ধরনের রিসোর্ট, ইকো রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠছে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং পর্যটকদের থাকার সুযোগ দেয়। কিন্তু পর্যটন ব্যবসার প্রসার যদি নিরাপত্তার মান বজায় রেখে না হয়, তাহলে তা মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। একটি স্থাপনা দেখতে আকর্ষণীয় হলেই সেটি নিরাপদ হয়ে যায় না। প্রাকৃতিক পরিবেশে কাঠ, বাঁশ, খড় বা অন্যান্য দাহ্য উপকরণ দিয়ে নির্মিত স্থাপনা নান্দনিক হতে পারে, কিন্তু সেই নান্দনিকতার পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। ব্যবসায়িক লাভের হিসাব করতে গিয়ে নিরাপত্তাকে গৌণ করে দেখার সুযোগ নেই। পর্যটকেরা কোনো রিসোর্টে অর্থ দিয়ে শুধু একটি কক্ষ ভাড়া নেন না; তাঁরা সেখানে অবস্থানকালে নিজেদের নিরাপত্তার ওপরও আস্থা রাখেন।
এই আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন পর্যটক যখন কোনো রিসোর্টে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর পক্ষে সাধারণত বোঝা সম্ভব নয় যে ভবনটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন আছে কি না, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কার্যকর কি না কিংবা সর্বশেষ কখন নিরাপত্তা পরিদর্শন করা হয়েছে। এসব যাচাই করার দায়িত্ব ব্যক্তিগত পর্যটকের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠান পরিচালকের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে নিরাপত্তাবিধি কার্যকর রাখা। কোনো স্থাপনা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করেই পরিচালিত হলে তার ঝুঁকি শুধু মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেখানে থাকা প্রত্যেক অতিথি, কর্মচারী এবং আশপাশের মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আরও জানিয়েছেন, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় অনেক ইকো রিসোর্ট ও অন্যান্য স্থাপনা ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এসব স্থাপনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেছেন তিনি। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে রিসোর্ট পরিচালকদের সতর্ক করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। এই বক্তব্য পরিস্থিতির ব্যাপকতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় একই ধরনের অনিয়ম থেকে থাকে, তাহলে শুধু একটি রিসোর্টের ঘটনা তদন্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। বরং পুরো ব্যবস্থার ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে। কোথায় কতটি স্থাপনা প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন ছাড়া চলছে, কোন প্রতিষ্ঠানগুলো আগে সতর্কবার্তা পেয়েও ব্যবস্থা নেয়নি এবং কোন স্থাপনায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে—এসব তথ্য সংগ্রহ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও অত্যন্ত জরুরি। একটি রিসোর্টের কার্যক্রমের সঙ্গে একাধিক অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জড়িত থাকতে পারে। তাই কোনো একটি সংস্থার সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে অন্য সংস্থার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। যে সংস্থার যে দায়িত্ব, তাকে সেটি পালন করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করার পর তার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা, প্রয়োজনীয় সংশোধন হয়েছে কি না যাচাই করা এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বের বিভাজন স্পষ্ট থাকা দরকার। কোথাও দায়িত্ব নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে সেটিও দূর করতে হবে। মানুষের জীবন রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শুধু লাইসেন্স থাকাই কি যথেষ্ট? অবশ্যই নয়। লাইসেন্স প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু কাগজে অনুমোদন থাকলেই কোনো স্থাপনা চিরদিন নিরাপদ থাকে না। ভবনের ব্যবহার পরিবর্তন হতে পারে, নতুন কক্ষ তৈরি হতে পারে, বৈদ্যুতিক সংযোগে পরিবর্তন আসতে পারে কিংবা অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই নিয়মিত পরিদর্শন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তার নিয়ম কেবল অনুমোদন পাওয়ার সময় মানলেই চলবে না; পুরো কার্যক্রম চলাকালীন তা বজায় রাখতে হবে। আগুন লাগলে কী করতে হবে, অতিথিদের কীভাবে বের করে আনতে হবে এবং জরুরি সেবাকে কীভাবে দ্রুত খবর দিতে হবে—এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
কক্সবাজারের এই অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের স্টেশনসংকটের বিষয়টিও সামনে এসেছে। মহাপরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫৩৮টি ফায়ার স্টেশন রয়েছে এবং আরও ১৩০টি স্টেশন নির্মাণের প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিকটবর্তী ফায়ার স্টেশন থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রায় ২২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। এই তথ্য জরুরি সেবার সক্ষমতা, অবস্থান এবং পর্যটন এলাকায় দ্রুত পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে দূরত্বের বিষয়টি তদন্তের বিকল্প নয়; আগুনের বিস্তার, উদ্ধারকাজের সময় এবং প্রাণহানির সঙ্গে এর সম্পর্ক নির্ধারণ করতে তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যটন এলাকায় ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী জরুরি সেবার পরিকল্পনা সাজানো দরকার, যাতে দুর্ঘটনার সময় দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়।
সবশেষে, এই ঘটনার জবাব শুধু একটি তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে শেষ করা উচিত নয়। তদন্তে আগুনের কারণ নির্ধারণ করতে হবে, প্রাণহানির পেছনে কোনো নিরাপত্তাগত ঘাটতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে এবং আগে দেওয়া নোটিশের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল তারও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য পর্যটন স্থাপনার অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই করে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এসব পদক্ষেপের অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করাও জরুরি।
দশটি প্রাণ হারানোর পর আমরা যেন শুধু শোক প্রকাশ করে পরবর্তী ঘটনার অপেক্ষায় না থাকি। আগুন লাগার পর উদ্ধারকাজ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও ভালো হলো এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে আগুন লাগার ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা যায় এবং মানুষকে বিপদের মুখে পড়তে না হয়। ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেই—এমন একটি তথ্য যদি আগেই জানা থাকে, তাহলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত প্রশাসনিক দায়িত্বের মূল কথা। নিরাপত্তার নিয়ম ভাঙার পর শুধু সতর্কবার্তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না, বিশেষ করে যখন সেখানে প্রতিদিন মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা জড়িত। মানুষের জীবন কোনো নোটিশের মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে পারে না। একটি দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তা নয়, দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কার্যকর প্রতিরোধ নিশ্চিত করার মধ্যেই দায়িত্বশীল প্রশাসনের পরিচয়। কক্সবাজারের এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে যদি সেই শিক্ষা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে একই প্রশ্ন আবারও উঠবে—আগুন লাগার আগে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কোথায় ছিলেন?
আপনার মতামত জানানঃ