
সন্ধ্যায় গ্রন্থাগার থেকে ফেরা, হাসপাতালে স্বজনের কাছে যাওয়া, টিউশনি শেষে বাস ধরা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ হাঁটা—শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন জীবন শুধু শ্রেণিকক্ষ ও বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অথচ সন্ধ্যার পর বাইরে থাকাই যদি পুলিশের সন্দেহের সাধারণ কারণ হয়ে ওঠে, তখন শহর ব্যবহারের অধিকার একটি অনিশ্চিত অনুমতিতে পরিণত হতে পারে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্য এই উদ্বেগ সামনে এনেছে। ঢাকা পোস্টের ৩১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কক্সবাজারের শহীদ সুভাষ হলে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সামাজিক অপরাধ দমনবিষয়ক সমাবেশে তিনি সন্ধ্যার পর স্কুল-কলেজপড়ুয়াদের রাস্তায় পেলে গ্রেপ্তারের কথা বলেন। কিশোর গ্যাং দমন ও অভিভাবকদের দায়িত্বের প্রসঙ্গেও তিনি বক্তব্য দেন।
অপরাধের বদলে পরিচয় যখন মানদণ্ড
কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, মাদক ও যৌন হয়রানির শিকার মানুষ নিরাপদ রাস্তা চান। তাঁদের উদ্বেগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। পুলিশকে অপরাধ প্রতিরোধ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্তও করতে হবে।
কিন্তু স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী পরিচয় এবং সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা কোনো ব্যক্তির অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ নয়। রাস্তায় কয়েকজন তরুণ একসঙ্গে দাঁড়ানো ও কারও পথ আটকে হয়রানি করা ভিন্ন আচরণ। তদন্তের মানদণ্ডে এই পার্থক্য স্পষ্ট থাকা দরকার।
বিস্তৃত সতর্কবাণী মাঠপর্যায়ে অস্পষ্ট ক্ষমতা তৈরি করতে পারে। কতক্ষণ বাইরে থাকা অপ্রয়োজনীয়, কোন পোশাক বা আচরণ সন্দেহজনক, কাকে বাড়ি পাঠানো হবে আর কাকে থানায় নেওয়া হবে—এসব যদি ব্যক্তিগত বিবেচনায় নির্ভর করে, একই পরিস্থিতিতে ভিন্ন মানুষের ভিন্ন অভিজ্ঞতা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
এর শ্রেণিগত দিকও আছে। ব্যক্তিগত গাড়িতে ফেরা শিক্ষার্থী ও বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করা শিক্ষার্থীর দৃশ্যমানতা এক নয়। ছোট ঘরে পড়ার পরিবেশ না থাকা, পরিবারকে কাজে সাহায্য করা কিংবা দূর থেকে যাতায়াত করার কারণে কারও বাইরে থাকতে হতে পারে। এগুলো এই ঘটনার প্রমাণিত পরিণতি নয়; অস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির সম্ভাব্য অসম প্রভাবের উদাহরণ।
আইনের ভাষা কী বলছে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ চলাফেরার স্বাধীনতা স্বীকার করে, জনস্বার্থে আইনের মাধ্যমে আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের শর্তে। অর্থাৎ অধিকার সীমাহীন নয়; আবার নিরাপত্তার উদ্দেশ্য উল্লেখ করাই যেকোনো বিধিনিষেধের যথেষ্ট ভিত্তি নয়।
সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়া এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষার কথা বলে। এই কাঠামোর আলোকে প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীকে আটক বা গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি কী? জনসভায় কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য নিজে থেকে নতুন অপরাধ বা গ্রেপ্তারের নতুন ক্ষমতা তৈরি করে না।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের বিভিন্ন ভিত্তি ও শর্ত রয়েছে। এর কয়েকটি অপরাধসংক্রান্ত যুক্তিসংগত অভিযোগ, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বা যুক্তিসংগত সন্দেহ এবং ক্ষেত্রবিশেষে গ্রেপ্তারের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত। ৫৪ক ধারায় গ্রেপ্তারের কারণ জানানোর বিধানও আছে। তাই পুলিশ কখনো সন্দেহের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারে না বলা যেমন ভুল, তেমনি বয়স ও সময়কে সব শর্তের বিকল্প বানানোও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নয়।
বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ এবং তদন্তের পর্যায়ে বৈধ গ্রেপ্তারের শর্ত এক নয়। কিন্তু আগের অপরাধের রেকর্ড থাকলেও বর্তমান পদক্ষেপের প্রযোজ্য আইনি ভিত্তি প্রয়োজন। রেকর্ডটি অভিযোগ, বিচারাধীন মামলা নাকি দণ্ড—সেই পার্থক্যও জরুরি। অতীত পরিচয় কাউকে স্থায়ী সন্দেহভাজন বানানোর অবাধ অনুমতি হতে পারে না।
শিক্ষার্থী ও শিশু এক শ্রেণি নয়
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আইনগতভাবে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—দুই ধরনের মানুষই থাকতে পারেন। তাই সবার জন্য একই প্রক্রিয়া ধরে নেওয়া ভুল। শিশু আইনের বয়সসংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে।
শিশু আইন, ২০১৩-এর ৪৪ ধারায় বিশেষ সুরক্ষা রয়েছে। নিবর্তনমূলক আটকাদেশসংক্রান্ত আইনে শিশুকে গ্রেপ্তার বা আটক করার নিষেধ, গ্রেপ্তারের পর শিশুবিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তাকে অবহিত করা এবং হাতকড়া না পরানোর বিধান তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব বিধান শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত নিষিদ্ধ করে না; তদন্ত ও হেফাজতের আচরণে বিশেষ সীমা আরোপ করে।
কোনো শিশু বিপদে পড়েছে বলে তাকে সহায়তা করা এবং অপরাধের অভিযোগে তার স্বাধীনতা সীমিত করা আলাদা পরিস্থিতি। সহায়তার প্রয়োজনকে অপরাধীর পরিচয়ে বদলে দেওয়া উচিত নয়। আবার পারিবারিক তদারকির ঘাটতির অভিযোগও নিজে থেকে শিশুকে গ্রেপ্তারের ভিত্তি হয় না।
নাগরিক পরিসর সংকুচিত হয় কীভাবে
নাগরিক পরিসর বলতে শুধু রাজনৈতিক মিছিল বোঝায় না। রাস্তা, মাঠ, গ্রন্থাগার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার জায়গাও এর অংশ। নিরাপত্তার ভাষায় এসব জায়গায় উপস্থিতিকে সন্দেহজনক বানালে গ্রেপ্তার না হলেও ভয় তৈরি হতে পারে।
কেউ প্রয়োজনীয় কাজে বের হওয়া কমিয়ে দিতে পারেন, কোনো পরিবার মেয়ের চলাচলে বাড়তি বাধা দিতে পারে, আবার শিক্ষার্থী পুলিশের কাছে সহায়তা চাইতে সংকোচ বোধ করতে পারেন। এগুলো সম্ভাব্য প্রভাব; এই বক্তব্যের পর এমন পরিবর্তন ঘটেছে বলে কোনো জরিপ বা তথ্য এখানে দাবি করা হচ্ছে না।
নিরাপত্তার মূল্যায়নে এই অদৃশ্য খরচও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়া এবং অপরাধ কমা এক সূচক নয়। অভিযোগের তদন্ত কতটা এগোল, ভুক্তভোগী সুরক্ষা পেলেন কি না, ভুলভাবে আটকের অভিযোগ কীভাবে নিষ্পত্তি হলো—এসবও পুলিশি কার্যকারিতার মানদণ্ড হওয়া উচিত।
অধিক কার্যকর পথ হতে পারে নির্দিষ্ট অপরাধ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান শনাক্ত করে টহল, নিরাপদ পরিবহন ও পর্যাপ্ত আলো, হয়রানির অভিযোগে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে তদন্ত। অপরাধের ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের জন্য শিক্ষা, মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও বিবেচ্য। এগুলো এই লেখার নীতিগত প্রস্তাব, সংশ্লিষ্ট এলাকায় ইতিমধ্যে চালু কর্মসূচির তালিকা নয়।
পুলিশ কর্তৃপক্ষের একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখন প্রয়োজন: বক্তব্যটি ঠিক কোন আচরণকে লক্ষ্য করে, কোন আইনে ব্যবস্থা হবে, বয়স যাচাই কীভাবে হবে এবং ভুলভাবে স্বাধীনতা সীমিত হলে প্রতিকার কী? লিখিত নির্দেশ থাকলে তার আইনগত ভিত্তি ও পরিধিও প্রকাশ করা উচিত।
অভিভাবকের দায়িত্ব, সামাজিক সহযোগিতা এবং পুলিশের আইনসম্মত ক্ষমতা—সবই প্রয়োজন। কিন্তু পরিবার যে কাজ করবে, তার বদলে গ্রেপ্তারকে বসিয়ে দিলে সমস্যার সামাজিক শিকড় অমীমাংসিত থাকে।
নিরাপদ শহরের পরীক্ষা সন্ধ্যার পর কত শিক্ষার্থীকে ঘরে রাখা গেল, তা নয়। পরীক্ষা হলো, একজন শিক্ষার্থী ভয় ছাড়াই প্রয়োজনীয় কাজে বেরোতে পারেন কি না, বিপদে পুলিশকে পাশে পান কি না এবং পুলিশের পদক্ষেপের কারণ জানতে চাইতে পারেন কি না। নাগরিককে নিরাপদ রাখা ও নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষা—রাষ্ট্রের এই দুই দায়িত্বকে একসঙ্গেই পালন করতে হবে।
আপনার মতামত জানানঃ