একসময় প্রাণীকে দেখা হতো মানুষের প্রয়োজন পূরণের উপকরণ হিসেবে। বাড়ি পাহারা দিতে কুকুর, ইঁদুর ধরতে বিড়াল কিংবা খাবারের প্রয়োজনে গৃহপালিত পশু—প্রাণীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভিত্তি ছিল প্রধানত উপযোগিতা। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও। এখন অনেকের কাছে একটি বিড়াল কিংবা কুকুর নিছক পোষা প্রাণী নয়; সে পরিবারের সদস্য, নিঃসঙ্গতার সঙ্গী, কখনো মানসিক প্রশান্তির উৎস। মানুষের সঙ্গে প্রাণীর এই আবেগময় সম্পর্ক আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে—পরিবার, আত্মীয়তা ও সহাবস্থানের সংজ্ঞা কি শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
নৃবিজ্ঞানে আত্মীয়তার ধারণা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের রক্তের সম্পর্ক, বৈবাহিক বন্ধন এবং সামাজিকভাবে গড়ে ওঠা সম্পর্কের মধ্যেই আলোচিত হয়েছে। কিন্তু মানুষের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাণী বরাবরই আমাদের দৈনন্দিন জীবন, সংস্কৃতি ও জীবিকার অংশ। শিকারি-সংগ্রাহক সমাজ থেকে আধুনিক নগরজীবন—প্রাণীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনো খাদ্য, কখনো নিরাপত্তা, কখনো শ্রম, আবার কখনো নিখাদ ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে। ফলে প্রাণীকে শুধু মানুষের ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে দেখার প্রবণতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
ঢাকার একটি আবাসিক এলাকার দেয়ালে টাঙানো হারানো বিড়ালের পোস্টার এই পরিবর্তনের প্রতীক হতে পারে। পোস্টারে বিড়ালের ছবি, হারিয়ে যাওয়ার সময় ও স্থান, যোগাযোগের নম্বরের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কারের ঘোষণাও ছিল। একসময় শহরের দেয়ালে এমন পোস্টার বলতে সাধারণত নিখোঁজ মানুষের সন্ধানই বোঝাত। সেখানে একটি বিড়ালের সন্ধানে পুরস্কার ঘোষণা প্রমাণ করে, কোনো কোনো পরিবারের কাছে প্রাণীর অনুপস্থিতিও মানুষের হারিয়ে যাওয়ার মতোই গভীর শূন্যতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্ত ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রাণীর প্রতি এই সংবেদনশীলতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিড়াল-কুকুরের বিভিন্ন গ্রুপ, প্রাণী উদ্ধার, দত্তক দেওয়ার আহ্বান এবং নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদ নিয়মিত দেখা যায়। কোনো অসুস্থ কুকুরের চিকিৎসা, আহত বিড়ালকে উদ্ধার কিংবা রাস্তায় পড়ে থাকা প্রাণীর জন্য আশ্রয় খোঁজার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এসব উদ্যোগের সবটাই যে সমস্যার সমাধান করতে পারছে, তা নয়; তবু প্রাণীর কষ্টকে সামাজিক আলোচনার বিষয় করে তোলার ক্ষেত্রে এগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিবর্তন আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে: প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা কি কেবল ব্যক্তিগত আবেগ, নাকি এটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বেরও অংশ? একটি প্রাণীকে ঘরে নিয়ে আসা মানে শুধু তার সঙ্গে সময় কাটানো নয়। তার খাবার, নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাভাবিক আচরণ প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাও দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। সাময়িক আবেগে প্রাণী কেনা কিংবা উপহার হিসেবে দেওয়ার পর দায়িত্ব নিতে না পারলে সেই ভালোবাসাই প্রাণীর দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকার কাটাবন পোষা প্রাণীর বাজার এই দ্বন্দ্বের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। প্রাণী পালনের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারটির পরিসরও বেড়েছে। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধি মানেই প্রাণীদের কল্যাণ নিশ্চিত হওয়া নয়। খাঁচায় বন্দি বন্য প্রাণী, অপর্যাপ্ত জায়গা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, যথাযথ চিকিৎসার অভাব এবং অবৈধ বন্য প্রাণী বাণিজ্যের আশঙ্কা গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করে। প্রাণীকে পরিবারের সদস্য হিসেবে ভাবার দাবি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তাকে কেনাবেচার পণ্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতাও প্রশ্নের মুখে আনা হবে।
প্রাণীর স্বাস্থ্য মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। কিছু প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে রোগ সংক্রমিত হতে পারে, যাকে জুনোটিক রোগ বলা হয়। তাই প্রাণীর আবাসস্থল পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজনীয় টিকা ও পশুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং বন্য প্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারি তদারকি, দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক চর্চা এবং জনসচেতনতা একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। প্রাণীর কল্যাণকে উপেক্ষা করে মানুষের নিরাপত্তাও দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের বাইরে ইউরোপের অভিজ্ঞতা মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্কের আরেকটি দিক তুলে ধরে। নেদারল্যান্ডসে করোনাভাইরাস মহামারির সময় এমন এক বৃদ্ধের কথা জানা যায়, যিনি হাসপাতালে যেতে চাইছিলেন না, কারণ তাঁর বিড়ালগুলো একা হয়ে পড়বে। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রাণীকল্যাণকর্মীরা অসুস্থ মানুষের প্রাণীদের দেখাশোনার জন্য অনানুষ্ঠানিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। কেউ হাসপাতালে থাকা ব্যক্তির কুকুরকে নিজের বাড়িতে রেখেছেন, কেউ আবার নিঃসঙ্গ প্রতিবেশীকে সাময়িকভাবে কুকুরের সঙ্গ দিয়েছেন। সংকটের সেই সময়ে প্রাণীর যত্ন নেওয়া একই সঙ্গে মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের উপায় হয়ে উঠেছিল।
যুক্তরাজ্যেও বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রাণীর উপস্থিতি স্বাভাবিক। বাড়ির পাশাপাশি রাস্তা, পার্ক, গণপরিবহন কিংবা বিভিন্ন জনপরিসরে মানুষের সঙ্গে কুকুরকে দেখা যায়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির চলাচলে সহায়তা করা গাইড ডগ কিংবা চলাফেরায় অসুবিধা থাকা প্রবীণ ব্যক্তির সহায়ক কুকুর শুধু সঙ্গী নয়; তারা মানুষের স্বাধীনতা ও দৈনন্দিন জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার সাধারণ পোষা প্রাণীর সঙ্গও অনেকের একাকিত্ব কমাতে এবং নিয়মিত জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
প্রাণীকে পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করার ভাষাও বদলেছে। অনেকেই নিজেদের পোষা প্রাণীকে সন্তান বলে পরিচয় দেন, তাদের জন্য আলাদা খাবার, পোশাক কিংবা জন্মদিনের আয়োজন করেন। কিন্তু প্রাণীকে সন্তান বা পরিবারের সদস্য বললেই তার ওপর মানুষের ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক বিলুপ্ত হয় না। প্রাণী কোথায় থাকবে, কী খাবে, কখন বাইরে যাবে—এসব সিদ্ধান্তের অধিকাংশই মানুষ নেয়। তাই ভালোবাসার পাশাপাশি প্রাণীর নিজস্ব আচরণ, প্রয়োজন ও স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। প্রাণীর প্রতি দায়িত্বশীলতা মানে তাকে মানুষের মতো করে গড়ে তোলা নয়; বরং তার প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্যকে সম্মান করা।
মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্কের আরও জটিল উদাহরণ পাওয়া যায় ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলের আদিবাসী গুয়ারা জনগোষ্ঠীর জীবন নিয়ে নৃবিজ্ঞানী লরেটা করমিয়েরের গবেষণায়। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, এই জনগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে বানরের সম্পর্ক একই সঙ্গে খাদ্য, প্রকৃতি, সামাজিক জীবন ও আত্মীয়তার ধারণার সঙ্গে যুক্ত। একদিকে বানর তাদের খাদ্যের উৎস, অন্যদিকে মায়ের মৃত্যুর পর অনেক বানরশিশুকে মানুষ নিজের ঘরে আশ্রয় দেয় এবং সন্তানের মতো লালন-পালন করে। গবেষণায় ১০৮ জন মানুষের একটি গ্রামে সাত প্রজাতির ৯০টি দত্তক নেওয়া বানরের উল্লেখ রয়েছে। এই উদাহরণ দেখায়, মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্ককে শুধু ভালো-মন্দ কিংবা শিকারি-শিকারের সরল বিভাজনে ব্যাখ্যা করা যায় না। সংস্কৃতি, পরিবেশ ও সামাজিক বিশ্বাস এই সম্পর্ককে নানা মাত্রা দেয়।
তবে প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা কেবল যাদের আমরা ঘরে রাখি, তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। রাস্তার কুকুর, বিড়াল, পাখি কিংবা মানুষের বসতি ও বন্য পরিবেশের মাঝখানে টিকে থাকা অন্যান্য প্রাণীরও নিরাপদে বেঁচে থাকার প্রয়োজন রয়েছে। একটি প্রাণী মানুষের সঙ্গী কি না, তার ভিত্তিতে তার জীবন ও কষ্টের মূল্য নির্ধারণ করা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। যে বিড়ালকে আমরা পরিবারের সদস্য বলে ভালোবাসি, সেই অনুভূতির পরিসর কি রাস্তায় পড়ে থাকা আহত বিড়ালটির ক্ষেত্রেও প্রসারিত হতে পারে না? যে কুকুরকে আমরা আদর করি, খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো অন্য কুকুরটির প্রতিও কি আমাদের দায়িত্ব নেই?
প্রাণীর প্রতি দায়িত্ব পালনের অর্থ সব প্রাণীকে ঘরে নিয়ে আসা নয়। বরং তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা পরিহার করা, দায়িত্বশীলভাবে দত্তক নেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বন্য প্রাণীকে তাদের প্রাকৃতিক আবাসে থাকতে দেওয়া এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখাই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিশুদের শেখাতে হবে, প্রাণী খেলনা নয় এবং মানুষের বিনোদনের জন্য তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে উপেক্ষা করা যায় না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রাণীকল্যাণ সংগঠন সম্মিলিতভাবে এই সচেতনতা তৈরি করতে পারে।
সবশেষে, ‘পোষা প্রাণী’ থেকে ‘সহযাত্রী প্রাণী’—এই ভাষাগত পরিবর্তন নিছক শব্দের বদল নয়। এটি মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্ককে মালিকানা ও ব্যবহারিক প্রয়োজনের গণ্ডি থেকে বের করে পারস্পরিক সহাবস্থান, যত্ন ও নৈতিকতার আলোকে দেখার আহ্বান। প্রাণী আমাদের জীবনকে বদলে দেয়; তাদের জন্য আমরা সময় ব্যয় করি, বাসস্থান সাজাই, ভ্রমণের পরিকল্পনা বদলাই এবং সংকটের মুহূর্তে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করি। অর্থাৎ সম্পর্কটি একমুখী নয়। মানুষের জীবন যেমন প্রাণীর উপস্থিতিতে প্রভাবিত হয়, তেমনি মানুষের সিদ্ধান্ত প্রাণীর জীবন ও অস্তিত্ব নির্ধারণ করে।
আজ পৃথিবী যখন পরিবেশগত সংকট, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান ভোগবাদী প্রবণতার মুখোমুখি, তখন প্রাণীর প্রতি আমাদের আচরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভালোবাসার পরিধি যদি শুধু নিজের ঘরের বিড়াল কিংবা কুকুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেই ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না। প্রকৃত সহমর্মিতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন পরিচিত সঙ্গীর পাশাপাশি অপরিচিত প্রাণীর জীবনকেও মূল্যবান বলে স্বীকার করব। মানুষই কি শুধু আত্মীয়তা, যত্ন ও সহাবস্থানের অধিকারী? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই হয়তো গড়ে উঠবে মানুষ ও প্রাণীর আরও মানবিক, দায়িত্বশীল এবং সহাবস্থানভিত্তিক পৃথিবী।
আপনার মতামত জানানঃ