
ক্ষমতার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের নিয়ম বদলানো কেন কঠিন হয়ে ওঠে—জুলাই সনদের প্রথম বর্ষপূর্তিতে এই প্রশ্নই সামনে এসেছে। সংস্কারের ঘোষণা তখনই অর্থবহ, যখন ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্ত প্রশ্ন করার, পরীক্ষা করার এবং প্রয়োজন হলে ঠেকানোর প্রতিষ্ঠান কার্যকর হয়।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরের আয়োজন হয়েছিল। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে একটি সমঝোতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা ছিল সেটি। তবে শুরু থেকেই সবাই একই অবস্থানে ছিল না। এনসিপি ও কয়েকটি বাম দল সেদিন স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি; সনদের বৈধতা ও বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তিও ছিল। ফলে সনদকে গোড়া থেকেই সম্পূর্ণ বিরোধহীন ঐকমত্য ভাবলে বাস্তবতা আড়াল হয়।
এক বছর পর বিতর্কটি বাস্তবায়নের পথ নিয়ে। ১৭ অক্টোবরের ডেইলি অবজারভারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার ভিন্নমতের নোটসহ যেভাবে সনদে স্বাক্ষর হয়েছিল, সেভাবেই বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছে, সরকারের এই অবস্থান গণভোটের ফলকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। এই বিরোধ দেখায়, একই দলিলে সম্মতি দিলেও তার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্য নিয়ে এক ব্যাখ্যা তৈরি হয়নি।
অন্যদিকে ১৬ অক্টোবরের বিবৃতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বলেছে, ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধে সংস্কারের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সংস্থাটি অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সাহসের ঘাটতির পাশাপাশি বর্তমান ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের দলীয় হিসাবের সমালোচনা করেছে। বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে। এগুলো টিআইবির মূল্যায়ন; অভিযোগের প্রতিটিকে স্বাধীনভাবে নিষ্পত্তি হওয়া সত্য ধরে নেওয়া যাবে না।
এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে বিশ্লেষণের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি দাঁড়ায়: রাজনৈতিক দলগুলো কি সংস্কারকে ক্ষমতা ব্যবহারের নতুন সীমা হিসেবে দেখছে, নাকি নিজেদের কর্মসূচির সঙ্গে মিলিয়ে বেছে নেওয়ার তালিকা হিসেবে?
সংস্কারের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্কটি অস্বস্তিকর। বিরোধী অবস্থানে স্বাধীন নির্বাচন, নিরপেক্ষ প্রশাসন কিংবা শক্তিশালী নজরদারি প্রতিষ্ঠানের সুবিধা সহজে বোঝা যায়। সরকারে গেলে সেই একই প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা সীমিত করে, নিয়োগ পরীক্ষা করে, ব্যয়ের ব্যাখ্যা চায়। নিয়মটি তখন নিজের ওপরও প্রযোজ্য হয়। এ কারণেই সংস্কারের সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা হয় ক্ষমতা পাওয়ার পরে।
তবে প্রতিটি মতপার্থক্যকে অসৎ উদ্দেশ্য বলাও ভুল। রাষ্ট্রের কাঠামো বদলানোর প্রস্তাবে নীতিগত আপত্তি থাকতে পারে। প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত হবে, কোন প্রতিষ্ঠান কতটা ক্ষমতা পাবে, সিদ্ধান্তের বৈধ উৎস কী হবে—এসব নিয়ে যুক্তিসংগত বিতর্ক প্রয়োজন। কিন্তু বিরোধের সুযোগে যেসব বিষয়ে সম্মতি আছে, সেগুলোও অনির্দিষ্টকাল স্থগিত থাকলে ব্যাখ্যাটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে দরকার প্রস্তাবভিত্তিক প্রকাশ্য হিসাব। কোন সংস্কারে সম্মতি আছে, কোথায় লিখিত আপত্তি আছে, কোনটির জন্য আইন প্রয়োজন, কোনটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সম্ভব—নাগরিককে তা জানাতে হবে। সবকিছুকে একসঙ্গে একটি বড় সাংবিধানিক বিবাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে অগ্রগতি মাপার উপায় থাকে না। আবার বাস্তবায়নের নামে নীতিগত আপত্তি মুছে ফেললেও সমঝোতার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়।
আমলাতন্ত্রের প্রসঙ্গটিও সেই আলোচনার অংশ। প্রশাসন কোনো একক ইচ্ছার যন্ত্র নয়। সেখানে দক্ষতার অভাব, বিধির অসামঞ্জস্য, সম্পদের ঘাটতি এবং পরিবর্তনে সুবিধা হারানোর আশঙ্কা—ভিন্ন ধরনের বাধা থাকতে পারে। সংস্কার যদি নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি কিংবা ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ বদলায়, তাহলে পুরোনো ব্যবস্থায় সুবিধাপ্রাপ্তদের প্রতিরোধের প্রণোদনা তৈরি হয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ; নির্দিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ নয়।
সে কারণে প্রতিরোধের কথা বললেই সমস্যার সমাধান হয় না। কোন দপ্তরে কী সিদ্ধান্ত আটকে আছে, দায়িত্ব কার এবং নির্ধারিত সময় কেন পার হলো—এসব প্রকাশ করতে হবে। বিলম্বের কারণ জানতে না পারলে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ আমলাদের দায়ী করতে পারে, আবার প্রশাসন রাজনৈতিক নির্দেশের অভাব দেখাতে পারে। মাঝখানে সংস্কার একই জায়গায় থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো আইন বদলানো ও প্রতিষ্ঠানের আচরণ বদলানো। নিয়োগের নিয়ম উন্নত হলেও বাছাই যদি অস্বচ্ছ থাকে, স্বাধীনতা সীমিত থেকে যায়। একটি কমিশন কাগজে স্বায়ত্তশাসিত হয়েও বাজেট, জনবল ও তথ্যপ্রাপ্তিতে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। ফলে সাফল্যের মাপকাঠি শুধু কতটি আইন পাস হলো, তা হতে পারে না। দেখতে হবে প্রতিষ্ঠানটি কাকে প্রশ্ন করতে পারছে এবং সেই প্রশ্নের ফল কী হচ্ছে।
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দায়িত্ব এখানে বড়। ভোটে পাওয়া সমর্থন সরকার পরিচালনার শক্ত ভিত্তি দেয়। পাশাপাশি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতার জন্য বিরোধী পক্ষের যুক্তি শোনা, কমিটিতে পরীক্ষা এবং সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ জরুরি। এমন নিয়ম তৈরি করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত, যার ওপর আজকের ক্ষমতাসীন দল আগামীকাল বিরোধী অবস্থানেও আস্থা রাখতে পারে।
বিরোধীদেরও সংস্কারের মান নির্ধারণের দায়িত্ব আছে। শুধু সরকারের প্রত্যেক পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করলে বিকল্প বোঝা যায় না। কোন প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য, কোথায় সংশোধন দরকার এবং নিজেদের ক্ষমতায় একই সীমা মানতে প্রস্তুত কি না—স্পষ্ট অবস্থান দরকার। নইলে সংস্কারের আলোচনা আবারও পরবর্তী নির্বাচনে সুবিধা পাওয়ার প্রতিযোগিতায় সীমিত হতে পারে।
নাগরিকের কাছে এই বিতর্কের অর্থ আরও সরাসরি। অভিযোগ করলে প্রতিকার মিলবে কি না, সরকারি সেবা পেতে পরিচয় লাগবে কি না, ক্ষমতাবানের অনিয়ম তদন্ত হবে কি না—এসবই রাষ্ট্রের নিয়মের বাস্তব পরীক্ষা। সংস্কারকে কেবল উচ্চপর্যায়ের আলোচনা বানিয়ে রাখলে মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার সংযোগ দুর্বল হয়। মানুষ তখন দলিলের ভাষার চেয়ে থানায়, আদালতে ও সরকারি দপ্তরে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে পরিবর্তনের বিচার করে।
অচলাবস্থা কাটানোর জন্য প্রথম প্রয়োজন সম্মতি ও আপত্তির স্পষ্ট মানচিত্র। তারপর প্রতিটি কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা এবং অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা। যেসব বিষয়ে মতবিরোধ আছে, সেগুলোর বিকল্প প্রস্তাব ও যুক্তি নিয়ে প্রকাশ্য শুনানি হতে পারে। আর যেসব পদক্ষেপে বড় ধরনের কাঠামোগত বিরোধ নেই, সেগুলোর অগ্রগতি আলাদা করে দেখাতে হবে। বিলম্ব হলে কারণ এবং নতুন সময়সীমাও জানাতে হবে।
এই ব্যবস্থার ওপর স্বাধীন পর্যবেক্ষণ জরুরি। সরকার নিজের অগ্রগতির বিবরণ দেবে, সংসদ তা পরীক্ষা করবে, সাংবাদিক ও গবেষকেরা নথি যাচাই করবেন, নাগরিকেরা সেবা ও অধিকারপ্রাপ্তির পরিবর্তন জানাবেন। ভিন্ন উৎসের তথ্য মিললে ঘোষণা ও বাস্তবতার ব্যবধান ধরা সহজ হয়।
জুলাই সনদের এক বছর তাই কেবল প্রতিশ্রুতি স্মরণের দিন নয়; রাজনৈতিক আচরণ যাচাইয়ের উপলক্ষ। সব সংস্কার এক বছরে শেষ হওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। কিন্তু কাজের পথ, অগ্রগতি, মতবিরোধ ও দায় দৃশ্যমান করা সম্ভব। সেটুকুও অনিশ্চিত থাকলে আস্থার সংকট বাড়ে।
সনদের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দলগুলো এমন রাষ্ট্র গড়তে প্রস্তুত কি না, যেখানে ক্ষমতায় থাকলেও নিজেদের সিদ্ধান্তের জবাব দিতে হবে। সংস্কারের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি সেখানেই: নাগরিকের অধিকার কোনো দলের সদিচ্ছার অপেক্ষায় থাকবে না, নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুরক্ষিত হবে।
আপনার মতামত জানানঃ