
মাত্র দুই বছর আগেও যিনি ছিলেন রাজপথের বিরোধী রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ, বারবার কারাবরণ করা একটি দলের মহাসচিব এবং ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রধান সংগঠকদের একজন—সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়ে তিনি পৌঁছেছেন বঙ্গভবনে। কিন্তু এই পরিবর্তন কি কেবল একজন রাজনীতিকের অবস্থান বদল, নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যেও কোনো পরিবর্তনের সূচনা?
২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর এটিই ছিল দেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। পরদিন ২১ আগস্ট বঙ্গভবনের দরবার হলে তিনি শপথ নেন। রয়টার্স ও দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও ফলাফল নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ও তার মিত্ররা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ফলে দলের মনোনীত প্রার্থীর বিজয় ছিল প্রায় নিশ্চিত। প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্বাচনের রাজনৈতিক তাৎপর্য বাড়িয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার গাণিতিক হিসাব বদলায়নি।
প্রশ্নটি তাই মির্জা ফখরুল কীভাবে রাষ্ট্রপতি হলেন—সেখানে সীমাবদ্ধ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, তিনি কেমন রাষ্ট্রপতি হবেন এবং তাঁর উপস্থিতি বঙ্গভবনকে সরকারের একটি সাংবিধানিক ভারসাম্যরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে, নাকি একই দলের ক্ষমতাকাঠামোর আরেকটি অংশে রূপ দেবে।
রাষ্ট্রপতি শক্তিশালী, নাকি অলংকারমাত্র?
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। রাষ্ট্রপতির নামে নির্বাহী কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তিনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেন, সংসদ আহ্বান ও ভেঙে দেন, অধ্যাদেশ জারি করেন এবং দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা লঘু করার ক্ষমতা রাখেন।
এই তালিকা শুনলে রাষ্ট্রপতির পদকে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী মনে হতে পারে। কিন্তু সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ বাস্তব চিত্রটি বদলে দেয়। প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে প্রায় সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। সংবিধানের সরকারি পাঠেও এই সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৪৮
অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকলেও নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বঙ্গভবনের হাতে স্বাধীনভাবে নীতি নির্ধারণ, সরকার পরিচালনা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত।
তবে “সীমিত ক্ষমতা” মানেই “গুরুত্বহীন” নয়। কোনো দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে, প্রধানমন্ত্রী সংসদের আস্থা হারালে, সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে, বিচার বিভাগের শীর্ষ নিয়োগ সামনে এলে অথবা রাষ্ট্র গভীর সাংবিধানিক সংকটে পড়লে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। স্বাভাবিক সময়ে যে পদটি আনুষ্ঠানিক বলে মনে হয়, অস্বাভাবিক সময়ে সেটিই রাজনৈতিক ব্যবস্থার শেষ সাংবিধানিক আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।
মির্জা ফখরুলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়
মির্জা ফখরুল কোনো অবসরপ্রাপ্ত আমলা, বিচারপতি বা দলীয় রাজনীতির বাইরের ব্যক্তি নন। তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংগঠনিক নেতা ছিলেন। ২০১১ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত এবং ২০১৬ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে তিনি দলটির সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি অন্তত ১১ বার কারাবরণ করেছেন এবং প্রায় তিন বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি মনোনীত হওয়ার আগপর্যন্ত তিনি বিএনপির মহাসচিব ছিলেন। দ্য ডেইলি স্টার
এই রাজনৈতিক অতীত তাঁর জন্য একই সঙ্গে শক্তি ও দুর্বলতা।
তাঁর শক্তি হলো—তিনি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝেন, বিরোধী দলের অসহায়ত্ব দেখেছেন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগের মধ্য দিয়ে গেছেন এবং নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে কী ঘটে, তা প্রত্যক্ষ করেছেন। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার প্রয়োজন তিনি অনেক অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতির চেয়েও ভালোভাবে উপলব্ধি করার কথা।
কিন্তু দুর্বলতাও সেখানেই। প্রায় তিন দশকের দলীয় আনুগত্য কি বঙ্গভবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিলে রাষ্ট্রপতি কি সাংবিধানিক ও নৈতিক আপত্তি জানাতে পারবেন? নাকি দীর্ঘদিনের দলীয় সম্পর্ক তাঁকে সরকারের প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতিশীল করে তুলবে?
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও তাঁর নীরবতা, সতর্কতা কিংবা প্রকাশ্য অবস্থানের রাজনৈতিক মূল্য আছে। মির্জা ফখরুলের পরীক্ষা হবে—তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব হিসেবে পরিচিত থাকবেন, নাকি সব রাজনৈতিক পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে উঠবেন।
বঙ্গভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একই রাজনৈতিক বৃত্তে
বর্তমান ক্ষমতাকাঠামোয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সংসদের বৃহত্তম দল বিএনপি এবং রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল—সবাই একই রাজনৈতিক ধারার অংশ। সংসদেও বিএনপি ও মিত্রদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা এবং রাষ্ট্রপ্রধানের কার্যালয়ের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব খুবই কম।
একটি স্থিতিশীল সরকারের জন্য এই সমন্বয় সুবিধাজনক হতে পারে। রাষ্ট্রপতি ও সরকারের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত কমবে, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও আইন প্রণয়নে অচলাবস্থা তৈরি হবে না এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
কিন্তু গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে অতিরিক্ত সমন্বয়ও ঝুঁকিপূর্ণ। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো যখন একই রাজনৈতিক কেন্দ্রের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে, তখন সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণগুলো কাগজে থাকলেও বাস্তবে দুর্বল হতে পারে। ক্ষমতার ভারসাম্যের উদ্দেশ্য সরকারকে অচল করা নয়; বরং কোনো একক ব্যক্তি বা দলের হাতে সীমাহীন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকানো।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রপতি সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আটজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ছিলেন। মির্জা ফখরুলের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ায় পদ্ধতিগত একটি পরিবর্তন ঘটেছে; কিন্তু রাষ্ট্রপতির দলীয় নির্ভরতার কাঠামো এখনও বদলায়নি।
জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি এখনও বঙ্গভবনে পৌঁছায়নি
২০২৪ সালের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত ক্ষমতা কমানো এবং রাষ্ট্রপতিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা শক্তিশালী করার প্রস্তাব সামনে এসেছিল। জুলাই জাতীয় সনদে ক্ষমতার ভারসাম্য, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং কয়েকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়।
২০২৬ সালের গণভোটে সংস্কারের পক্ষে জনসমর্থন পাওয়া গেলেও সেই ফল নিজে থেকে সংবিধান বদলে দেয়নি; প্রয়োজনীয় সংশোধনী সংসদে পাস করাই বাস্তবায়নের শর্ত। ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জুলাই সনে ৮০টির বেশি সংস্কার প্রস্তাব ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাহী, আইনসভা, বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করা। International IDEA
কিন্তু নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পরও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবগুলো সাংবিধানিকভাবে কার্যকর হয়নি। ফলে মির্জা ফখরুল যে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেছেন, সেটির আইনগত ক্ষমতা আগের মতোই সীমিত। প্রথম আলোর বিশ্লেষণ
এখানেই একটি রাজনৈতিক বৈপরীত্য রয়েছে। বিরোধী দলে থাকতে বিএনপি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্ব সীমিত করার দাবি সমর্থন করেছে। এখন দলটি সরকার, সংসদ ও বঙ্গভবন—তিন জায়গাতেই প্রভাবশালী। তারা কি সত্যিই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়াবে, যদি সেই ক্ষমতা ভবিষ্যতে নিজের সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার সুযোগ সৃষ্টি করে?
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতিত্বের চেয়ে এই প্রশ্নের উত্তরই ক্ষমতার ভারসাম্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
নিরপেক্ষতার প্রথম পরীক্ষা কোথায়?
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের নিরপেক্ষতা কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পরীক্ষা হতে পারে।
প্রথমত, প্রধান বিচারপতি ও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ। আইন কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতা রাষ্ট্রপতিকে যতটুকু ভূমিকা দেবে, তিনি সেখানে যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেবেন কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। রাষ্ট্রপতি যদি কেবল সরকারি অনুষ্ঠান ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন, তবে বঙ্গভবন দলীয় বলয়ের বাইরে যেতে পারবে না। বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও ভিন্নমতের মানুষের জন্য বঙ্গভবনের দরজা কতটা খোলা থাকে—সেটিও নিরপেক্ষতার সূচক।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সহিংসতা ও মানবাধিকার। যে রাজনৈতিক নেতা নিজে দমন-পীড়ন ও কারাবরণের অভিযোগ করেছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সময়ে বিরোধীদের ওপর একই ধরনের আচরণ হলে তিনি নীরব থাকবেন কি না—এটি নৈতিকভাবে বড় পরীক্ষা হবে।
চতুর্থত, ক্ষমা প্রদর্শনের সাংবিধানিক ক্ষমতা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে যেকোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালের দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা লঘু করার ক্ষমতা দিয়েছে। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ এই ক্ষমতার প্রয়োগ যদি দলীয় বিবেচনায় হয়, তবে বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণ করলে এটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হতে পারে।
ব্যক্তি বদল যথেষ্ট নয়
মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি তুলনামূলকভাবে সংযত, আলোচনামুখী এবং কম সংঘাতপ্রবণ। বাংলাদেশের তীব্র বিভাজিত রাজনীতিতে এটি রাষ্ট্রপতির জন্য উপযোগী বৈশিষ্ট্য। তিনি চাইলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি অনানুষ্ঠানিক সেতু হয়ে উঠতে পারেন।
কিন্তু কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার ভারসাম্যের বিকল্প নয়। আজ একজন সংযত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হতে পারেন; ভবিষ্যতে একই পদে অন্য কেউ আসবেন। রাষ্ট্রের ভারসাম্য ব্যক্তিগত চরিত্রের ওপর নির্ভর করলে সেটি প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র নয়।
রাষ্ট্রপতিকে সত্যিকার অর্থে ভারসাম্যরক্ষাকারী করতে হলে তাঁর নিয়োগসংক্রান্ত ক্ষমতা ও দায়বদ্ধতার সীমানা স্পষ্ট করতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে লিখিত কারণ প্রকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং রাষ্ট্রপতির কার্যালয়কে ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত ক্ষমতা সীমিত করা, সংসদীয় কমিটিকে কার্যকর করা, বিরোধী দলের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
ক্ষমতার ভারসাম্য বঙ্গভবনে একজন নতুন মানুষ বসানোর মাধ্যমে আসে না; আসে এমন নিয়ম তৈরির মাধ্যমে, যেখানে ক্ষমতাবান ব্যক্তিও নিজের সীমা অতিক্রম করতে পারেন না।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, দীর্ঘদিনের বিরোধী নেতার রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া এবং রাজনৈতিক পালাবদলের পর বঙ্গভবনে নতুন মুখ—সবই পরিবর্তনের প্রতীক।
কিন্তু এখন পর্যন্ত পরিবর্তনটি ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের স্তরে; সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্যে নয়। নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র এখনও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংসদে সরকারের শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাষ্ট্রপতির স্বাধীন সিদ্ধান্তের পরিসর এখনও সীমিত।
মির্জা ফখরুল যদি দলীয় অতীতের ঊর্ধ্বে উঠে বিরোধী মতের নিরাপত্তা, সাংবিধানিক শালীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন, তবে সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও বঙ্গভবনের মর্যাদা বাড়তে পারে। কিন্তু যদি রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ক্ষমতাসীন দলের আরেকটি নিরাপদ রাজনৈতিক ঠিকানায় পরিণত হয়, তবে মানুষ বদলালেও রাষ্ট্র পরিচালনার পুরোনো সংস্কৃতি বদলাবে না।
অতএব, রাষ্ট্রপতি বদলেছেন—এটি নিশ্চিত। ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাবে কি না, তার উত্তর এখনও মির্জা ফখরুলের হাতে যতটা, তার চেয়ে বেশি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কারের ভবিষ্যতের ওপর নির্ভরশীল।
আপনার মতামত জানানঃ