পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, হাজারো প্রাণহানি, লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং একটি ভেঙে পড়া অর্থনীতি—এই বাস্তবতাই আজকের মিয়ানমারের পরিচয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার পর দেশটি যে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তা ধীরে ধীরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘাতে একসময় মনে হয়েছিল, কোনো পক্ষই আর আলোচনার টেবিলে ফিরবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঘটনা নতুন এক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে শান্তি আলোচনার একটি বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই সম্ভাবনার পেছনে রয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং সংঘাতে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের অবস্থানের পরিবর্তন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত স্টিয়ারিং কাউন্সিল বা এসসিইএফের অবস্থানে। এই জোটে রয়েছে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন, গণতন্ত্রপন্থী শক্তি এবং ছায়া সরকার। এতদিন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক সরকারকে সামরিকভাবেই পরাজিত করা। কিন্তু এখন তারা রাজনৈতিক সমাধানের পথেও আগ্রহ দেখাচ্ছে।
সম্প্রতি থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। একই সময়ে স্টিয়ারিং কাউন্সিলের সঙ্গেও তাদের আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের পর এসসিইএফ জানিয়েছে, তারা রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত। দীর্ঘ সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এতদিন পর্যন্ত উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিল এবং যুদ্ধকেই সমাধানের একমাত্র পথ হিসেবে দেখছিল।
তবে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বাস্তবতা এখনও জটিল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং, যিনি সামরিক জান্তার প্রধান হিসেবেই পরিচিত ছিলেন, এখনো এসসিইএফকে আনুষ্ঠানিক আলোচনার অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। বরং তাঁর সরকার পৃথক পৃথক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহী। এতে বিরোধী পক্ষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করার কৌশল রয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
তবুও সাম্প্রতিক সময়ে মিন অং হ্লাইংয়ের বক্তব্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, তাঁর সরকার শান্তি চায় এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে। নতুন সরকারের পক্ষ থেকেও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ করেছে, বেসামরিক জনগণের ওপর সামরিক হামলা বরং বেড়েছে। ফলে শান্তির আহ্বান এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এসসিইএফের মুখপাত্র স নিমরোদ জানিয়েছেন, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য এখনো সামরিক বাহিনীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে বেসামরিক সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে যদি রাজনৈতিক আলোচনা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে তারা সংলাপে বসতে প্রস্তুত। তবে তাদেরও কিছু শর্ত রয়েছে। বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে এবং বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হলে অর্থবহ আলোচনা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করে।
যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতাও এখন বদলেছে। সংঘাতের শুরুর দিকে একাধিক এলাকায় সামরিক বাহিনী ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের যৌথ আক্রমণে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হারায়। কিন্তু গত এক বছরে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ, নতুন সামরিক কৌশল এবং চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সমর্থনের কারণে সেনাবাহিনী আবারও কিছু এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। মধ্য মিয়ানমারের বাগো অঞ্চল এবং দক্ষিণের দাউই এলাকায় সরকারি বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযান তারই প্রমাণ।
স্বাধীন বিশ্লেষক অং কো কো মনে করেন, একসময় মনে হয়েছিল সামরিক বাহিনী ভেঙে পড়বে। কিন্তু তারা শুধু টিকেই থাকেনি, বরং রাজনৈতিক ও সামরিক দুই দিক থেকেই নিজেদের পুনর্গঠন করেছে। ফলে এখন আর কোনো পক্ষের পক্ষে দ্রুত সামরিক বিজয় অর্জন সম্ভব নয়। এই অচলাবস্থাই রাজনৈতিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মানবিক পরিস্থিতিও ভয়াবহ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর থেকে এক লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কয়েক মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। হাজার হাজার গ্রাম ধ্বংস হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্যব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় লাখো মানুষ শরণার্থী হিসেবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। শিশুদের একটি বড় অংশ বিদ্যালয়ের বাইরে চলে গেছে। হাসপাতাল ধ্বংস হয়েছে অথবা চিকিৎসক সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতির অবস্থাও একইভাবে বিপর্যস্ত। বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে, শিল্প উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। দীর্ঘ সংঘাতের কারণে কৃষি উৎপাদন, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থনৈতিক এই সংকটও রাজনৈতিক সমাধানের চাপ বাড়িয়েছে।
আঞ্চলিক কূটনীতিও এখন নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। আসিয়ান দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সংকট সমাধানের চেষ্টা করলেও খুব বেশি সফল হয়নি। এবার থাইল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে। ব্যাংকক মনে করছে, মিয়ানমারে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোতেও পড়বে। সীমান্ত নিরাপত্তা, শরণার্থী সংকট এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের স্বার্থে সংঘাত কমানো জরুরি।
চীনের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিং একদিকে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে সীমান্ত অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক করিডোর রক্ষার স্বার্থে সংঘাত কমাতে আগ্রহী। ফলে ভবিষ্যতের যে কোনো শান্তি উদ্যোগে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, গণহত্যার অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কারণে কোনো পক্ষই অন্য পক্ষকে সহজে বিশ্বাস করতে পারছে না। শান্তি আলোচনার আগে এই আস্থার সংকট কাটানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মিয়ানমারের সংঘাত কেবল সরকার বনাম বিরোধী শক্তির লড়াই নয়। এখানে বহু জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন রয়েছে, যাদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক দাবি, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং আঞ্চলিক স্বার্থ রয়েছে। ফলে একটি সর্বসম্মত রাজনৈতিক সমাধান বের করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কোনো একটি পক্ষকে বাদ দিয়ে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা হয়তো এখনই নেই। কিন্তু যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করার মতো সীমিত লক্ষ্য অর্জনও বড় সাফল্য হতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে উভয় পক্ষ কেবল যুদ্ধের ভাষাই ব্যবহার করেছে। এখন অন্তত আলোচনার ভাষা সামনে আসছে।
মিয়ানমারের সাধারণ মানুষও যুদ্ধের অবসান চায়। প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট এবং নিরাপত্তাহীনতায় তারা ক্লান্ত। তাদের কাছে রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ। এই জনমতও ভবিষ্যতের শান্তি উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, শান্তির পথ এখনো দীর্ঘ। সামরিক বাহিনী যদি সহিংসতা কমানোর বাস্তব পদক্ষেপ না নেয় এবং বিরোধী পক্ষ যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখতে না পারে, তাহলে এই সম্ভাবনাও অতীতের অনেক ব্যর্থ উদ্যোগের মতো হারিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক কূটনৈতিক চাপ এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি।
মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি তাই একদিকে আশাবাদের, অন্যদিকে সতর্কতার। আলোচনার দরজা কিছুটা খুলেছে ঠিকই, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রবেশ করবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার মানসিকতা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয় তার ওপর। পাঁচ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এই ক্ষীণ সম্ভাবনাই আজ মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় আশার আলো।
আপনার মতামত জানানঃ