
আগস্টের মাঝামাঝি বাংলাদেশের আকাশ থেকেও দেখা যেতে পারে বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় উল্কাবৃষ্টিগুলোর একটি—পারসেইড উল্কাবৃষ্টি। ২০২৬ সালে এর সর্বোচ্চ সক্রিয়তার সময় পড়ছে ১২ আগস্ট রাত থেকে ১৩ আগস্ট ভোরের মধ্যে। তার চেয়েও ভালো খবর, ১২ আগস্ট অমাবস্যা। ফলে পরিষ্কার ও অন্ধকার আকাশ পাওয়া গেলে চাঁদের আলো ক্ষীণ উল্কাগুলোকে ঢেকে দেবে না।
বাংলাদেশের পর্যবেক্ষকদের জন্য সবচেয়ে ভালো সময় হবে ১২ আগস্ট রাত পেরিয়ে ১৩ আগস্ট ভোরে, আনুমানিক রাত ২টা থেকে ভোর ৪টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত। রাত ১১টার পর থেকেই কিছু উল্কা দেখা যেতে পারে, তবে রাত যত গভীর হবে উত্তর-পূর্ব আকাশে পারসিয়াস নক্ষত্রমণ্ডল তত ওপরে উঠবে এবং উল্কার হার বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে। ঢাকায় ১৩ আগস্ট সূর্যোদয় হবে আনুমানিক ভোর ৫টা ৩৩ মিনিটে; তার আগে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে ক্ষীণ উল্কা দেখা কঠিন হয়ে যাবে।
তবে একটি বিষয়ে শুরুতেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে ঘণ্টায় ৫০ থেকে ১০০টি উল্কা দেখার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও এটি আদর্শ অন্ধকার আকাশে, রেডিয়েন্ট প্রায় মাথার ওপরে থাকা এবং দৃষ্টিসীমা পুরোপুরি খোলা থাকার তাত্ত্বিক হার। ঢাকা বা অন্য উজ্জ্বল শহর থেকে বাস্তবে এর অনেক কম দেখা যাবে। মেঘ থাকলে কিছুই দেখা নাও যেতে পারে।
পারসেইড উল্কাবৃষ্টি কী
প্রতি বছর পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় ধূমকেতু ১০৯পি/সুইফট–টাটলের রেখে যাওয়া ধূলিকণা ও ক্ষুদ্র পাথরের প্রবাহের ভেতর দিয়ে যায়। এসব কণা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রায় ৫৯ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বেগে প্রবেশ করে। বাতাসের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষে কণার সামনে থাকা গ্যাস উত্তপ্ত ও আয়নিত হয়ে কয়েক মুহূর্তের আলোর রেখা তৈরি করে। আমরা সেটিকেই উল্কা বা প্রচলিত ভাষায় ‘ছুটন্ত তারা’ বলি। আসলে এগুলো কোনো নক্ষত্র নয়।
পারসেইড নামটি এসেছে পারসিয়াস নক্ষত্রমণ্ডল থেকে। আকাশে উল্কাগুলোর গতিপথ পেছনের দিকে বাড়ালে মনে হয় সেগুলো পারসিয়াসের একটি বিন্দু থেকে ছড়িয়ে পড়ছে। এই কাল্পনিক উৎসবিন্দুকে বলা হয় রেডিয়েন্ট। কিন্তু উল্কা শুধু পারসিয়াসের ভেতর দেখা যায় না; আকাশের যেকোনো অংশে দীর্ঘ আলোর রেখা দেখা যেতে পারে। বরং রেডিয়েন্ট থেকে কিছুটা দূরে তাকালে দীর্ঘতর রেখা দেখার সম্ভাবনা বাড়ে।
পারসেইড উল্কাগুলো দ্রুতগামী এবং উজ্জ্বল। মাঝেমধ্যে তুলনামূলক বড় কণা বায়ুমণ্ডলে ঢুকে দীর্ঘস্থায়ী উজ্জ্বল ‘ফায়ারবল’ তৈরি করতে পারে। এ কারণেই শহরের আলোয় ক্ষীণ উল্কা হারিয়ে গেলেও কিছু উজ্জ্বল পারসেইড দেখা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশে সঠিক সময় ও দিক
ইন্টারন্যাশনাল মিটিওর অর্গানাইজেশন ও আমেরিকান মিটিওর সোসাইটির ২০২৬ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, পারসেইডের প্রধান সক্রিয়তা জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের শেষ ভাগ পর্যন্ত চলবে এবং সর্বোচ্চ সময় ১২–১৩ আগস্টের রাত। সর্বোচ্চ আদর্শ হার বা ZHR প্রায় ১০০ ধরা হয়েছে। ১২ আগস্ট অমাবস্যা হওয়ায় ২০২৬ সালের পর্যবেক্ষণ পরিস্থিতি বিশেষভাবে অনুকূল।
বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ পরিকল্পনা হতে পারে:
- ১২ আগস্ট রাত ১১টা–১টা: উল্কা দেখা শুরু হতে পারে, তবে রেডিয়েন্ট তখন তুলনামূলক নিচে থাকবে। সংখ্যাও কম হতে পারে।
- ১৩ আগস্ট রাত ১টা–২টা: পারসিয়াস উত্তর-পূর্ব আকাশে আরও ওপরে উঠবে; দেখার সম্ভাবনা বাড়বে।
- রাত ২টা–ভোর ৪টা ১৫: সবচেয়ে কার্যকর পর্যবেক্ষণ-সময়। অন্ধকার আকাশে এই সময় বেশি উল্কা ধরা পড়তে পারে।
- ভোর ৪টা ১৫–৪টা ৪৫: আকাশে ভোরের আলো বাড়তে শুরু করবে, তবে উজ্জ্বল উল্কা দেখা যেতে পারে।
ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে সময় কয়েক মিনিট এদিক–সেদিক হতে পারে। পূর্বাঞ্চলে ভোরের আলো তুলনামূলক আগে এবং পশ্চিমাঞ্চলে কিছুটা পরে আসবে। তাই ঘড়ির নির্দিষ্ট মিনিটের চেয়ে আকাশের অন্ধকার, মেঘ এবং স্থানীয় আলোর অবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১৩ আগস্ট ভোরে আকাশ মেঘে ঢাকা থাকলে ১২ আগস্ট ভোর বা ১৪ আগস্ট ভোরেও চেষ্টা করা যায়। পারসেইড ধীরে ধীরে সর্বোচ্চে ওঠে এবং শীর্ষের পর তুলনামূলক দ্রুত কমে, তবে আশপাশের রাতগুলোতেও উল্কা থাকে।
দিক নির্ধারণের জন্য উত্তর-পূর্ব আকাশে তাকানো যেতে পারে। ইংরেজি ‘W’ আকৃতির ক্যাসিওপিয়া নক্ষত্রমণ্ডল খুঁজে পেলে তার কাছাকাছি পারসিয়াসের অবস্থান বোঝা সহজ হয়। কিন্তু শুধু ওই বিন্দুতে তাকিয়ে থাকা ঠিক নয়। মাথার ওপর থেকে উত্তর, পূর্ব ও উত্তর-পূর্বের বড় একটি আকাশভাগ চোখে রাখলে বেশি সুবিধা হবে।
কোথা থেকে ভালো দেখা যাবে
আলোদূষণ পারসেইড দেখার সবচেয়ে বড় স্থানীয় বাধা। ঢাকার কেন্দ্র, চট্টগ্রাম নগরী বা উজ্জ্বল শহরাঞ্চলে আকাশের পটভূমি এতটাই আলোকিত থাকে যে শুধু উজ্জ্বল উল্কাগুলো দেখা যায়। শহরের বাইরের খোলা মাঠ, চর, নদীর পাড়, হাওর, সমুদ্রসৈকত বা পাহাড়ি খোলা জায়গায় আকাশ অনেক অন্ধকার হতে পারে। তবে স্থানটি অবশ্যই নিরাপদ, অনুমোদিত এবং যাতায়াতযোগ্য হতে হবে।
নির্বাচিত জায়গায় উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিগন্ত খোলা থাকা ভালো। উঁচু ভবন, গাছ বা পাহাড়ে দিগন্ত ঢাকা থাকলে রাতের শুরুতে অসুবিধা হবে। রাস্তার বাতি, গাড়ির হেডলাইট বা পাশের বাড়ির আলো সরাসরি চোখে পড়ছে না—এমন জায়গা বেছে নিতে হবে। একেবারে অন্ধকার জায়গায় একা না গিয়ে পরিচিতদের সঙ্গে যাওয়াই নিরাপদ। নদী, ছাদ, পাহাড় বা সড়কের পাশে পর্যবেক্ষণের সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
আগস্ট বাংলাদেশে বর্ষাকাল। তাই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিকভাবে চাঁদহীন আকাশ অনুকূল হলেও বাস্তব ফল নির্ভর করবে মেঘের ওপর। পাতলা মেঘও ক্ষীণ উল্কা ঢেকে দিতে পারে। বের হওয়ার আগে স্থানীয় ঘণ্টাভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও স্যাটেলাইট মেঘচিত্র দেখে নেওয়া উচিত।
দেখার জন্য কী লাগবে
উল্কাবৃষ্টি দেখতে টেলিস্কোপ বা দূরবীন প্রয়োজন নেই। এগুলো আকাশের খুব ছোট অংশ দেখায়, অথচ উল্কা যেকোনো জায়গায় দেখা দিতে পারে। খালি চোখই সবচেয়ে কার্যকর। আরাম করে আকাশের বড় অংশ দেখতে মাদুর, হেলান দেওয়া চেয়ার বা নিরাপদ সমতল জায়গা কাজে আসে।
অন্ধকারে যাওয়ার পর চোখকে অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট মানিয়ে নেওয়ার সময় দিতে হবে। এই সময়ে মোবাইলের উজ্জ্বল পর্দা দেখলে রাতের দৃষ্টি আবার দুর্বল হয়ে যায়। প্রয়োজন হলে পর্দার উজ্জ্বলতা সর্বনিম্ন রাখা বা লাল আলো ব্যবহার করা ভালো। কয়েক মিনিটে উল্কা না দেখলে হতাশ হওয়ার কারণ নেই; উল্কা সমান বিরতিতে পড়ে না। কয়েক মিনিট কিছু না থাকার পর অল্প সময়েই কয়েকটি দেখা যেতে পারে। অন্তত এক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করলে সম্ভাবনা বাড়ে।
ছবি তুলতে চাইলে ট্রাইপডে ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল লেন্সসহ ক্যামেরা স্থির করে দীর্ঘ এক্সপোজার ব্যবহার করা যায়। তবে একটানা আকাশ দেখার অভিজ্ঞতার জন্য ক্যামেরার সেটিং নিয়ে ব্যস্ত না থেকে খালি চোখে দেখা অনেক সময় বেশি আনন্দদায়ক। মোবাইল ফোনে খুব উজ্জ্বল ফায়ারবল ছাড়া সাধারণ উল্কা ধরা কঠিন।
ঘণ্টায় ১০০টি—বাস্তবে কত দেখা যাবে?
ZHR বা Zenithal Hourly Rate কোনো একজন পর্যবেক্ষক বাস্তবে প্রতি ঘণ্টায় ঠিক কতটি উল্কা দেখবেন, তা নয়। এটি একটি মানসম্মত তাত্ত্বিক হার—রেডিয়েন্ট মাথার ঠিক ওপরে, আকাশ সম্পূর্ণ অন্ধকার, কোনো মেঘ নেই এবং পর্যবেক্ষকের পুরো দৃষ্টিক্ষেত্র খোলা ধরে হিসাব করা হয়।
বাংলাদেশে পারসিয়াস ভোরের আগে ভালো উচ্চতায় উঠলেও মাথার ঠিক ওপরে থাকবে না। এর সঙ্গে আলোদূষণ, আর্দ্রতা, পাতলা মেঘ, গাছপালা ও ভবনের বাধা যোগ হবে। ভালো গ্রামীণ অন্ধকার আকাশে কয়েক দশক উল্কা দেখা সম্ভব হতে পারে; শহরতলিতে সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এবং ঢাকা শহরের উজ্জ্বল এলাকায় হয়তো ঘণ্টায় হাতে গোনা কয়েকটি উজ্জ্বল উল্কাই দেখা যাবে। কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করে বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
আকাশের অন্য ছোট উল্কা প্রবাহ এবং এলোমেলো উল্কাও একই রাতে সক্রিয় থাকতে পারে। কোনো উল্কার রেখা পেছনের দিকে বাড়ালে যদি পারসিয়াসের রেডিয়েন্টের সঙ্গে মিলে, তখন সেটিকে পারসেইড হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সাধারণ দর্শকের জন্য অবশ্য নাম নির্ধারণের চেয়ে আকাশ দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের পারসেইড উল্কাবৃষ্টি বাংলাদেশের পর্যবেক্ষকদের জন্য অনুকূল একটি সুযোগ এনে দিচ্ছে। অমাবস্যার অন্ধকার আকাশ থাকবে, রেডিয়েন্ট ভোরের আগে উত্তর-পূর্ব আকাশে ভালো উচ্চতায় উঠবে এবং উজ্জ্বল ফায়ারবলের সম্ভাবনাও আছে। সবচেয়ে ভালো পরিকল্পনা হবে ১২ আগস্ট গভীর রাতে শহরের আলো থেকে দূরে নিরাপদ খোলা জায়গায় যাওয়া এবং ১৩ আগস্ট রাত ২টা থেকে ভোর ৪টা ৪৫ পর্যন্ত আকাশ দেখা।
তবে আকাশ পর্যবেক্ষণে নিশ্চয়তার চেয়ে সম্ভাবনাই বড়। মেঘ, আলোদূষণ এবং স্থানীয় দিগন্ত শেষ পর্যন্ত কী দেখা যাবে তা নির্ধারণ করবে। টেলিস্কোপ নয়, প্রয়োজন ধৈর্য, অন্ধকার আকাশ এবং কিছু সময়ের জন্য মোবাইলের পর্দা থেকে দূরে থাকা। সব অনুকূল হলে কয়েক সেকেন্ডের একটি উজ্জ্বল আলোর রেখাই আগস্টের রাতকে স্মরণীয় করে দিতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ