
ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তৃতীয় দেশ হিসেবে ভারতের কাছ থেকে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে ইন্দোনেশিয়া। কিন্তু এই চুক্তি কি নিছকই একটি অস্ত্র বিক্রি, নাকি দক্ষিণ চীন সাগরকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক বৃহত্তর কৌশলগত দাবার ছকের অংশ? কেন এই মুহূর্তে, কেন ইন্দোনেশিয়া, আর এতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অবস্থানই বা কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই বোঝা যায়, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্ষমতার সমীকরণ কতটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
চুক্তির বিবরণ
মঙ্গলবার জাকার্তায় দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে পৌঁছানো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তোর মধ্যকার বৈঠকের পর এই চুক্তি সইয়ের কথা নিশ্চিত করেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রায় ৬৩ কোটি মার্কিন ডলার। দূরপাল্লার ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া কিনছে অস্ত্র (Astra) এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্রও, যা দেশটির রুশ নির্মিত সুখোই যুদ্ধবিমানে ব্যবহারযোগ্য।
মাক ৩ গতিতে ছুটতে সক্ষম এবং প্রায় ২৯০ কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র স্থল, সমুদ্র ও আকাশ—তিন প্ল্যাটফর্ম থেকেই উৎক্ষেপণযোগ্য। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ভাষ্যে, উচ্চগতি, গভীর অনুপ্রবেশ ক্ষমতা এবং জ্যামিং-প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে এটি উপকূলীয় প্রতিরক্ষায় একটি বিশেষভাবে কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত।
কেন এই সময়ে, কেন ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়া: দক্ষিণ চীন সাগরের নাতুনা দ্বীপপুঞ্জ ঘিরে চীনের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার সামুদ্রিক এখতিয়ার নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন রয়েছে। জাকার্তা প্রকাশ্যে চীনকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত না করলেও, দেশটির প্রতিরক্ষা নীতিপত্রে সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের আশঙ্কা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্কতা প্রকাশ পেয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ব্রহ্মস সংগ্রহের মধ্য দিয়ে ইন্দোনেশিয়া মূলত নিজস্ব উপকূলীয় প্রতিরোধ (এ২/এডি) সক্ষমতা গড়ে তুলছে—একই কৌশল, যা ইতিমধ্যে অনুসরণ করছে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম।
ভারত: নয়াদিল্লির জন্য এই চুক্তি প্রতিরক্ষা রপ্তানি খাতে একটি বড় সাফল্য এবং একইসঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের পর ইন্দোনেশিয়ায় ব্রহ্মস রপ্তানির মধ্য দিয়ে ভারত কার্যত চীনের সামুদ্রিক প্রতিবেশে একটি ক্ষেপণাস্ত্র-নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে বলে মূল্যায়ন করেছে ভারতীয় সাময়িকী আউটলুক ইন্ডিয়া। দক্ষিণ চীন সাগর, প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরকে সংযোগকারী কৌশলগত প্রণালিগুলোতে একের পর এক দেশকে এই অস্ত্রে সজ্জিত করার মধ্য দিয়ে ভারত একটি বর্ধিত প্রতিরোধ-বলয় তৈরির চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষকরাও।
যুক্তরাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানো, শূন্যস্থান পূরণে ভারত
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর এই প্রতিরক্ষা-সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রবণতাকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক অগ্রাধিকার পশ্চিম এশিয়ার দিকে সরিয়ে নেওয়ায়, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উল্লেখ প্রায় নেই বললেই চলে—এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে ইন্ডিয়া ন্যারেটিভের একটি বিশ্লেষণ।
এই শূন্যতার সুযোগে ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে সক্ষমতা বিনির্মাণ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিয়ে এগিয়ে আসছে। ইন্দোনেশিয়ার জন্য এটি একটি কৌশলগত ভারসাম্যও বটে—ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে, আবার রাশিয়া বা চীনের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার কারণে সৃষ্ট মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়িয়ে, ভারতের মতো একটি জোটনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা।
রাশিয়ার নীরব উপস্থিতি
ব্রহ্মস মূলত ভারত-রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগের ফসল, ফলে এই ক্ষেপণাস্ত্রের যেকোনো বিক্রির জন্য মস্কোর সম্মতি অপরিহার্য। ক্ষেপণাস্ত্রের র্যামজেট ইঞ্জিন ও সক্রিয় রাডার সিকার হেডের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরি হয় রাশিয়ায়, আর চূড়ান্ত সংযোজন হয় ভারতে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অস্ত্র বাণিজ্যে রাশিয়ার অংশীদারত্ব বড় ধরনের ধাক্কা খেলেও, ব্রহ্মসের মতো যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে মস্কো এখনও এশিয়ার প্রতিরক্ষা বাজারে একটি পরোক্ষ উপস্থিতি ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
বৃহত্তর ছবি
এই চুক্তি এমন এক সময়ে হলো, যখন মোদি-প্রাবোয়ো বৈঠকে প্রতিরক্ষা ছাড়াও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ ও সমুদ্র নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক সমঝোতা হয়েছে। দুই দেশের উপকূলরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ঘোষণাও এসেছে। অর্থাৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নয়—বরং ভারত-ইন্দোনেশিয়া সম্পর্ককে একটি ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপান্তরের অংশ।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—চীনের প্রতিক্রিয়া কী হবে? ইন্দোনেশিয়া অতীতে বরাবরই বেইজিংয়ের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা মাথায় রেখে ব্রহ্মস আলোচনায় সতর্ক পদক্ষেপ নিয়েছে। এই চুক্তি বাস্তবায়নের পর দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের অবস্থান কতটা কঠোর হয়, নাকি জাকার্তা-নয়াদিল্লি এই ভারসাম্য এড়িয়ে যেতে পারে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আপনার মতামত জানানঃ