
জুলাই অভ্যুত্থানের পর আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদের পরিচয় দিয়েছিল ঐতিহ্যবাহী রাজনীতির বাইরের এক “তৃতীয় শক্তি” হিসেবে—না আওয়ামী লীগের ধারা, না বিএনপি-জামায়াতের চিরায়ত মেরুকরণ। কিন্তু গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরছে। দলটির কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পরিষদ থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতাকর্মীদের অন্তর্ভুক্তি বাড়ছে ক্রমাগত। এই প্রবণতা কি এনসিপির প্রাথমিক অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত, নাকি নিছক সাংগঠনিক সম্প্রসারণের কৌশল?
নির্বাচনী জোট থেকে শুরু
গত বছরের ডিসেম্বরে এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যার মধ্য দিয়ে জোটটি আটদলীয় থেকে দশদলীয় রূপ নেয়। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তখন স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এটি কোনো আদর্শিক জোট নয়, বরং একটি নির্বাচনী সমঝোতা মাত্র, এবং দলের নিজস্ব লক্ষ্য ও আদর্শ অক্ষুণ্ন থাকবে। তবে বাস্তবে এই ঘোষণার পর থেকেই দলে দৃশ্যমান পরিবর্তন শুরু হয়।
যোগদানের ঢেউ
মে মাসের শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছোট ছেলে ডা. মোহাম্মদ নাদিমুর রহমানসহ একাধিক নেতাকর্মী ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে এনসিপিতে যোগ দেন। এর একদিন পরই চট্টগ্রামে বিএনপি, জামায়াত ও তাদের অঙ্গসংগঠনের দেড় শতাধিক নেতাকর্মী দলে যোগ দেওয়ার খবর আসে। জুন মাসে এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পরিষদে আরও ছয়জন নতুন নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যার ফলে পরিষদের সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮ জনে। দলীয় সূত্রগুলো এই বিস্তারকে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরলেও, কারা এই নতুন নেতৃত্বের সিংহভাগ গঠন করছেন, তা লক্ষ করলে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট পটভূমির একটি স্পষ্ট প্রবণতা চোখে পড়ে।
প্রতিক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ ফাটল
এই পরিবর্তন দলের অভ্যন্তরে বিনা প্রতিক্রিয়ায় ঘটেনি। মার্চ মাসে রাঙামাটি জেলা কমিটির সাতজন শীর্ষ নেতা একযোগে পদত্যাগ করেন, এবং পদত্যাগপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্তই তাদের এই পদক্ষেপের মূল কারণ। এ ধরনের বিচ্ছিন্ন পদত্যাগের ঘটনা অন্যান্য জেলাতেও কমবেশি দেখা গেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বোঝা যায়, দলের প্রতিষ্ঠাকালীন অনেক নেতাকর্মীর কাছে এই দিকবদল স্বস্তিদায়ক নয়।
রাজনৈতিক তাৎপর্য কোথায়
এই প্রবণতার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে অন্তত তিনটি দিক সামনে আসে। প্রথমত, নির্বাচনী রাজনীতিতে এনসিপির একার পক্ষে দ্রুত সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করা কঠিন হওয়ায়, জামায়াতের প্রতিষ্ঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মীবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক তাদের স্বল্প সময়ে সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়ানোর একটি বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই প্রবণতা এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছে—দলটি যে “নতুন ধারার”, অ-সাম্প্রদায়িক ও তরুণ-নেতৃত্বাধীন রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, জামায়াত-ঘনিষ্ঠ নেতৃত্বের এই প্রবেশ তার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে উভয় জায়গাতেই প্রশ্ন উঠছে। তৃতীয়ত, আসন্ন নির্বাচনী মেরুকরণে এই সম্পর্ক এনসিপিকে কার্যত জামায়াতঘেঁষা একটি জোটসঙ্গীর অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে, যা দলটির “তৃতীয় শক্তি” হিসেবে ভোটারদের কাছে থাকা স্বতন্ত্র আবেদনকে ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি তৈরি করে।
সামনে কী
দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার বলে আসছে যে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক নিছক নির্বাচনী সমঝোতা, আদর্শিক মিলন নয়। তবে সাংগঠনিক পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান জামায়াত-ঘনিষ্ঠ নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্তি এবং তার প্রতিক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাকর্মীদের পদত্যাগ—এই দুই প্রবণতা একযোগে চলতে থাকলে দলটির অভ্যন্তরীণ পরিচয় সংকট আরও গভীর হতে পারে। আসন্ন নির্বাচনের আগে এই টানাপোড়েন কোন দিকে গড়ায়, তা এনসিপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা যায়।
আপনার মতামত জানানঃ