
একটি দল যখন নিজেই নিজের সাবেক নেতৃত্বের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন তা নিছক ব্যক্তি-বিরোধ থাকে না— হয়ে ওঠে দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতির আয়না। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী নীলা ইসরাফিল ও দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের মধ্যকার প্রকাশ্য বাগ্যুদ্ধ এখন সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে— জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনীতি কি নিজের ভেতরেই জবাবদিহিতার সংকটে পড়েছে?
বিরোধের সূত্রপাত
নীলা ইসরাফিলের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক শুরু থেকেই সহজ ছিল না। একটি পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তিনি আলোচনায় আসেন, যেখানে তিনি নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছিলেন। এরপর তিনি নিজের দলের নেতা সারোয়ার তুষারের বিরুদ্ধেও ফেসবুকে অভিযোগ তুলে আলোচনায় আসেন। এই ঘটনাগুলো দলের ভেতরে তার অবস্থানকে ক্রমশ প্রান্তিক করে তোলে।
সারজিসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য আক্রমণ
মে মাসের মাঝামাঝি এই টানাপোড়েন নতুন মোড় নেয়। ১৩ মে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক উন্মুক্ত বার্তায় নীলা ইসরাফিল সরাসরি সারজিস আলমকে লক্ষ্য করে লেখেন, “সারজিস তোরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবি বাংলাদেশ থেকে।” তিনি দাবি করেন, এনসিপির রাজনৈতিক পতনের “কাউন্টডাউন” ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, এবং সারজিসকে আত্মসমালোচনা করে জনগণের কাছে জবাবদিহি করার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেষ কথা বলে ক্ষমতা নয়— জনগণ।
এই মন্তব্য দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়, কারণ এটি ছিল দলের ভেতরের একজন সাবেক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বর্তমান শীর্ষ সংগঠকের বিরুদ্ধে অত্যন্ত তীব্র ভাষায় দেওয়া প্রকাশ্য আক্রমণ— যা সচরাচর প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যেই বেশি দেখা যায়, নিজ দলের অভ্যন্তরে নয়।
অবশেষে দল ত্যাগ
মাসদুয়েক পর, ২৮ জুলাই নীলা ইসরাফিল আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি দলটিকে “নীতিহীন” ও প্রত্যাখ্যাত একটি দল হিসেবে আখ্যা দেন। তার অভিযোগ ছিল স্পষ্ট ও গুরুতর— এমন একটি দলে তিনি আর থাকতে পারেন না, যেখানে অপরাধীর বিচার হয় না এবং একজন নারীর হেনস্তার ঘটনায়ও অভিযুক্তের পক্ষে নীরবতা পালন করা হয়।
কেন এই বিরোধ গুরুত্বপূর্ণ
নীলা ইসরাফিলের অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়— এটি এনসিপির ভেতরে নারী নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন তোলে। এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন নারী নেত্রী দল ছেড়েছেন, যাদের অভিযোগ ছিল দলটি তার প্রতিষ্ঠাকালীন বহুত্ববাদী চরিত্র থেকে সরে যাচ্ছে। নীলা ইসরাফিলের পদত্যাগ সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলো, তবে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে— এবার অভিযোগের কেন্দ্রে দলের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ও নারীর প্রতি আচরণের প্রশ্ন সরাসরি উঠে এলো।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট ধরে যে দলটি নিজেকে পুরনো রাজনীতির বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছিল, তার নিজস্ব নেতৃত্বের কাঠামোর ভেতরেই যদি জবাবদিহিতার এই সংকট বারবার প্রকাশ্যে আসতে থাকে, তবে তা দলটির বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য দীর্ঘমেয়াদে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
আপনার মতামত জানানঃ