
২০ দিন। অভিযোগ গঠন থেকে মৃত্যুদণ্ডের রায় পর্যন্ত লেগেছিল মাত্র এই কয়টি দিন। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এমন গতি বিরল। কিন্তু রায়ের প্রায় দুই মাস পর প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে — একটি মামলার রেকর্ড-গতি কি হাজারো মামলার স্থবিরতা ঢাকতে পারে?
গত রোববার (২৭ জুলাই) বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম যা বললেন, তা এই প্রশ্নটিকেই সামনে আনে: ছয় থেকে নয় বছর বয়সী কন্যাশিশুদের ধর্ষণের ঘটনাই এখন সবচেয়ে বেশি। রামিসার বয়স ছিল ঠিক সেই সীমার মধ্যে।
যেভাবে এগিয়েছে মামলাটি
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি ভবন থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয় (বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার বয়স ৭ ও ৮ — দুই-ই উল্লেখ করা হয়েছে)। পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করেন বলে জানায় পুলিশ। শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন; একই দিনে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন প্রধান আসামি।
এরপর যা ঘটে, তা কার্যত একটি “মডেল টাইমলাইন”:
- ১ জুন — ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন, বিচার শুরু
- ২ জুন — একদিনেই বাবা-মা, বোন, প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসক, ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন
- ৩ জুন — আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন
- ৪ জুন — যুক্তিতর্ক
- ৭ জুন — বিচারক মাসরুর সালেকীনের রায়: দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড
- ৯ জুন — ৬৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়সহ ৭২ পৃষ্ঠার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে
- ১৪ জুন — আসামিদের জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট
রায়ের পর আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট অগ্রাধিকার দিয়ে শুনানি করলে তিন মাসের মধ্যেই রায় কার্যকর করা সম্ভব। আজ ২৮ জুলাই — সেই তিন মাসের অর্ধেকের বেশি পেরিয়ে গেছে, ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিলের নিষ্পত্তি হয়নি।
সংখ্যাগুলো যা বলছে
রামিসার মামলাটি ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস-এর গত ১৭ জুলাই প্রকাশিত ছয় মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে সারা দেশে ৪০৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার ভুক্তভোগীদের ২৩৮ জনই শিশু ও কিশোরী। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৭ জন। সব মিলিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৫৬ শতাংশ; সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৮৮ জন, যৌন নিপীড়নের শিকার ৪৭৬ জন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাব আলাদা, কিন্তু ইঙ্গিত একই। জানুয়ারি থেকে মে — এই পাঁচ মাসে ১ হাজার ৩৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৫০ জন ধর্ষণ, ৬৫ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ৫৩ জন ধর্ষণচেষ্টা এবং ১৮ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার। সংগঠনটির ২০২৫ সালের সমীক্ষা বলছে, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ১৪২টি, ধর্ষণচেষ্টার ১১৭টি ও আত্মহত্যার ২০৩টি ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কন্যাশিশুরাই।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানটি মামলা-সংক্রান্ত: শিশু ধর্ষণের ঘটনাগুলোর একটি বড় অংশে আদৌ মামলাই হয় না। ধর্ষণচেষ্টার ১২৯টি ঘটনার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ৮৫টিতে। অর্থাৎ যে মামলাটি হয়নি, তার তো দ্রুত বিচারও নেই।
দ্রুত বিচার, নাকি বাছাই করা বিচার?
রামিসা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ বিশেষ আইনজীবী প্যানেল গঠন করেছে, অ্যাটর্নি জেনারেল ঘোষণা দিয়েছেন এ ধরনের মামলা মুলতবি ছাড়াই চলবে, আইনমন্ত্রী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, এই রাষ্ট্রীয় মনোযোগ কি কেবল সেই মামলাগুলোই পায়, যেগুলো গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তোলে?
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নির্ধারিত সময়ে মামলা নিষ্পত্তি না হলে ট্রাইব্যুনালের বিচারককে তিন কার্যদিবসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে লিখিত ব্যাখ্যা পাঠানোর বিধান ২০২৫ সালের সংশোধনীতে যুক্ত হয়েছে। বাস্তবে কতগুলো ব্যাখ্যা জমা পড়েছে, কতগুলোর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে — সেই তথ্য জনসমক্ষে নেই। জবাবদিহির বিধান আছে, জবাবদিহির হিসাব নেই।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি আরও অস্বস্তিকর। একদিনে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ, পরদিন আত্মপক্ষ সমর্থন, তার পরদিন যুক্তিতর্ক — এই গতিতে আসামিপক্ষের কার্যকর আইনি প্রতিরক্ষার সুযোগ কতটা ছিল? মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত নিখুঁততা কেবল আসামির অধিকার নয়, রায়ের টেকসই হওয়ারও শর্ত। উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স আটকে থাকার ঝুঁকিও সেখানেই।
যা আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে
রামিসা খুন হয়েছে স্কুল থেকে ফেরার পথে, নিজের বাসার পাশের ফ্ল্যাটে। ঘটনাটি অপরিচিত কোনো “বহিরাগত অপরাধীর” নয় — প্রতিবেশীর। শিশু সুরক্ষার আলোচনা যখন কেবল ফাঁসির দাবিতে গিয়ে ঠেকে, তখন প্রতিরোধের প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে যায়: আবাসিক এলাকায় শিশু নিরাপত্তা, স্কুলের যাওয়া-আসার পথ, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের সক্ষমতা, ফরেনসিক পরীক্ষার সময়, ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর মামলা তুলে নেওয়ার চাপ।
নির্বাচনের আগে ইউনিসেফের শিশু অধিকার ইশতেহারে স্বাক্ষর করেছিল ১২টি রাজনৈতিক দল। ছয় মাস পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন-অগ্রগতি নিয়ে কোনো দল প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।
রামিসার মামলায় রাষ্ট্র প্রমাণ করেছে, ইচ্ছা থাকলে ২০ দিনে বিচার সম্ভব। এখন প্রমাণের বাকি কঠিন অংশটি — গণমাধ্যমের আলো না পড়া মামলাগুলোতেও একই গতি, একই আইনজীবী প্যানেল, একই মন্ত্রীর তাগিদ থাকে কি না।
একটি ফাঁসি বিচারহীনতার অবসান নয়। বিচারহীনতার অবসান তখনই, যখন ধর্ষণের শিকার হওয়া প্রতিটি শিশুর জন্য অন্তত একটি মামলা হয়।
আপনার মতামত জানানঃ