
১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী। পরীক্ষা শেষ হয়েছে, ফল প্রস্তুত — কিন্তু তারিখ বদলেছে তিনবার। এসএসসি ও সমমানের ফল নিয়ে গত দেড় মাসের টানাপড়েনটি নিছক প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; এটি শিক্ষা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ার একটি ছোট কিন্তু স্পষ্ট এক্স-রে।
তারিখের কালপঞ্জি
৮ জুন — সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঘোষণা দেন, ফল প্রকাশিত হবে ২০ জুলাই। সংশ্লিষ্টদের সে অনুযায়ী নির্দেশ দেওয়া হয়।
১৮ জুলাই — আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, ২০ জুলাই ফল প্রকাশ হচ্ছে না; তবে জুলাইয়ের মধ্যেই তারা প্রস্তুত থাকবেন। কারণ হিসেবে গণমাধ্যমে আসে চলমান এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে প্রশাসনিক জটিলতা — আর ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বোর্ডগুলোর ভাষায় “সাম্প্রতিক অস্থিরতা”।
২২ জুলাই — বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, কারিগরি প্রস্তুতি শেষ করতে ২৭-২৮ জুলাই পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। মন্ত্রণালয়ের সূত্র ধরে গণমাধ্যমে আসে সম্ভাব্য তারিখ ৩০ জুলাই। ফেসবুকে “৩০ জুলাই ফল” প্রচার ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড আলাদা করে সেটিকে ভুল তথ্য বলে জানায়।
২৭ জুলাই — চূড়ান্ত ঘোষণা: ফল প্রকাশিত হবে ১০ আগস্ট, সকাল ১০টায়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আব্দুল খালেকও তারিখটি নিশ্চিত করেন।
অর্থাৎ মন্ত্রীর ঘোষিত তারিখ থেকে প্রকৃত তারিখ পিছিয়েছে তিন সপ্তাহ। এবারের পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডের অধীনে এসএসসিতে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন, মাদ্রাসা বোর্ডের দাখিলে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন এবং কারিগরি বোর্ডে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২১ এপ্রিল।
“অস্থিরতা” বলতে আসলে কী
বোর্ডের ভাষ্যে যে “অস্থিরতা”, তার উপাদান মূলত তিনটি — এবং তিনটিই জুলাই মাসের।
এক, বন্যা। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে চট্টগ্রাম বোর্ডের অধীন পাঁচ জেলার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত হয়। ১৭ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম বোর্ডের সব জেলার পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়; পরিস্থিতির উন্নতি হলে ২৭ জুলাই থেকে ফের শুরু হয়। ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত পাঁচটি বিষয়ের পরীক্ষা নতুন করে নেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে।
দুই, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। সারা দেশে পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও হয়। ছাত্রদল পরিস্থিতি অনুকূলে না আসা পর্যন্ত এইচএসসি ও বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা সাময়িক স্থগিতের দাবি জানায়। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সব জেলার পরীক্ষা স্থগিত করা সম্ভব নয় জানিয়ে দেয়।
তিন, প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক। ২৭ জুলাই এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার সৃজনশীল অংশের দুটি প্রশ্ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে; ঢাকা বোর্ড বিষয়টি অবগত আছে জানিয়ে বিবৃতি দেয়।
একই কর্মকর্তারা, একই বোর্ড অবকাঠামো একসঙ্গে এইচএসসির সংকট সামলাচ্ছে আর এসএসসির ফল তৈরি করছে। ফলে বিলম্বের প্রকৃত কারণ “অস্থিরতা” নয় — অস্থিরতা সামলানোর মতো উদ্বৃত্ত সক্ষমতার অভাব।
যে প্রশ্নগুলো তোলা দরকার
তারিখ ঘোষণা করে কে? ৮ জুন মন্ত্রী তারিখ দিয়েছিলেন, আর ১৮ জুলাই বোর্ড জানিয়েছে সেটি সম্ভব নয়। প্রশাসনিক প্রস্তুতি যাচাই করে তারিখ ঘোষণা হলে এই তিন দফা পিছিয়ে যাওয়ার দরকার হতো না। ফল প্রকাশের তারিখ একটি কারিগরি সিদ্ধান্ত; সেটিকে মন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের বিষয়বস্তু বানানোই সমস্যার শুরু।
তথ্যশূন্যতা কে পূরণ করছে? সরকারি ঘোষণা যত অনিশ্চিত হয়, ফেসবুকভিত্তিক গুজব তত সংগঠিত হয়। “৩০ জুলাই ফল” প্রচারটি ঢাকা বোর্ডকে আলাদা করে খণ্ডন করতে হয়েছে। ১৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের জন্য এই অনিশ্চয়তার মূল্য শুধু উদ্বেগ নয় — একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি, কলেজ বাছাই, অনেকের ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক পরিকল্পনাও এর সঙ্গে জড়িত।
জলবায়ু-ঝুঁকি কি পরীক্ষার ক্যালেন্ডারে আছে? জুলাই-আগস্টের বন্যা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বার্ষিক বাস্তবতা। তবু পরীক্ষার সময়সূচি প্রতিবার সেই বাস্তবতার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সামলানো হয়। বিকল্প কেন্দ্র, স্থগিত পরীক্ষার আগাম পুনঃসূচি, বোর্ডভিত্তিক আলাদা ক্যালেন্ডার — এসব নিয়ে নীতিগত আলোচনা কার্যত অনুপস্থিত।
১০ আগস্ট ফল প্রকাশিত হলে আলোচনা ঘুরে যাবে পাসের হার ও জিপিএ-৫-এর সংখ্যায়। কিন্তু এবারের ফল-বিলম্বের গল্পটি নম্বরের নয়, ব্যবস্থাপনার। বন্যা ও আন্দোলন দুটোই বাইরের ধাক্কা; প্রশ্নটি হলো, ধাক্কা সামলানোর মতো শিক্ষা প্রশাসন আমরা গড়ছি কি না।
আপনার মতামত জানানঃ