
শ্রেণিকক্ষকে সাধারণত এমন একটি পরিসর হিসেবে কল্পনা করা হয়, যেখানে শিশুর পরিচয় নয়, তার কৌতূহলই প্রধান। ধর্ম, জাতপাত, ভাষা বা পারিবারিক রাজনৈতিক বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে সেখানে শেখানো হবে যুক্তি, সহাবস্থান ও নাগরিকতা। কিন্তু দক্ষিণ কলকাতার একটি স্কুলে এক ছাত্রের কপাল থেকে চন্দনের তিলক মুছে দেওয়ার অভিযোগ দেখিয়ে দিল—বাইরের সমাজে পরিচয় নিয়ে যে টানাপোড়েন, তা এখন শ্রেণিকক্ষের দরজাতেও এসে দাঁড়িয়েছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি মিশনারি স্কুলের শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিলক পরে আসায় তিনি এক ছাত্রকে নিয়মিত তা মুছে মুখ ধুয়ে শ্রেণিকক্ষে ফিরতে বলতেন। ছাত্রটি সামাজিক মাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করলে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর নথিভুক্ত হয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে বলেন, বাংলায় এমন ঘটনা চলবে না। তবে অভিযোগের বিচারিক সত্য এখনো নির্ধারিত হয়নি; তদন্ত শেষ হওয়ার আগে শিক্ষককে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি শিশুটির অভিযোগকে রাজনৈতিক সুবিধামতো তুচ্ছ করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি স্কুলের শৃঙ্খলা ও একজন শিক্ষকের আচরণের প্রশ্ন। কিন্তু প্রতিক্রিয়ার গতি এবং ভাষা একে দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক বিরোধে রূপ দিয়েছে। ‘তিলক’ এখানে আর শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক চিহ্ন থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয়ের মর্যাদা, মিশনারি প্রতিষ্ঠানের চরিত্র এবং নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার যাচাইয়ের প্রতীক। প্রশ্নটি তাই কেবল একজন শিক্ষক কেন তিলক মুছতে বললেন, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো—একজন শিশুর কপালের চিহ্নকে ঘিরে রাষ্ট্র, দল ও সামাজিক মাধ্যম কেন এত দ্রুত নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ঘোষণা করতে বাধ্য হলো?
ভারতের সংবিধান একদিকে ব্যক্তিকে বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্ম পালন ও প্রকাশের অধিকার দেয়; অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষাদান এবং কোনো শিক্ষার্থীকে ধর্মীয় আচার বা উপাসনায় বাধ্য করার বিষয়ে সীমা নির্ধারণ করে। কিন্তু ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয় বহন করা এবং প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ধর্মীয় অনুশীলন চাপিয়ে দেওয়া একই বিষয় নয়। একজন ছাত্র স্বেচ্ছায় তিলক, হিজাব, পাগড়ি বা ছোট ক্রুশ ধারণ করলে তার স্বাধীনতা ও বিদ্যালয়ের অভিন্ন পোশাকনীতি—দুটির মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে হবে, সেটিই আসল নীতিগত প্রশ্ন।
স্কুলের শৃঙ্খলা প্রয়োজন। পোশাক, নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রতিষ্ঠান যুক্তিসঙ্গত নিয়ম করতেই পারে। কিন্তু কোনো নিয়ম তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন সেটি আগেই লিখিত, প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সব ধর্ম ও পরিচয়ের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রয়োগ করা হয়। শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মের দৃশ্যমান চিহ্নকে লক্ষ্য করলে তা আর নিরপেক্ষ শৃঙ্খলা থাকে না; বৈষম্যের আশঙ্কা তৈরি করে। আবার রাজনৈতিক চাপের মুখে এক ধর্মের চিহ্নকে বিশেষ ছাড় দিয়ে অন্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখলেও সমতার নীতি ভেঙে পড়ে।
এই কারণেই তিলক-বিতর্কের ন্যায়সংগত পরীক্ষা খুব সহজ: একই স্কুলে কোনো শিখ ছাত্রের পাগড়ি, কোনো মুসলিম ছাত্রীর হিজাব, কোনো খ্রিষ্টান শিক্ষার্থীর ক্রুশ কিংবা কোনো আদিবাসী শিশুর সাংস্কৃতিক চিহ্নের ক্ষেত্রে কি একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে? উত্তর যদি পরিচয়ভেদে বদলে যায়, তবে বিষয়টি ধর্মীয় স্বাধীনতার নয়; সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিশেষ অধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়। আর যদি সব চিহ্ন নির্বিচারে নিষিদ্ধ করা হয়, তবে প্রতিষ্ঠানকে দেখাতে হবে সেই নিষেধাজ্ঞা শিক্ষা বা নিরাপত্তার জন্য কেন অপরিহার্য এবং কম সীমাবদ্ধ কোনো উপায় কেন যথেষ্ট নয়।
ভারতের আদালতও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাকনীতি ও ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতার সংঘাত নিয়ে ভিন্ন পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করেছে। ২০২৪ সালে মুম্বাইয়ের একটি কলেজের হিজাব, বোরকা, নকাব ও টুপি নিষিদ্ধকারী নির্দেশ আংশিক স্থগিত করে সুপ্রিম কোর্ট শিক্ষার্থীদের পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতার কথা বলেছিল। আবার আদালত শৃঙ্খলা ও প্রতিষ্ঠানের যুক্তিসঙ্গত বিধির প্রয়োজনও পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। অর্থাৎ সাংবিধানিক ভারসাম্য কোনো এক ধর্মীয় চিহ্নকে কেন্দ্র করে নয়; মর্যাদা, সমতা, স্বাধীনতা ও প্রতিষ্ঠানের বৈধ প্রয়োজন—সবগুলোকে একসঙ্গে বিচার করার দাবি রাখে।
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র কোনো দল, সরকার কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়—একটি শিশু। বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক ক্ষমতাবান এবং একজন ছাত্র তুলনামূলকভাবে অসহায়। শিশুর শরীর বা বিশ্বাসসংক্রান্ত কোনো চিহ্ন অপমানজনকভাবে মুছে দেওয়া হয়ে থাকলে সেটি শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; শিশুর মর্যাদা ও মানসিক নিরাপত্তার প্রশ্নও। সহপাঠীদের সামনে বারবার আলাদা করে দেওয়া, মুখ ধুয়ে আসতে বলা বা পরিচয়ের জন্য লজ্জা দেওয়ার অভিজ্ঞতা একটি শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী আঘাত তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে শিশুটির অভিজ্ঞতাকে রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত করাও সমান উদ্বেগজনক। সামাজিক মাধ্যমে পরিচয় প্রকাশ, ঘটনার ভিডিও বারবার প্রচার এবং দলীয় প্রচারণায় শিশুকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার তার গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া, তাকে কোনো রাজনৈতিক শিবিরের মুখ বানানো নয়।
পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম ও শিক্ষার সম্পর্ক নতুন নয়। ঔপনিবেশিক যুগ থেকে মিশনারি স্কুল, হিন্দু ও মুসলিম পরিচালিত প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয় পাশাপাশি গড়ে উঠেছে। বহু মিশনারি প্রতিষ্ঠান ধর্মনির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়েছে এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জন করেছে। একইভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পরিচালিত স্কুলও আধুনিক শিক্ষায় ভূমিকা রেখেছে। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে সব মিশনারি প্রতিষ্ঠান কিংবা পুরো ধর্মীয় সম্প্রদায় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত টানা ইতিহাস ও বাস্তবতা—দুটিকেই বিকৃত করবে।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে এমন সংযম সহজ নয়। পরিচয়কেন্দ্রিক ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত দুই বিপরীত গল্পে ভাগ হয়ে যায়। এক পক্ষ ঘটনাটিকে হিন্দু পরিচয়ের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরে; অন্য পক্ষ পুরো অভিযোগকে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী প্রচারণা বলে বাতিল করতে চায়। এই দুই অবস্থানের মাঝখানে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়—স্বাধীন তদন্ত, স্কুলের লিখিত নীতি, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং শিশুর সুরক্ষা—আড়ালে চলে যায়।
মুখ্যমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ একটি অভিযোগের গুরুত্ব স্বীকার করেছে। কিন্তু প্রশাসনিক তৎপরতা তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন একই ধরনের অভিযোগে ভুক্তভোগীর ধর্ম দেখে প্রতিক্রিয়ার মাত্রা বদলাবে না। তিলক অপসারণে এফআইআর হলে হিজাব খুলতে বাধ্য করা, পাগড়ি নিয়ে উপহাস, ক্রুশ পরায় অপমান কিংবা ধর্মীয় আচার পালনে চাপ দেওয়ার অভিযোগও একই গুরুত্বে তদন্ত করতে হবে। আইনের নিরপেক্ষতা কথায় নয়, তুলনাযোগ্য ঘটনায় সমান আচরণের মধ্যেই প্রমাণিত হয়।
এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ। ‘বাংলায় এসব চলবে না’—এমন বক্তব্য ভুক্তভোগীকে আশ্বাস দিতে পারে। কিন্তু বক্তব্যটি যদি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে অনিরাপত্তা বাড়াতে পারে। সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে, বাংলায় কোনো শিশুকেই তার ধর্ম, ভাষা, জাতপাত বা সংস্কৃতির কারণে অপমান করা চলবে না। ব্যক্তিকে নয়, নীতিকে রক্ষা করাই সাংবিধানিক রাষ্ট্রের কাজ।
স্কুলগুলোও কেবল ঘটনা ঘটার পর শাস্তি দিয়ে দায় শেষ করতে পারে না। তাদের প্রকাশ্য ও বৈষম্যহীন পোশাকনীতি, অভিযোগ জানানোর শিশুবান্ধব ব্যবস্থা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ প্রয়োজন। কোনো চিহ্ন নিয়ে আপত্তি থাকলে শিক্ষক শিশুকে প্রকাশ্যে অপমান না করে অভিভাবক ও প্রশাসনের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করবেন। আর নিয়মটি বৈষম্যমূলক হলে সেটিই পরিবর্তন করতে হবে।
শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত ও এফআইআর তদন্তের পথ খুলেছে, কিন্তু এগুলো নিজে চূড়ান্ত বিচার নয়। স্কুলের সিসিটিভি, অন্য শিক্ষার্থীর সাক্ষ্য, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানের লিখিত বিধি এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা যাচাই করতে হবে। রাজনৈতিক চাপ যেন তদন্তের বিকল্প না হয় এবং সামাজিক মাধ্যম যেন আদালতের ভূমিকা না নেয়—এটি নিশ্চিত করাও জরুরি।
শ্রেণিকক্ষ পুরোপুরি পরিচয়শূন্য কোনো স্থান নয়। শিশুরা পরিবার, ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল ও সংস্কৃতির পরিচয় নিয়েই সেখানে আসে। শিক্ষার কাজ সেই পরিচয় মুছে দেওয়া নয়; পরিচয়ের পার্থক্য সত্ত্বেও সমান মর্যাদায় একসঙ্গে থাকার শিক্ষা দেওয়া। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মীয় মানুষকে অদৃশ্য করা নয়, আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম বানানোও নয়। এর অর্থ—রাষ্ট্র ও বিদ্যালয় কারও বিশ্বাস চাপিয়ে দেবে না এবং কারও বিশ্বাসের কারণে তাকে হেয় করবে না।
দক্ষিণ কলকাতার ঘটনাটি তাই একটি সতর্কবার্তা। সঠিকভাবে মোকাবিলা করা হলে এটি স্কুলে স্পষ্ট, সমতাভিত্তিক ও শিশুকেন্দ্রিক নীতি তৈরির সুযোগ হতে পারে। আর দলীয় মেরুকরণের অস্ত্র বানানো হলে প্রতিটি তিলক, হিজাব, পাগড়ি কিংবা ক্রুশ নতুন রাজনৈতিক সংঘাতের উপলক্ষ হবে। তখন বিদ্যালয় জ্ঞান ও সহাবস্থানের জায়গা না থেকে পরিচয়ের শক্তি পরীক্ষার মঞ্চে পরিণত হবে।
পশ্চিমবঙ্গের সামনে আসল নির্বাচন তিলক রাখা না মোছার মধ্যে নয়। নির্বাচন হলো—শিশুর স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে কেন্দ্র করে একটি অভিন্ন নীতি তৈরি করা, নাকি প্রতিটি ধর্মীয় চিহ্নকে ভোটের ভাষায় অনুবাদ করা। শ্রেণিকক্ষকে যুদ্ধক্ষেত্র হওয়া থেকে বাঁচাতে হলে প্রথম পথটিই বেছে নিতে হবে।
আপনার মতামত জানানঃ