
পদত্যাগের কালি শুকাতে না শুকাতেই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে একযোগে দুটি ফ্রন্টে অভিযোগ উঠছে—একদিকে দুর্নীতি, অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানকালে নীরব থেকে সহযোগিতার অভিযোগ। প্রশ্ন হলো, সংবিধান তাকে যে সুরক্ষা দিয়েছিল, তা কি এখনো তাকে ঘিরে রাখবে, নাকি বিদায়ের পর সেই ঢাল সরে যাবে?
যেভাবে বিদায় নিলেন সাহাবুদ্দিন
গত ২৪ জুলাই বিকেলে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ-এর কাছে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র জমা দেন সাহাবুদ্দিন, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে। ব্যক্তিগত অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে তিনি সংক্ষেপে বলেন, “আই অ্যাম সিক, সো ইট ইজ ডান।” পদত্যাগের আগে বেশ কিছুদিন ধরেই গুঞ্জন চলছিল, আর তা সত্যি প্রমাণিত হওয়ার প্রেক্ষাপটেই স্পিকার নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগে বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরেন। সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারই এখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন, আর সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে—অর্থাৎ ২৪ অক্টোবরের মধ্যে—নতুন নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
দুর্নীতির পুরনো অভিযোগ নতুন করে সামনে
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার এবং পরবর্তীতে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো সরকার এখন গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে দেখছে। তবে তিনি এ-ও বলেছেন, অভিযোগকারীদের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা-ও বিবেচনায় নেওয়া হবে—অর্থাৎ অভিযোগের পেছনে সৎ উদ্দেশ্য ছিল নাকি রাজনৈতিক, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।
ট্রাইব্যুনালে পৃথক অভিযোগ
একই সপ্তাহে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় পৃথকভাবে দুটি অভিযোগ দাখিল হয়েছে। বাংলাদেশ আজাদ পার্টি ও রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের পক্ষ থেকে দাখিল করা এসব অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ, নির্যাতন ও গুমের সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নীরব থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে পরোক্ষে সহায়তা করেছেন সাহাবুদ্দিন। একই অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বিরুদ্ধেও পৃথক অভিযোগ দাখিল হয়েছে।
সাংবিধানিক দায়মুক্তির অস্পষ্ট উত্তর
বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানেই। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা সরাসরি প্রশ্ন তোলেন—রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের জন্য সাংবিধানিক দায়মুক্তি থাকা সত্ত্বেও সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে কি না। আইনমন্ত্রীর জবাব ছিল কার্যত এড়িয়ে যাওয়ার মতো: “যখন ব্যাখ্যার প্রয়োজন আসবে, তখন ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে।” তিনি শুধু এটুকু বলেছেন, আইনে রাষ্ট্রপতির জন্য যে সুরক্ষা আছে, তা বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থাৎ সরকার এখনো স্পষ্ট কোনো আইনি অবস্থান নেয়নি—দায়িত্ব পালনকালীন কাজের জন্য তাকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে, নাকি ভিন্ন পথে অভিযোগ এগিয়ে নেওয়া হবে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
এই ঘটনা নিছক একজন ব্যক্তির বিদায়-উত্তর জবাবদিহিতার প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশে এই প্রথমবার একজন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে একযোগে দুর্নীতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সামনে এলো, ঠিক যে সময়ে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদে সাংবিধানিক দায়মুক্তির সীমারেখা কোথায়—তা নিয়েই স্পষ্টতার অভাব দেখা যাচ্ছে। আইনমন্ত্রীর অস্পষ্ট উত্তর ইঙ্গিত দেয়, সরকার এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি কীভাবে বিষয়টি সামলাবে—এবং এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি পদের দায়মুক্তির সীমা সম্পর্কে একটি নজির তৈরি করবে।
পরবর্তী নজর রাখার বিষয়
আগামী দিনগুলোতে দেখার বিষয় হলো, সরকার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দুদকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে কিনা এবং আইনমন্ত্রী কখন ও কীভাবে সাংবিধানিক দায়মুক্তির প্রশ্নে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন তা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নজর রাখা দরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগ আমলে নেয় কিনা, এবং ২৪ অক্টোবরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া কোন দিকে গড়ায়।
আপনার মতামত জানানঃ