একটি দেশের নিরাপত্তা কেবল তার সেনাবাহিনীর শক্তির ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেই দেশের নাগরিকদের মানসিক প্রস্তুতি, জাতীয় পরিচয়ের বোধ এবং সংকটের সময় রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছার ওপরও। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ জনগণ কেবল সৈনিক হিসেবেই নয়, বরং সাধারণ নাগরিক হিসেবেও দেশের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু কয়েক দশক পর সেই ব্রিটেনেই ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, যুক্তরাজ্য সরাসরি সামরিক আক্রমণের শিকার হলেও দেশটির ৯৪ শতাংশ নাগরিক স্বেচ্ছায় অস্ত্র হাতে তুলে নিতে রাজি নন। সংখ্যাটি শুধু একটি জরিপের ফল নয়; এটি আধুনিক ইউরোপীয় সমাজের মানসিক পরিবর্তন, নিরাপত্তা-চিন্তার রূপান্তর এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের নতুন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
বর্তমান বিশ্বে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ন্যাটোর প্রতিরক্ষা কৌশলের পরিবর্তন এবং রাশিয়াকে ঘিরে ইউরোপের নিরাপত্তা উদ্বেগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ব্রিটিশ সরকারও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো, সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং যুদ্ধ প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করছেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সাইবার হামলা, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আঘাতের মাধ্যমে তা সাধারণ মানুষের জীবনেও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এই সতর্কতার বিপরীতে জনমতের চিত্র ভিন্ন কথা বলছে।
ইউগভ পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় সংকটের মুহূর্তে মাত্র ৬ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে আগ্রহী। অন্যদিকে অর্ধেকের বেশি মানুষ জানিয়েছেন, বয়স, শারীরিক অসুস্থতা বা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে তারা যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত নন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, রাষ্ট্র বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা চালু করলেও মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ তাতে অংশ নিতে রাজি। বিপরীতে ১৭ শতাংশ মানুষ স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশ এলেও তারা অস্ত্র হাতে নেবেন না। এই পরিসংখ্যান শুধু যুদ্ধবিমুখতার নয়, বরং নাগরিকদের মানসিক অগ্রাধিকার কীভাবে বদলে গেছে, তারও একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দীর্ঘস্থায়ী শান্তির অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ মূল ভূখণ্ডে আর কোনো প্রত্যক্ষ সামরিক আগ্রাসন ঘটেনি। কয়েক প্রজন্ম ধরে মানুষ যুদ্ধকে বইয়ের ইতিহাস, চলচ্চিত্র কিংবা টেলিভিশনের খবর হিসেবেই দেখেছে। ফলে যুদ্ধের বাস্তবতা তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠেনি। যেসব দেশে যুদ্ধের স্মৃতি এখনও জীবন্ত, সেখানে নাগরিকদের মানসিক প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। কিন্তু ব্রিটেনে সেই অভিজ্ঞতা অনুপস্থিত।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। চল্লিশ বছরের কম বয়সীদের একটি বড় অংশ মনে করে, আধুনিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব; ব্যক্তিগতভাবে অস্ত্র হাতে নেওয়া তাদের কর্তব্য নয়। এই প্রজন্মের কাছে ক্যারিয়ার, শিক্ষা, প্রযুক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুদ্ধ তাদের কাছে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা নয়।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই মনোভাব গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ব্রিটিশ নাগরিকের কাছে সামরিক আগ্রাসনের চেয়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক বড় উদ্বেগ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকট, জ্বালানির দাম এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ মানুষের চিন্তার কেন্দ্রে চলে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনও তাদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ। ফলে যুদ্ধের সম্ভাবনা তাদের কাছে তুলনামূলকভাবে দূরের একটি বিষয়।
আরও একটি কারণ হলো রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে জনসাধারণের আস্থার সংকট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা বাজেট, সেনা সদস্য সংখ্যা এবং সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বহু বিশ্লেষক মনে করেন, দীর্ঘদিনের বাজেট সংকোচনের ফলে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে। যখন জনগণ নিজের দেশের সামরিক প্রস্তুতি নিয়েই পুরোপুরি আশ্বস্ত নয়, তখন যুদ্ধের সময় ব্যক্তিগতভাবে ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহও কমে যাওয়া স্বাভাবিক।
অন্যদিকে ইউরোপের কিছু দেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ অনুসরণ করছে। ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে এবং পোল্যান্ডের মতো দেশগুলো রাশিয়ার নিকটবর্তী হওয়ায় নিরাপত্তা ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ফিনল্যান্ডের প্রায় প্রতিটি পরিবারকে জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। কোথায় বোমা আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে, কীভাবে খাদ্য মজুত রাখতে হবে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে কীভাবে টিকে থাকতে হবে—এসব বিষয়ে জনগণকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সুইডেনও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।
পোল্যান্ডের প্রস্তুতি আরও ব্যাপক। দেশটি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তাদের রিজার্ভ বাহিনী পাঁচ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। নরওয়ে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী শক্তিশালী করছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, ভৌগোলিক অবস্থান এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি জনগণের মানসিক প্রস্তুতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
যুক্তরাজ্যের জনগণের মনোভাবের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো দ্বৈত অবস্থান। একদিকে তারা প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা বা সামাজিক কল্যাণ খাতের বাজেট কমিয়ে সেই অর্থ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করতে রাজি নন। অর্থাৎ তারা একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী চান, কিন্তু সেই শক্তি গড়ে তোলার জন্য ব্যক্তিগত ত্যাগ কিংবা সামাজিক ব্যয়ের পুনর্বিন্যাসে আগ্রহী নন। এই অবস্থান নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় যুদ্ধের ধরনও বদলে গেছে। এখন যুদ্ধ মানেই শুধু সীমান্তে ট্যাংক বা সৈন্যের সংঘর্ষ নয়। সাইবার আক্রমণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ব্যবস্থা এবং তথ্যযুদ্ধ আধুনিক সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক নাগরিক মনে করেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে প্রযুক্তিনির্ভর এবং সেখানে সাধারণ মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার প্রয়োজন আগের তুলনায় কম হবে। এই ধারণাও যুদ্ধে অংশগ্রহণের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আধুনিক পশ্চিমা সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মূল্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। রাষ্ট্রের জন্য আত্মত্যাগের ধারণা এখনও পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি, তবে তার রূপ বদলেছে। মানুষ এখন স্বেচ্ছাসেবা, মানবিক সহায়তা, চিকিৎসা কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে বেশি আগ্রহী; সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার মানসিকতা তুলনামূলকভাবে কম।
ব্রিটিশ সমাজের এই পরিবর্তন শুধু যুক্তরাজ্যের জন্য নয়, পুরো ইউরোপের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ শক্তিশালী সামরিক জোট থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে নাগরিকদের অংশগ্রহণ এবং জাতীয় ঐক্যের ওপর। যদি জনগণের একটি বড় অংশ যুদ্ধকে রাষ্ট্রের একক দায়িত্ব হিসেবে দেখে, তাহলে সংকটের সময় সেই ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে এটিও সত্য যে, জরিপের ফলাফল সবসময় বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায় না। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, সংকট শুরু হওয়ার আগে মানুষ যে মতামত দেয়, বাস্তবে যুদ্ধ শুরু হলে তাদের আচরণ ভিন্ন হতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও অনেকেই যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না। কিন্তু পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে লাখো মানুষ স্বেচ্ছায় দেশের প্রতিরক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। তাই বর্তমান জরিপকে সম্ভাব্য মানসিক অবস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে, ভবিষ্যতের নিশ্চিত চিত্র হিসেবে নয়।
সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক এই জরিপ আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। দীর্ঘ শান্তিকাল, অর্থনৈতিক উদ্বেগ, সামাজিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের ধারণা এবং রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে ব্রিটিশ জনগণের মধ্যে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই পরিস্থিতি সরকার ও সামরিক নেতৃত্বের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও রেখে দিয়েছে—শুধু উন্নত অস্ত্র ও প্রযুক্তি দিয়ে কি একটি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব, নাকি শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে থাকে সেই দেশের মানুষের মানসিক প্রস্তুতি এবং সংকটের মুহূর্তে একসঙ্গে দাঁড়ানোর ইচ্ছা? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ