
প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কোনো না কোনো পয়েন্টে একই খবর আসছে—বিএসএফ কাউকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, আর বিজিবি তা প্রতিহত করেছে। এই ঘটনা কি বিচ্ছিন্ন সীমান্ত সংঘর্ষ, নাকি এর পেছনে গভীরতর কূটনৈতিক টানাপোড়েন কাজ করছে?
সাম্প্রতিক ঘটনার তালিকা
জুলাই মাসেই একাধিক জেলায় “পুশ-ইন” চেষ্টার খবর এসেছে—সিলেটের কোম্পানিগঞ্জে ৭ জন, ঝিনাইদহের মহেশপুরে ৬ জন (৪ পুরুষ, ২ নারী), কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে, চুয়াডাঙ্গায় ৫ জন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে আলো নিভিয়ে করা এক প্রচেষ্টা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিরোধে তা ব্যর্থ হয়েছে বলে বিজিবির ভাষ্য। যশোরের বেনাপোল সীমান্তে সন্তানসহ আটকে পড়া ভারতের ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা রেশমার ঘটনা দেখিয়ে দেয়, এই “পুশ-ইন” শুধু পরিসংখ্যান নয়—এর পেছনে বাস্তব মানুষের ভোগান্তি জড়িয়ে আছে।
সংখ্যায় সমস্যার ব্যাপ্তি
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ভারত থেকে অন্তত ২,৩০০ থেকে ২,৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এদের সবাই বাংলাদেশি নন—অন্তত ১২০ থেকে ১২৬ জনকে পরবর্তীতে ভারতীয় নাগরিক এবং কিছু সংখ্যককে রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। শুধু জুনের প্রথম দুই সপ্তাহেই বিজিবি ৩০টির বেশি পুশ-ইন প্রচেষ্টা রুখে দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
দুই দেশের ভিন্ন অবস্থান
গত ৯-১১ জুন নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে দুই পক্ষ একেবারে বিপরীত অবস্থান তুলে ধরে। বাংলাদেশের ভাষ্য—এই পুশ-ইন অবৈধ, অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান, তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইন ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের প্রত্যাবাসন করছে মাত্র। বিজিবিপ্রধান স্পষ্ট করেছেন, যাচাই-প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত হওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের তারা ফেরত নেবে, তবে বিএসএফকে অবিলম্বে পুশ-ইন বন্ধ করে দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল মানতে হবে। বিএসএফ পাল্টা বলেছে, বাংলাদেশকে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে হবে।
শুধু মানুষ নয়, অবকাঠামো নিয়েও বিরোধ
পুশ-ইনের বাইরেও বাংলাদেশ সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া, সড়ক নির্মাণ ও সীমান্ত চৌকি তৈরির অভিযোগ তুলে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সময়ে মোট ৬৮টি স্থানে এমন অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে বলে ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে—যার মধ্যে ৩৯টি কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, ৩৩টি সড়ক নির্মাণ বা মেরামত এবং ২৭টি সীমান্ত চৌকি স্থাপনের চেষ্টা সংক্রান্ত।
সীমান্ত হত্যাও আলোচনায়
পুশ-ইনের পাশাপাশি নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের সীমান্তে হত্যা, আহত করা ও নির্যাতনের ঘটনা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও বৈঠকে অগ্রাধিকার পেয়েছে। এটি বহু বছর ধরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সম্পর্কের একটি দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার জায়গা, যা পুশ-ইন ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাজনৈতিক মাত্রা
এই ইস্যু নিছক আমলাতান্ত্রিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। জামায়াতে ইসলামী ও তার ১১-দলীয় জোট, যার মধ্যে এনসিপিও রয়েছে, এই পুশ-ইনকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি ও মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে, একে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরে। এর ফলে একটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সমস্যা একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে দ্বিপক্ষীয় কাঠামো (কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান, যৌথ নির্দেশিকা) দুই দেশ আগে সম্মত হয়েছিল, পুশ-ইনের ধারাবাহিকতা তার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্তের প্রতিটি অংশ, বিশেষত নদীবেষ্টিত এলাকা, সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়া বাস্তবে কঠিন বলে বিএসএফ কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন। একই সময়ে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে, আর নবায়ন আলোচনা ইতিমধ্যে জলপ্রবাহ পরিমাপ নিয়ে জটিলতায় পড়েছে—অর্থাৎ সীমান্ত সমস্যা একটি বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনার অংশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পরবর্তী নজর রাখার বিষয়
আগামী নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় পরবর্তী বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে পুশ-ইন ইস্যুতে কোনো নির্দিষ্ট সমঝোতা হয় কিনা, তা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নজর রাখা দরকার জামায়াত-এনসিপি জোটের সীমান্তকেন্দ্রিক কর্মসূচি সরকারের ভারত-নীতিতে কোনো চাপ তৈরি করে কিনা, এবং গঙ্গা পানিচুক্তির নবায়ন আলোচনা কোন দিকে গড়ায়—কারণ এই দুটি বিষয় একসঙ্গে মিলিয়েই আগামী দিনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিকনির্দেশনা ঠিক হতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ