তিব্বতের বরফাবৃত পাহাড়ের কোলে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায়, এক গোপন গবেষণাগারে বিজ্ঞানীদের একটি দল অস্বাভাবিক এক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য দ্রুত বর্ধনশীল, আকারে বড়, রোগ প্রতিরোধক্ষম এবং বেশি প্রজননক্ষম—এমন এক ‘অভিজাত’ ইয়াক পাল তৈরি করা, যা প্রচলিত প্রজননের সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে সরাসরি ক্লোনিং প্রযুক্তির মাধ্যমে গড়ে তোলা হবে।
তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সরকারি সহায়তায় পরিচালিত এই প্রকল্পের লক্ষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে শতাধিক উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ক্লোন ইয়াক তৈরি করা। গবেষকদের দাবি অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি একদিকে তিব্বতের গৃহপালিত ইয়াক-নির্ভর অর্থনীতিকে আরও লাভজনক ও টেকসই করবে, অন্যদিকে বিলুপ্তপ্রায় বন্য ইয়াকের বিরল উপপ্রজাতি রক্ষাতেও সহায়তা করবে। এমনকি স্থানীয় তিব্বতিদের কাছে ভূমি দেবতার প্রিয় প্রাণী হিসেবে গণ্য বিরল সোনালি বন্য ইয়াককেও এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে।
ইয়াকের সঙ্গে তিব্বতি জনজীবনের সম্পর্ক শত শত বছরের পুরোনো। এই লম্বা লোমযুক্ত গবাদিপশু থেকে স্থানীয় কৃষক ও যাযাবরেরা পশম, দুধ ও মাংস সংগ্রহ করেন, জমি চাষ ও পণ্য পরিবহনেও তাদের ব্যবহার করা হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থলের অবক্ষয়, অনিয়ন্ত্রিত অন্তঃপ্রজনন এবং অন্য প্রজাতির সঙ্গে সংকরায়ণের ফলে বন্য ও গৃহপালিত—উভয় ধরনের ইয়াকই দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলার আশাতেই সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনা কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে ইয়াকের সংখ্যা ও গুণমান বাড়ানোর প্রকল্পে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রথম সফল ক্লোন ইয়াকের জন্ম হয়, যাকে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জিন নির্বাচন ও ক্লোনিং প্রযুক্তির সমন্বয়ে অর্জিত এক বড় বৈজ্ঞানিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে। এ বছরের বসন্তে জন্ম নেয় আরও দশটি ক্লোন ইয়াক। প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক প্রধান ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর জিনগত সম্পদবিষয়ক রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণকেন্দ্রের পরিচালক ফাং শেংগুও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই সাফল্য প্রমাণ করে যে ইয়াক ক্লোনিং প্রযুক্তি এখন আর একবারের পরীক্ষামূলক অর্জনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা স্থিতিশীল ও বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে এই প্রকল্প সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যের প্রায় সবটাই এসেছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে। গবেষণা পদ্ধতি, ব্যর্থ পরীক্ষা, প্রাণীর মৃত্যুহার বা নৈতিক তদারকি নিয়ে কোনো স্বাধীন তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও হয় তাদের অন্যত্র যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে, নয়তো কোনো সাড়া মেলেনি।
তিব্বতে প্রধানত দুই ধরনের ইয়াক আছে—বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা আইনি সুরক্ষাপ্রাপ্ত বন্য ইয়াক, আর অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গৃহপালিত ইয়াক। বিশ্বে বর্তমানে মাত্র ১০ থেকে ২০ হাজার বন্য ইয়াক টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়, যেখানে গত তিন দশকে তাদের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমেছে। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ গৃহপালিত ইয়াক রয়েছে, যাদের বড় অংশই তিব্বতি মালভূমির উঁচু এলাকায় বাস করে এবং যারা স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বহিরাগত উদ্ভিদের বিস্তার, খাদ্যের জন্য বাড়তি প্রতিযোগিতা এবং জিনগত বৈচিত্র্য হ্রাসের কারণে উভয় প্রজাতিই ক্রমাগত ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
ইয়াকের পশমজাত পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান শোকাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ক্যারল চিয়াউ বলেছেন, মালভূমির বাস্তুতন্ত্র অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে, যার ফলে হঠাৎ কোনো শীতকালীন ঝড়েই পুরো একটি ইয়াক পাল ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ফাং শেংগুও এক বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, গত এক দশকে ইয়াকের আকার-ওজন ও প্রজননক্ষমতা—উভয়ই কমেছে, প্রাকৃতিক প্রজনন-নিষেকের সফলতার হার নেমে এসেছে মাত্র ২০ শতাংশে। তাঁর মতে, মানুষের কর্মকাণ্ড ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এই সংকট মোকাবিলায় ক্লোনিং প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে।
ক্লোন তৈরির প্রক্রিয়াটি মোটামুটি এ রকম: সবচেয়ে সুস্থ ও কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি ইয়াককে ডিএনএ দাতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়, তার দেহকোষ থেকে কেন্দ্রক বের করে অন্য একটি ইয়াকের ডিম্বাণুর নিজস্ব কেন্দ্রক প্রতিস্থাপন করা হয় সেটি দিয়ে। এরপর তৈরি হওয়া ভ্রূণ একটি সারোগেট মা ইয়াকের জরায়ুতে বসিয়ে দেওয়া হয়, এবং গর্ভকাল শেষে জন্ম নেয় দাতা প্রাণীর জিনগতভাবে প্রায় অভিন্ন একটি ক্লোন। প্রথম সফল ক্লোনটি জন্ম নিয়েছিল সিজারিয়ান পদ্ধতিতে, আর পরের দশটি বাছুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে জন্মেছে—যদিও ‘স্বাভাবিক জন্ম’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
চীনা গবেষকদের যুক্তি, ক্লোনিং গৃহপালিত ইয়াক শিল্পে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা আনতে পারে, কারণ একটি স্ত্রী ইয়াক সাধারণত সারা জীবনে মাত্র চার-পাঁচটি বাচ্চা জন্ম দেয়, ফলে প্রাকৃতিক প্রজননে উন্নত বৈশিষ্ট্যের প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ানো কঠিন। তবে ঠিক কোন বৈশিষ্ট্যের জন্য—বেশি দুধ, মাংস, না নির্দিষ্ট পশমের জন্য—এই ক্লোন ইয়াক তৈরি করা হচ্ছে, তার বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
একই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে বিরল সোনালি বন্য ইয়াক রক্ষার প্রয়াসেও, যাদের সংখ্যা তিব্বতে মাত্র শ-তিনেকে ঠেকেছে। মৃত একটি সোনালি বন্য ইয়াকের কোষ থেকে তৈরি ভ্রূণ ইতিমধ্যে সারোগেট মায়ের জরায়ুতে বসানো হয়েছে, এবং এপ্রিলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, বন্য ইয়াক ও তাদের সংকর বংশধরের দুই শতাধিক ক্লোন ভ্রূণ তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এই অংশে কোনো ক্লোন সফলভাবে জন্ম নেওয়ার ঘোষণা আসেনি, এবং সারোগেট মায়েদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও কিছু জানা যায়নি।
প্রকল্পটি বিজ্ঞানী ও নীতি-নৈতিকতাবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের পশুচিকিৎসক ও জীব-নৈতিকতাবিদ লিসা মোজেসের মতে, এমন প্রকল্পের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বিচারে জানা দরকার—লক্ষ্য বাস্তবসম্মত কি না, প্রকৃত সংরক্ষণে তা কতটা কার্যকর হবে, জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে কি না, এবং প্রক্রিয়ায় প্রাণীরা কতটা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ক্লোনিংয়ের চেয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে মানুষ সাধারণত বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণে ক্লোনিংয়ের নজির নতুন নয়—২০২০ সালে সান দিয়েগো চিড়িয়াখানা বিপন্ন প্রজেওয়ালস্কি ঘোড়ার ক্লোন তৈরি করেছিল, আর কয়েক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত বিপন্ন ব্ল্যাক-ফুটেড ফেরেটের ক্লোনও প্রকাশ করা হয়। উলি ম্যামথ বা ডায়ার উলফের মতো বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার ‘ডি-এক্সটিংশন’ প্রকল্পগুলোও একই ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এসব প্রকল্প প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে এবং ভবিষ্যতে একই প্রযুক্তি মানুষের ওপর প্রয়োগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, ক্লোনিং-নির্ভরতা পরিবেশ রক্ষার প্রকৃত জরুরি কাজ—আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, কার্বন নিঃসরণ কমানো, শিকার বন্ধ করা—থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের বায়োমেডিকেল এথিকস বিশেষজ্ঞ জুলিয়ান সাভুলেস্কু তুলনামূলক ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, ক্লোনিং ও জিন নির্বাচনের মাধ্যমে যদি অধিক সুস্থ, দীর্ঘজীবী প্রাণী তৈরি করা যায়, তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু গ্রহণযোগ্যই নয়, নৈতিক দায়িত্বও হতে পারে। তবে তিনিও স্বীকার করেছেন যে ক্লোনিং এখনো অসম্পূর্ণ বিজ্ঞান, এবং এতে জন্ম নেওয়া প্রাণীর মধ্যে জিনগত অস্বাভাবিকতা বা স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দিতে পারে। তিনিই প্রশ্ন তোলেন, হাতেগোনা কিছু ‘অভিজাত’ ইয়াক তৈরির জন্য গবেষকরা কি বিপুলসংখ্যক প্রাণীর অপ্রয়োজনীয় দুর্ভোগ ডেকে আনছেন।
এই প্রশ্নগুলোর জবাব এখনো অজানা, কারণ চীনা ও তিব্বতি কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত সীমিত তথ্যই প্রকাশ করেছে। এগারোটি সফল ক্লোনের জন্মের আগে কতবার ভ্রূণ প্রতিস্থাপন ব্যর্থ হয়েছে, কতগুলো গর্ভপাত ঘটেছে, কতগুলো বাছুর মৃত বা বিকলাঙ্গ অবস্থায় জন্মেছে, কিংবা কতগুলো সারোগেট মা ইয়াক মারা গেছে—এসব তথ্য জানা যায়নি। একই জিনগত বৈশিষ্ট্যের বহু ক্লোন তৈরি করলে ইয়াকের সামগ্রিক জিনগত বৈচিত্র্য আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, অথচ এই ঝুঁকি এড়ানোর কোনো পরিকল্পনার কথাও প্রকাশ্যে বলা হয়নি। প্রকল্পটি কোন নৈতিক নীতিমালা মেনে চলছে বা এর কোনো স্বাধীন তদারকি সংস্থা আছে কি না, সে বিষয়েও কিছু জানা যায়নি।
ক্যারল চিয়াউর ভাষায়, প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সম্পর্কে আরও স্পষ্টতা দরকার—কৃষিশিল্পের জন্য তৈরি ক্লোন ইয়াকে ঠিক কোন বৈশিষ্ট্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং তা সামগ্রিক ইয়াক জনগোষ্ঠী ও তিব্বতের পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা মূল্যায়ন করা জরুরি। লিসা মোজেসের ভাষ্য, ভালো উদ্দেশ্যে নেওয়া অনেক পরিবেশ-সংক্রান্ত উদ্যোগ ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে, এবং আগের বহু প্রযুক্তির তুলনায় ক্লোনিং ও জিন নির্বাচনের অজানা ঝুঁকি অনেক বেশি।
শেষ পর্যন্ত তিব্বতের এই ‘সুপার ইয়াক’ প্রকল্প স্থানীয় অর্থনীতি ও বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণে সত্যিকারের সহায়ক হবে, নাকি হাতেগোনা কিছু উন্নত প্রাণী তৈরির জন্য ব্যাপক প্রাণিকল্যাণ ও পরিবেশগত ঝুঁকি ডেকে আনবে—তার উত্তর এখনো অমীমাংসিত। স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং স্বাধীন তদারকির অভাবই আপাতত এই প্রশ্নগুলোকে খোলা রেখেছে।
আপনার মতামত জানানঃ