
ক্ষমতায় আসার প্রথম দিনই তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা হবে তার সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। পাঁচ মাস পর পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। প্রশ্ন উঠছে—এই সহিংসতা কি বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাত, নাকি নিজ দলের ভেতরেই আধিপত্যের লড়াই?
জুনের হিসাব যা উদ্বেগজনক
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৮টি ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ৩৪৬ জন আহত হয়েছেন—মে মাসের তুলনায় (৫ নিহত, ২৮৯ আহত) যা স্পষ্ট বৃদ্ধি। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল: দলের ভেতরের ২১টি সংঘর্ষেই ৩ জন নিহত ও অন্তত ১৪৬ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ২ জন এবং বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে আরও ২ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন বিএনপির, তিনজন আওয়ামী লীগের এবং একজন উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, এসব সহিংসতার মূল কারণ এলাকাভিত্তিক আধিপত্য, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দলীয় কোন্দল ও চাঁদাবাজি। বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর-লুটপাট-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৪৫টি।
গ্রেপ্তারের সংখ্যায় ভারসাম্যহীনতা
একই মাসে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪,৭৭৫ জন—যার মধ্যে ১,৫৫৯ জন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের, ৩৫ জন বিএনপির এবং মাত্র ২ জন জামায়াতের। সহিংসতার পরিসংখ্যানের সঙ্গে গ্রেপ্তারের এই অনুপাত মিলছে না—এটি নিয়েই বিশ্লেষকদের মধ্যে “বাছাই করা ন্যায়বিচার” নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে দেশে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত ও ৭,০৮২ জন আহত হয়েছেন। এই সহিংসতার ৯১.৭ শতাংশের সঙ্গেই বিএনপি জড়িত ছিল বলে টিআইবি জানিয়েছিল, আওয়ামী লীগ ২০.৭ শতাংশ ও জামায়াত ৭.৭ শতাংশ।
অন্য মাত্রার সহিংসতাও বাড়ছে
শুধু দলীয় সংঘর্ষ নয়, গণপিটুনি ও মব-ভায়োলেন্সের চিত্রও ভয়াবহ। জুনে ৬৩টি ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩১ জন, আহত ৬৯ জন। হেফাজতে নির্যাতনে একজনের মৃত্যু হয়েছে গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হেফাজতে, আর “ক্রসফায়ারে” মারা গেছেন দুইজন। সাংবাদিকদের ওপর হামলা-হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৩৯টি, যাতে ভুক্তভোগী হয়েছেন ৪৭ জন সাংবাদিক।
দল নিজেই কী বলছে
বিএনপি নেতৃত্ব বারবার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ঠেকাতে হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে হাজারের বেশি নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে—৪০০-র বেশি বহিষ্কার, অন্তত ২০ জন বহিষ্কৃত। তবু চাঁদাবাজি, দখলদারি ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্যের লড়াই থামছে না, বিশেষত গার্মেন্টস খাতের ঝুট ব্যবসা ও স্থানীয় বাজার-ইজারা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ছোট ছোট সংঘর্ষ চলছেই।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
সরকার গঠনের সময় তারেক রহমান নিজেই স্বীকার করেছিলেন, দুর্বল অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উত্তরাধিকার নিয়ে তার সরকার শুরু করেছে। কিন্তু পাঁচ মাস পরও চাঁদাবাজি ও দলীয় কোন্দলে মৃত্যুর সংখ্যা কমার বদলে বাড়ছে, আর গ্রেপ্তারের ভারসাম্যহীনতা প্রশ্ন তুলছে আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা নিয়ে। একই সময়ে নতুন মানবাধিকার কমিশন বিল নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিতা আরও সীমিত করার প্রস্তাব দিচ্ছে—অর্থাৎ জবাবদিহিতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার সময়েই সহিংসতার সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী।
পরবর্তী নজর রাখার বিষয়
আগামী দিনগুলোতে লক্ষ রাখা দরকার জুলাই মাসের এইচআরএসএস প্রতিবেদনে সহিংসতার প্রবণতা বাড়ছে নাকি কমছে তার ওপর। পাশাপাশি দেখার বিষয়, বিএনপি অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় নতুন কোনো কাঠামোগত পদক্ষেপ নেয় কিনা। আওয়ামী লীগবিরোধী গ্রেপ্তার অভিযান আরও বিস্তৃত হয় কিনা এবং তা সরকারের সঙ্গে শরিক দলগুলোর সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ