
চার দিনে ৪২ বছরের রেকর্ড ভেঙে যে বৃষ্টি হলো, সেটি প্রকৃতির কাজ। কিন্তু সেই বৃষ্টির পানি কোথায় গিয়ে জমল, কে ঘরে ফিরতে পারল না, কার পাহাড় ধসে পড়ল — এর প্রতিটি উত্তর প্রশাসনিক। জুলাইয়ের বন্যাকে “প্রাকৃতিক দুর্যোগ” বলে বিদায় দেওয়ার আগে হিসাবটা মিলিয়ে নেওয়া দরকার।
মৃত্যুর ভূগোল
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১৩ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে সাত জেলায় মৃতের সংখ্যা ৫৪, আহত ৩৯। ১২ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত হিসাবে মৃত ৫০ জনের মধ্যে কক্সবাজারে ২৮, চট্টগ্রামে ১৩, বান্দরবানে ৬ ও রাঙামাটিতে ৩ জন।
মৃত্যুর এই বণ্টনটিই প্রথম সূত্র। সবচেয়ে বেশি প্রাণ গেছে পাহাড়ধসে — অর্থাৎ যারা পাহাড়ের ঢালে বসবাস করতে বাধ্য, তাদের। উখিয়ার জামতলী, কুতুপালং ও বালুখালী আশ্রয়শিবিরে পাহাড় ধসে আট রোহিঙ্গা নিহত হন; একই রাতে কক্সবাজার শহরের সাত্তারঘোনায় আরও একজন। পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরানোর নির্দেশনা প্রতি বর্ষাতেই জারি হয়, প্রতি বর্ষাতেই অকার্যকর প্রমাণিত হয়।
জাতিসংঘের ১১ জুলাইয়ের ফ্ল্যাশ আপডেট অনুযায়ী ১০ জেলায় ১০ লাখ ৭ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, ৩৬ হাজারের বেশি বাস্তুচ্যুত। খোলা হয় ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র — কক্সবাজারে ৬৪০, বান্দরবানে ২২০, খাগড়াছড়িতে ১৩৫, চট্টগ্রামে ৪১ ও রাঙামাটিতে ২১টি। চট্টগ্রামে শুধু মৎস্যখাতেই ক্ষতি ৯১ কোটি টাকা; বিভাগীয় কমিশনারের হিসাবে সামগ্রিক ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
কারণগুলো রাষ্ট্রের নিজের কর্মকর্তারাই বলছেন
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এই বন্যার কারণ ব্যাখ্যা করতে বিরোধী দলের বিবৃতির দরকার পড়েনি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরাই কারণগুলো সাজিয়ে দিয়েছেন।
খাল দখল। নগরবিদ ও স্থপতি আশিক ইমরানের হিসাবে, চাক্তাই খালের প্রশস্ততা ছিল ৬০ ফুট — যে খাল দিয়ে একসময় নৌ-বাণিজ্য হতো; কোথাও কোথাও তা নেমে এসেছে ৬ ফুটে। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক নিজেই সেখানকার বন্যার জন্য খাল দখল ও সমন্বয়হীন প্রকল্পকে দায়ী করেছেন।
বর্জ্য। চুয়েটের নগর পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশিদুল হাসানের তথ্য: চট্টগ্রাম মহানগরে দৈনিক বর্জ্য উৎপাদন প্রায় তিন হাজার টন, সিটি করপোরেশন ব্যবস্থাপনা করতে পারে দুই হাজার টন। বাকি হাজার টন যায় নালা-ড্রেনে।
পাহাড় কাটা। চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো মূলত বালির; নির্বিচারে কাটার ফলে বৃষ্টির সঙ্গে ধুয়ে আসা বালি ড্রেন ভরাট করছে। মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদীর ব্যবস্থাপনাও দীর্ঘদিন অনুপস্থিত।
রেললাইনের অ্যালাইনমেন্ট। অধ্যাপক রাশিদুল হাসানের সরাসরি বক্তব্য — চকরিয়া, বাঁশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় দুর্যোগের মূল কারণ চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেললাইনের অ্যালাইনমেন্ট, যেখানে পানি নিষ্কাশনের জন্য যথেষ্ট কালভার্ট ও ব্রিজ রাখা হয়নি।
হস্তান্তরের ফাঁক। সিডিএ খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ ও স্লুইসগেট বসিয়ে প্রকল্প শেষে সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু সেই অবকাঠামো চালানোর জনবল কাঠামো নেই, বেতন-খরচ কে বহন করবে তারও নির্দেশনা নেই। অর্থাৎ প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই তার রক্ষণাবেক্ষণ-ব্যর্থতার নকশা তৈরি।
এই তালিকার একটি উপাদানও “প্রাকৃতিক” নয়। প্রতিটির পেছনে আছে অনুমোদন, বরাদ্দ, তদারকি — এবং কারও না কারও স্বাক্ষর।
ত্রাণের পাটিগণিত
সরকারের তৎপরতা ছিল, তবে হিসাবটা এখনো অসম্পূর্ণ। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ১৪ জুলাই জানান, পুনর্বাসন ও জরুরি সহায়তার সিদ্ধান্ত হয়েছে, চাল ও অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বরাদ্দ হয় ১ হাজার ৩০০ টন খাদ্যশস্য। উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে।
কিন্তু অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ১৭ জুলাইয়ের বক্তব্যেই ফাঁকটি ধরা পড়ে: চট্টগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় সাত লাখ মানুষ, ত্রাণ পৌঁছেছে এক লাখ মানুষের কাছে। ঘটনার দশ দিন পরও ছয় লাখের হিসাব খোলা।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো আসেনি
এক, পূর্বাভাস ছিল, ব্যবস্থা কী ছিল? ১০ থেকে ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা আগেই দেওয়া হয়েছিল। সতর্কবার্তা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ঢালের বাসিন্দাদের সরানো পর্যন্ত পথটিতে ঠিক কোথায় ছেদ পড়ল, তার কোনো প্রকাশ্য পর্যালোচনা হয়নি।
দুই, ক্ষয়ক্ষতির নিরীক্ষা প্রকাশিত হবে কি? কৃষি, মৎস্য, সড়ক, বেড়িবাঁধ — খাতভিত্তিক ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং বরাদ্দকৃত চাল-অর্থ কোথায় গেল, তার জেলাভিত্তিক হিসাব প্রকাশ না হলে পুনর্বাসনের কার্যকারিতা যাচাই করার উপায় থাকে না।
তিন, রেললাইন ও নগর প্রকল্পগুলোর দায় কার? বিশেষজ্ঞরা যখন নাম ধরে অবকাঠামোর নকশাগত ত্রুটি চিহ্নিত করছেন, তখন সেই নকশা অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
চার, স্থানীয় নির্বাচনের ছায়া। ইসি অক্টোবরে প্রথম ধাপের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বরাদ্দ ঠিক এই সময়েই মাঠে যাচ্ছে। বরাদ্দ বিতরণের স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশ না হলে “ত্রাণের রাজনীতিকরণ” অভিযোগ ওঠা অনিবার্য — এবং সেই অভিযোগ খণ্ডানোর দায়িত্বও সরকারের।
জুন মাসে দেশে রেকর্ড কম বৃষ্টি হয়েছিল, আর জুলাইয়ে চার দিনে ৪২ বছরের রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টি। এই খামখেয়ালিপনা এখন নিয়ম, ব্যতিক্রম নয়। অর্থাৎ পরের ধাক্কাটি আসবেই — প্রশ্ন শুধু, খালগুলো তখনো দখলে থাকবে কি না, আর পাহাড়ের ঢালে তখনো মানুষ থাকবে কি না।
নতুন সরকারের প্রথম বড় দুর্যোগ পরীক্ষাটি শেষ হয়নি। ত্রাণ বিতরণ দিয়ে সেটি শেষ হয় না — শেষ হয় জবাবদিহি দিয়ে।
আপনার মতামত জানানঃ