ঢাকা এমন একটি শহর, যার পরিচয় একসময় ছিল নদী, খাল, বিল ও জলাভূমিকে ঘিরে। বর্ষার পানি ধারণ, নৌপথে যোগাযোগ, বাণিজ্য, কৃষি এবং নগরের স্বাভাবিক পরিবেশ—সবকিছুর সঙ্গে এই জলপথের ছিল নিবিড় সম্পর্ক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জলনির্ভর নগরটি কংক্রিটের বিস্তারে এমনভাবে বদলে গেছে যে, সামান্য বৃষ্টিতেই আজ রাজধানীর অনেক এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটের জন্য অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ কিংবা দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হলেও ইতিহাস বলছে, সমস্যার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। একসময় যে নগরকে পানির সঙ্গে সহাবস্থানের চিন্তা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেই দর্শন বদলে যায়। পানি হয়ে ওঠে উন্নয়নের প্রতিবন্ধক, আর খাল-জলাভূমি পরিণত হয় ভবিষ্যতের নির্মাণযোগ্য জমিতে।
মুঘল আমলে ঢাকা ছিল একটি জলকেন্দ্রিক নগর। নদী ও খাল ছিল শহরের প্রাণ। ধোলাই খালসহ অসংখ্য খাল শহরের বিভিন্ন অংশকে সংযুক্ত করত। এগুলো কেবল নৌযান চলাচলের পথ ছিল না; বর্ষার পানি নিষ্কাশন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তিও ছিল। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে ওঠা এই নগরব্যবস্থা শতাব্দীর পর শতাব্দী কার্যকর ছিল। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি সহজেই খাল ও নদীতে চলে যেত, ফলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হতো না।
ঔপনিবেশিক শাসনামলে নগর পরিকল্পনার দর্শনে বড় পরিবর্তন আসে। ইউরোপীয় চিন্তাধারার প্রভাবে স্থির পানিকে রোগের উৎস হিসেবে দেখা শুরু হয়। ফলে খাল ও জলাভূমিকে সংরক্ষণের পরিবর্তে ভরাট করে বসতি ও অবকাঠামো তৈরির প্রবণতা বাড়তে থাকে। শহর উন্নয়নের নামে পানিকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার এই ধারণা ধীরে ধীরে প্রশাসনিক নীতিতে পরিণত হয়। তখন থেকেই ঢাকার প্রাকৃতিক জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হতে শুরু করে।
বিশ শতকের শুরুতে কিছু নগর পরিকল্পনাবিদ এই প্রবণতার বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের মতে, খাল ভরাট না করে সেগুলোকে পুনরুদ্ধার, খনন এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা উচিত। তারা বিশ্বাস করতেন, একটি বদ্বীপ অঞ্চলের শহরকে পানির বিরুদ্ধে নয়, বরং পানির সঙ্গে সমন্বয় করেই গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু সেই পরামর্শ গুরুত্ব পায়নি। বরং পরবর্তী কয়েক দশকে একের পর এক খাল ভরাট, রাস্তা নির্মাণ এবং নতুন আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে শহরের প্রাকৃতিক জলপথ সংকুচিত হতে থাকে।
স্বাধীনতার পর অনেকেই আশা করেছিলেন, পরিবেশ ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। বাস্তবে দেখা যায়, আগের নীতিরই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাসনের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে জলাভূমি ভরাটের প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। অনেক সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য খাল ও জলাশয় হারিয়ে যায়। ফলে শহরের পানি ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
আজকের ঢাকার জলাবদ্ধতা কেবল অতিবৃষ্টির ফল নয়; এটি বহু বছরের পরিকল্পনাগত ভুলের প্রতিফলন। আগে যে বৃষ্টির পানি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নদী ও খালে নেমে যেত, এখন সেই পানি আটকে থাকে সড়ক, অলিগলি এবং আবাসিক এলাকায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, কারণ পানি যাওয়ার স্বাভাবিক পথ আর আগের মতো নেই। খাল সংকুচিত হওয়ায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং অল্প সময়ের বৃষ্টিতেও নগরজীবন স্থবির হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা, দখল হওয়া খাল পুনরুদ্ধার করা এবং জলাভূমি সংরক্ষণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। শহরের প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাবকে গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব খাল এখনও টিকে আছে, সেগুলোকে আইনি সুরক্ষা দিয়ে দখলমুক্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে নতুন পরিকল্পনায় পানি ধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থান, রিটেনশন পন্ড এবং প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি বদ্বীপ অঞ্চলের রাজধানীকে ইউরোপীয় শহরের আদলে গড়ে তোলার চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই হলো নদী ও পানিনির্ভর জীবনব্যবস্থা। তাই এখানে উন্নয়নের ধারণাও হতে হবে সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পানি সরিয়ে নয়, বরং পানিকে ধারণ করেই ভবিষ্যতের নগর গড়তে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এ অবস্থায় ঢাকার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা। শুধু তাৎক্ষণিক প্রকল্প কিংবা বর্ষা মৌসুমে ড্রেন পরিষ্কার করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, প্রকৌশলী, সরকারি সংস্থা এবং নাগরিক সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ঢাকার ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে কোনো নগরের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। একসময় যে খালগুলো এই শহরকে জীবন্ত রেখেছিল, সেগুলো হারিয়ে যাওয়ার মূল্য আজ পুরো নগরবাসী দিচ্ছে। জলাবদ্ধতা এখন শুধু দুর্ভোগ নয়; এটি অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং নাগরিক জীবনের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যানজট বাড়ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি হচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
তবে আশার কথা হলো, বিশ্বের বিভিন্ন শহর ইতোমধ্যে তাদের হারিয়ে যাওয়া নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়ে ইতিবাচক ফল পেয়েছে। ঢাকাতেও একই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ পরিকল্পনা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়। খাল পুনঃখনন, জলাভূমি সংরক্ষণ, দখলমুক্তকরণ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতের ঢাকা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজধানীকে বাসযোগ্য রাখতে এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে বিসর্জন দেওয়ার পরিবর্তে প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে। কারণ নদী, খাল ও জলাভূমি কোনো অনাবশ্যক সম্পদ নয়; এগুলোই ঢাকার অস্তিত্বের ভিত্তি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি পরিকল্পনার দর্শন বদলানো যায়, তবে এখনও এই শহরের জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগ আরও তীব্র হয়ে ফিরে আসবে, আর একটি প্রাকৃতিক জলনগর ধীরে ধীরে কংক্রিটের ফাঁদে আরও গভীরভাবে আটকে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ