দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল কৌশলগত অংশীদারত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, কূটনৈতিক সমর্থন এবং মধ্যপ্রাচ্যে পারস্পরিক স্বার্থ—সবকিছু মিলিয়ে এই সম্পর্ককে প্রায়ই “অটুট” বা “অপরিহার্য” বলা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সম্পর্কের ভিতরে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা আর কেবল নীতিনির্ধারকদের আলোচনার বিষয় নয়; বরং তা এখন মার্কিন জনমতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের নাগরিক ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আগের মতো আস্থা বা সমর্থন দেখাচ্ছেন না। বরং গাজা যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) পদক্ষেপ, মানবিক সংকট এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে নেতানিয়াহুকে ঘিরে মার্কিন সমাজে বিতর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়েছে।
এটি শুধু একজন নেতার জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার গল্প নয়। বরং এটি এমন এক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন, যেখানে ইসরায়েলকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত দ্বিদলীয় ঐকমত্য ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলই দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছে। বিভিন্ন প্রশাসন বদলেছে, প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ইসরায়েলকে সমর্থনের নীতি খুব একটা বদলায়নি।
এই ধারাবাহিকতার অন্যতম কারণ ছিল, ইসরায়েলের নেতৃত্ব সচেতনভাবেই নিজেদের কোনো নির্দিষ্ট মার্কিন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একচেটিয়াভাবে যুক্ত করেনি। তারা চেষ্টা করেছে দুই দলের কাছেই সমান গ্রহণযোগ্য থাকতে। ফলে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কখনো দলীয় ইস্যুতে পরিণত হয়নি।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সময়। বিশেষ করে ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ইরান পারমাণবিক চুক্তির বিরোধিতা করে মার্কিন কংগ্রেসে নেতানিয়াহুর ভাষণকে অনেক বিশ্লেষক একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখেন। কারণ, সেই সফরটি হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই রিপাবলিকান নেতৃত্বের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে, ইসরায়েলের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। যদিও সে সময় রিপাবলিকানদের বড় অংশ নেতানিয়াহুর অবস্থানকে সমর্থন করেছিল, ডেমোক্র্যাটদের অনেকেই এটিকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের ব্যত্যয় এবং রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্সির সময় নেতানিয়াহু এমন অনেক কূটনৈতিক অর্জন করেন, যা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি, মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বকে সমর্থন এবং ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া—এসব সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর জন্য বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসনের সমর্থন কি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, কোনো রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি দেশের প্রতিষ্ঠান, জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখা। কারণ সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু রাষ্ট্রের সম্পর্ক টিকে থাকে সেই বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর।
গাজা যুদ্ধ এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই ইসরায়েলকে সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দেয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রকাশ্যে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ান, যুদ্ধকালীন সময়ে দেশটি সফর করেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থানকে সমর্থন করেন।
কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, গাজায় মানবিক সংকটও তত গভীর হয়েছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, অবকাঠামো ধ্বংস, খাদ্যসংকট এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার বিপর্যয়ের বিষয়টি বারবার উঠে আসে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।
এই ঘটনাগুলোর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও পড়তে শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বড় আকারের বিক্ষোভ, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আন্দোলন, তরুণ ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েল নীতির সমালোচনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার ফলে গাজা যুদ্ধ একটি বৈদেশিক নীতির বিষয় থেকে সরাসরি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। অতীতের তুলনায় নতুন প্রজন্ম মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে না। তারা মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, দখলদারিত্ব, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের মতো বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফলে ইসরায়েলকে ঘিরে প্রচলিত রাজনৈতিক বর্ণনা আগের মতো কার্যকর থাকছে না। নতুন প্রজন্মের অনেক ভোটার মনে করেন, কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
এই পরিবর্তনের প্রভাব মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যেও স্পষ্ট। আগে যেখানে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন প্রায় প্রশ্নাতীত ছিল, এখন অনেক ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা সামরিক সহায়তার সঙ্গে মানবাধিকার সংক্রান্ত শর্ত যুক্ত করার পক্ষে মত দিচ্ছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনাও বাড়ছে।
অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। যদিও দলটির বড় অংশ এখনো ইসরায়েলের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে, তথাপি নতুন প্রজন্মের কিছু রক্ষণশীল রাজনীতিক বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সহায়তা ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অর্থাৎ, সমর্থনের ধরনও আগের মতো একরৈখিক থাকছে না।
নেতানিয়াহুর বর্তমান জোট সরকারও বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর সরকারের কয়েকজন কট্টর জাতীয়তাবাদী মন্ত্রীর বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ, গাজার প্রশাসন, বসতি সম্প্রসারণ এবং সামরিক উপস্থিতি নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান অনেক পশ্চিমা দেশের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—গাজা-পরবর্তী রাজনৈতিক সমাধান কী?
সমালোচকদের মতে, সামরিক অভিযান দিয়ে একটি সশস্ত্র সংগঠনকে দুর্বল করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র, নিরাপত্তা, সীমান্ত, প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মতো জটিল বিষয়গুলোর সমাধানে একটি কার্যকর রাজনৈতিক রূপরেখা প্রয়োজন। কিন্তু সেই রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা যুক্তি দেন, ইসরায়েল একটি নজিরবিহীন নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে এবং হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতিতে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা ছাড়া বিকল্প নেই। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সমালোচনা সত্ত্বেও ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই সরকারের দায়িত্ব।
এই দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যেই মার্কিন জনমতের পরিবর্তন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সামরিক সহযোগী নয়; আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক রক্ষাকবচও বটে। যদি মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশের দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তিত হয়, তবে ভবিষ্যতের প্রশাসনগুলোও সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করতে পারবে না।
ইতিহাস বলছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শুধু সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে না। রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, পারস্পরিক আস্থা এবং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা জনসমর্থনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একবার সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি এমন এক সময়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যখন গাজা যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া, মানবিক সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন মিলিয়ে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থান নতুন করে মূল্যায়নের মুখে পড়েছে।
ফলে আজকের বিতর্ক কেবল একজন প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির নতুন ভারসাম্য নিয়ে। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কী রায় দেবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যে সম্পর্ক একসময় প্রায় প্রশ্নাতীত ছিল, আজ সেটি আগের চেয়ে অনেক বেশি বিতর্কিত, বহুস্তরীয় এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
আপনার মতামত জানানঃ