বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে আটকে আছে। কাগজে-কলমে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে বহুগুণ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়েছে, তবু গ্রাহকের ঘরে লোডশেডিং কমেনি। উল্টো দিনে দিনে বেড়ে চলেছে ভর্তুকির বোঝা, আর জমতে জমতে বকেয়া বিলের অঙ্ক পৌঁছে গেছে ৬৭ হাজার কোটি টাকায়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকার এখন ভাবছে এক বড় ধরনের নীতিগত রূপান্তরের কথা—বিদ্যুৎ বিতরণের মতো স্পর্শকাতর ও প্রত্যক্ষভাবে গ্রাহক-সম্পৃক্ত একটি দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হবে বেসরকারি খাতের হাতে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার যে পনেরোটি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে, তার মধ্যে বিদ্যুৎ অন্যতম। প্রায় পনেরো হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি বরাদ্দ রাখা হয়েছে এই খাতে। কিন্তু এত বরাদ্দের পরও চলতি বছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে প্রায় একচল্লিশ হাজার কোটি টাকা। এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নিয়েছে বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের পরিকল্পনা। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী জানিয়েছেন, উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহ সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও খুচরা পর্যায়ে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। এই সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে এই আলোচনা শুরু হতেই প্রশ্ন উঠেছে চারদিক থেকে। দায়িত্ব বদলে গেলেই কি বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর হবে, নাকি গ্রাহকের ভোগান্তি আরও বাড়বে—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই পদক্ষেপ নিয়ে সন্দিহান। তাদের অভিমত, শুধু বিতরণের দায়িত্ব বদলে দিলেই বিদ্যুৎ খাতের সংকট মিটবে না, বরং দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। গত দেড় দশক ধরে দেশের বিদ্যুৎ খাতের প্রধান সমস্যা ছিল অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ আর আমদানিনির্ভরতা। বিশেষত কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কেন্দ্র স্থাপন এবং সেগুলো অলস রেখেও বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের সংস্কৃতি সামগ্রিক অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন এই খাতের বিশ্লেষকরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমের মতে, দেশের জ্বালানি খাত এখন এক ধরনের জরুরি অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। তার আশঙ্কা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঠিক না করে বেসরকারিকরণের পথে হাঁটলে গ্রাহকের ব্যয় উল্টো বেড়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে তিনি টেনে আনেন এলপিজি খাতের উদাহরণ—সম্পূর্ণ বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা এই খাতে দাম কখনো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি, বরং বেসরকারিকরণের চাপে নিয়ন্ত্রক সংস্কৃতিই ভেঙে পড়েছে বলে তার পর্যবেক্ষণ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো রাষ্ট্রীয় কৌশলগত সম্পদ পুরোপুরি বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে দেশের সার্বভৌম স্বার্থও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশের একমাত্র জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। বিগত বছরগুলোতে নির্বাহী আদেশে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে, যার ফলে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে গোটা খাতকে পুনর্গঠন না করে বিতরণের দায়িত্ব বেসরকারি হাতে ছেড়ে দিলে তা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এবং সরকারকেও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক আলম।
তবে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেই ভিন্নমতও আছে। কেউ কেউ মনে করেন, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলে বেসরকারিকরণের কিছু ইতিবাচক দিকও থাকতে পারে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সরকারি লালফিতার দৌরাত্ম্য ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কিছুটা কমতে পারে, সিস্টেম লস কমানো এবং বকেয়া বিল আদায়ের গতিও বাড়তে পারে। এই যুক্তির পক্ষে যুক্তরাজ্য, ভারত ও তুরস্কের মতো দেশের উদাহরণও টানছেন কেউ কেউ, যেখানে বিতরণ ব্যবস্থাপনার বেসরকারিকরণ তুলনামূলকভাবে সফল হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু এই সাফল্যের পূর্বশর্ত একটাই—শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যার হাতে বাস্তবিক ক্ষমতা থাকতে হবে বাজার তদারকির। বাংলাদেশে বিইআরসি সেই মানে পৌঁছাতে পেরেছে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরীও একই ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ডেসকো বা পিজিসিবির মতো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার আগে থেকেই আংশিকভাবে বাজারে ছাড়া আছে এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণেও আছে, কিন্তু তাতে বিশেষ কোনো উন্নতি চোখে পড়েনি। শুধু বেসরকারি খাতে দায়িত্ব দিলেই বড় পরিবর্তন আসবে—এই ধারণাকে তিনি অতিসরলীকরণ বলে মনে করেন। ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞতাকেও তিনি সতর্কবার্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন—ব্যাংক খাতে লুটপাটের পর আমানতকারীদের টাকা শেষ পর্যন্ত সরকারকেই ফেরত দিতে হচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতেও একই পরিণতি ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বাস্তব চ্যালেঞ্জের কথাও উঠে আসছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য থাকে মুনাফা অর্জন। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে একচেটিয়া দায়িত্ব পেলে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি, পাহাড়ি বা দুর্গম এবং কম জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছাতে খরচ বেশি অথচ মুনাফার সুযোগ কম, ফলে সেসব এলাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহী নাও হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ প্রাপ্তিতে অঞ্চলভেদে বৈষম্য তৈরি হওয়ার শঙ্কাও থেকে যায়। এছাড়া, বর্তমানে সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা ছয়টি বিতরণ সংস্থায় কর্মরত কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে, যা শ্রমিক অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে। সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো, বেসরকারিকরণের নামে যদি কুইক রেন্টালের মতো অস্বচ্ছ চুক্তি করা হয়, তাহলে গোটা বিদ্যুৎ খাতই একরকম জিম্মি হয়ে পড়তে পারে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে।
অন্যদিকে সরকারের যুক্তিও একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। বর্তমান ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সব উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে নির্ধারিত দামে ছয়টি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে। সমস্যা হলো, যে দামে কেনা হয় তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়, আর এই ফারাক পুষিয়ে দেয় সরকারি ভর্তুকি। বিদ্যুৎমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, প্রায় সতেরো টাকায় কিনে আট টাকায় বিক্রি করার মতো পরিস্থিতিতে সরকার আর কত দিন ভর্তুকি টানতে পারবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তার যুক্তি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিলে বিতরণে দক্ষতা বাড়বে, বিল আদায় নিশ্চিত হবে এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা হলেও কমবে। এক্ষেত্রে তিনি ভারতের মুম্বাই ও দিল্লির উদাহরণ তুলে ধরেছেন, যেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিতরণ ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক সফলভাবে চালাচ্ছে বলে তার অভিমত। মন্ত্রীর ভাষায়, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও একইভাবে সফল হতে পারবে না কেন, সেই প্রশ্নই তিনি তুলেছেন।
তবে মন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন যে, ভর্তুকি কমানো এবং দাম বাড়ানো—দুটোরই বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ গ্রাহকের ওপর। তার ব্যাখ্যায়, সরকার যে ভর্তুকি দেয়, সেটাও জনগণের করের টাকা, আবার দাম বাড়লে সরাসরি গ্রাহকের পকেট থেকেই যায়—অর্থাৎ দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রাহক। এই দ্বৈত সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ হিসেবেই সরকার বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে দেওয়ার কথা ভাবছে বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছায়নি; সরকার বিষয়টি নিয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে এবং কীভাবে প্রক্রিয়াটিকে যৌক্তিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে এগোবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি, পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি—দুটি খাতই বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। পাওয়ার সেলের হিসাব অনুযায়ী দেশে বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়িয়েছে, ফলে এই খাতে যেকোনো নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে দেশের প্রতিটি ঘরে। এমন এক প্রেক্ষাপটে বিতরণ ব্যবস্থাপনার মতো স্পর্শকাতর একটি খাত বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল। বিশেষজ্ঞদের অভিন্ন পরামর্শ হলো—কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু মালিকানা বদল করলে সংকটের সমাধান হবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্বাধীন ও কার্যকর করা, বিদ্যমান চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা—এই পদক্ষেপগুলো ছাড়া বেসরকারিকরণ শেষ পর্যন্ত সংকট আরও গভীর করতে পারে বলেই আশঙ্কা তাদের।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে। সরকার যে পথে হাঁটতে চাইছে, তা দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয় ও দক্ষতা আনতে পারে, আবার একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন ধরনের সংকটও তৈরি করতে পারে। কোন পথে শেষ পর্যন্ত এগোবে সরকার এবং তার ফলাফল কেমন হবে, তা নির্ভর করছে মূলত একটি বিষয়ের ওপর—নিয়ন্ত্রক কাঠামো কতটা শক্তিশালী ও স্বচ্ছ হয়ে উঠবে, তার ওপর। সেই প্রশ্নের উত্তর মিলতে এখনো কিছুটা সময় লাগবে বলেই মনে হচ্ছে।
আপনার মতামত জানানঃ