বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আবারও এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, শিল্প, পরিবহন, ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে একসঙ্গে প্রভাবিত করছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের তীব্র সংকটের ফলে লোডশেডিং বেড়েছে, শিল্প উৎপাদন কমেছে, সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে এবং বাসাবাড়িতে রান্নার চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। বিশেষ করে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (FSRU) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এই সংকট নতুন নয়। গত এক দশকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও সেই সক্ষমতা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ সবসময় একই হারে বাড়েনি। ফলে কাগজে-কলমে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়লেও বাস্তবে অনেক কেন্দ্র পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা বা তরল জ্বালানি না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সংকট সেই দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু মহেশখালীর এলএনজি অবকাঠামো। জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যায়। প্রতিদিন শত শত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম পাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি পায়নি। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত কমে যায় এবং সারা দেশে লোডশেডিং বাড়তে শুরু করে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনও গ্যাসনির্ভর। যখন গ্যাস সরবরাহ কমে যায়, তখন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, পুরো অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব পড়ে। শিল্পকারখানায় বয়লার চালানো যায় না, টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, সার কারখানা উৎপাদন কমায় এবং অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয়বহুল ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়। এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহের ঝুঁকি তৈরি হয়।
সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। রাজধানী ও জেলা শহরের বহু এলাকায় দিনের বড় সময় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করেছে। এতে বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, যা আবার লোডশেডিং আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ এক ধরনের সংকট আরেকটি সংকটকে আরও গভীর করছে।
পরিবহন খাতেও এর বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সিএনজি চালিত যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না। চালকদের আয় কমছে, যাত্রীদের অপেক্ষা বাড়ছে এবং শহরের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থাও ধীর হয়ে পড়ছে। শুধু জ্বালানির অভাব নয়, এই অপেক্ষার সময়ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি অদৃশ্য ক্ষতি তৈরি করছে।
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন। বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলো সীমিত উৎপাদনের মধ্যে শহর ও শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করায় অনেক জেলায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ছোট ব্যবসা, কৃষি সেচ এবং স্বাস্থ্যসেবাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কেবল একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির ফল নয়। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতাকেও প্রকাশ করেছে। যখন একটি মাত্র গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে সমস্যা তৈরি হয়, তখন পুরো জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ বিকল্প সরবরাহ, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশে গ্যাসের নিজস্ব উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, আবহাওয়া, প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে এই নির্ভরতাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি অর্জন। কিন্তু জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হলে সেই সক্ষমতার বড় অংশই ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। ফলে একদিকে অব্যবহৃত কেন্দ্র, অন্যদিকে লোডশেডিং—এই দুই বিপরীত বাস্তবতা একই সঙ্গে দেখা যায়।
এ পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত মেরামত, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টার্মিনালের অক্ষত অংশ থেকে সরবরাহ পুনরায় চালুর কাজ চলছে এবং মেরামত শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন আরও বড় পরিকল্পনা। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, অফশোর অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো, শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং একাধিক এলএনজি অবকাঠামোর মধ্যে সমন্বিত ব্যাকআপ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া একই ধরনের সংকট ভবিষ্যতেও ফিরে আসতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ শুধু নাগরিক সুবিধা নয়; এটি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত। বর্তমান গ্যাস সংকট তাই কেবল কয়েক দিনের দুর্ভোগের গল্প নয়, বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও বটে।
আজকের সংকট হয়তো কয়েক দিনের মধ্যে কিছুটা কমে আসবে। এলএনজি টার্মিনাল সচল হলে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদনও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। কিন্তু মূল প্রশ্ন থেকে যাবে—একটি অবকাঠামোগত ত্রুটি যদি পুরো দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও জনজীবনকে এতটা নাড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের জন্য আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত? সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশ কতটা জ্বালানি-নিরাপদ হতে পারবে।
আপনার মতামত জানানঃ