
মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু অধিকাংশ প্রাচীন সংঘাতের কাহিনি হারিয়ে গেছে সময়ের অন্ধকারে। কোথায় যুদ্ধ হয়েছিল, কারা অংশ নিয়েছিল কিংবা কোন কৌশলে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছিল—এসবের নির্ভরযোগ্য বিবরণ আমাদের হাতে নেই। এই জায়গাতেই ‘ব্যাটল অব মেগিড্ডো’ বা মেগিড্ডোর যুদ্ধ অনন্য। মিসরের ফারাও তৃতীয় থুতমোস এবং কানানীয় নগররাষ্ট্রগুলোর একটি জোটের মধ্যে সংঘটিত এই যুদ্ধকে মানব ইতিহাসের প্রথম বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যুদ্ধের সঠিক সাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য কালপঞ্জি অনুযায়ী এটি সংঘটিত হয়েছিল ১৪৫৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে—আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে। অন্য কয়েকটি কালপঞ্জিতে ১৪৮২ কিংবা ১৪৭৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কথাও বলা হয়েছে। প্রাচীন মিসরীয় বিবরণে যুদ্ধের সময়টি তৃতীয় থুতমোসের রাজত্বের ২৩তম বছরের প্রথম ‘শেমু’ মাসের ২১তম দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আধুনিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবের সঙ্গে সেই চন্দ্রতারিখ মিলিয়ে অধিকাংশ গবেষক ১৪৫৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দকে সম্ভাব্য সাল হিসেবে গ্রহণ করেন। Fordham University Ancient History Sourcebook
এই যুদ্ধের বিবরণ মিসরের কারনাক মন্দিরের দেয়ালে উৎকীর্ণ তৃতীয় থুতমোসের সামরিক ইতিবৃত্তে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, ফারাওয়ের সামরিক লেখক ত্জানেনি অভিযানের সময় ঘটনাগুলো দৈনিক নথিভুক্ত করেছিলেন। পরে সেই নথির ভিত্তিতে আমুন-রা দেবতার কারনাক মন্দিরে যুদ্ধের বিবরণ খোদাই করা হয়। তবে এই শিলালিপি বিজয়ী মিসরীয় পক্ষের তৈরি। ফলে এতে সামরিক তথ্যের পাশাপাশি রাজকীয় প্রচারণা, শত্রুকে হেয় করা এবং ফারাওকে অতিমানবীয় বীর হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতাও রয়েছে। ইতিহাসবিদদের তাই এই বিবরণকে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে হয়, কিন্তু প্রতিটি দাবি আক্ষরিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
কেন মেগিড্ডো এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল
প্রাচীন মেগিড্ডো বর্তমান ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে জেজরিল উপত্যকার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। শহরটি কোনো বিশাল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল না; কিন্তু তার ভৌগোলিক অবস্থান ছিল অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। মিসর থেকে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূল ধরে সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার দিকে যাওয়া প্রধান বাণিজ্যিক ও সামরিক পথটি মেগিড্ডোর পাশ দিয়ে অতিক্রম করত। পরবর্তী সময়ে এই পথ ‘ভিয়া মারিস’ বা সমুদ্রপথ নামে পরিচিত হয়।
কারমেল পর্বতমালার মধ্য দিয়ে জেজরিল উপত্যকায় প্রবেশের কয়েকটি পথের ওপর মেগিড্ডোর নজরদারি ছিল। যে শক্তি মেগিড্ডো নিয়ন্ত্রণ করত, সে মিসর, কানান, সিরিয়া এবং মেসোপটেমিয়ার মধ্যে সৈন্য, পণ্য ও দূত চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। উর্বর জেজরিল উপত্যকার কৃষি উৎপাদনও শহরটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে মেগিড্ডোয় বিভিন্ন যুগের বসতি, প্রাসাদ, দুর্গপ্রাচীর, মন্দির এবং উন্নত পানি সরবরাহব্যবস্থার সন্ধান পাওয়া গেছে। শহরটি বহু শতাব্দী ধরে পশ্চিম এশিয়া, মিসর ও ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের সংযোগস্থল ছিল। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব অ্যানশিয়েন্ট কালচার মেগিড্ডোকে দীর্ঘকাল টিকে থাকা ক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছে। University of Chicago—ISAC Museum
মেগিড্ডোকে নিয়ন্ত্রণ করা তাই শুধু একটি শহর দখল করা ছিল না; এটি ছিল পুরো অঞ্চলের বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং সামরিক চলাচলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাই তৃতীয় থুতমোসের অভিযানের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল।
হাটশেপসুটের মৃত্যুর পর বিদ্রোহ
তৃতীয় থুতমোস ছিলেন ফারাও দ্বিতীয় থুতমোসের পুত্র। অল্প বয়সে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজা হলেও প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় তাঁর সৎমা ও রাজপ্রতিনিধি হাটশেপসুটের হাতে। পরে হাটশেপসুট নিজেই ফারাওয়ের উপাধি গ্রহণ করেন এবং প্রায় দুই দশক মিসর শাসন করেন। এই সময় তৃতীয় থুতমোস রাজপরিবারের সদস্য এবং সহশাসক হিসেবে থাকলেও রাষ্ট্রের প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ছিলেন না।
হাটশেপসুটের মৃত্যুর পর তৃতীয় থুতমোস স্বাধীনভাবে শাসন শুরু করেন। ক্ষমতা পরিবর্তনের এই মুহূর্তকে সুযোগ হিসেবে দেখেছিল মিসরের উত্তরাঞ্চলীয় অধীনস্থ রাজ্যগুলো। সিরিয়ার শক্তিশালী কাদেশ নগরের শাসকের নেতৃত্বে কানান ও সিরিয়ার কয়েকটি নগররাষ্ট্র মিসরীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে জোট গঠন করে। মেগিড্ডোর শাসকও সেই জোটে যোগ দেন।
মিসরীয় শিলালিপিতে এই জোটে বহু স্থানীয় শাসক অংশ নিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। কখনো তাদের সংখ্যা ৩৩০ পর্যন্ত বলা হয়। সংখ্যাটি সম্ভবত বিজয়ের মহত্ত্ব বাড়িয়ে দেখানোর জন্য অতিরঞ্জিত। তবে মেগিড্ডোয় একটি উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক জোট সমবেত হয়েছিল—এ বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে খুব বেশি দ্বিমত নেই। জোটটির পেছনে উত্তর সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার শক্তিশালী মিতান্নি রাজ্যের পরোক্ষ সমর্থন থাকতে পারে।
এই বিদ্রোহ সফল হলে মিসর শুধু কানানের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাত না, সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত তার বাণিজ্য ও সামরিক প্রভাবও ভেঙে পড়ত। তৃতীয় থুতমোস তাই অপেক্ষা না করে নিজেই সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে উত্তর দিকে অগ্রসর হন। এটি ছিল স্বাধীন শাসক হিসেবে তাঁর প্রথম বড় সামরিক অভিযান।
তিন পথের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক পথ
মিসরীয় বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে উপকূলীয় সমভূমি ধরে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়। মেগিড্ডোর কাছাকাছি পৌঁছে ফারাও ও তাঁর সেনাপতিরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। কারমেল পর্বতমালা অতিক্রম করে জেজরিল উপত্যকায় ঢোকার জন্য তাঁদের সামনে তিনটি পথ ছিল।
উত্তর ও দক্ষিণের দুটি পথ তুলনামূলক প্রশস্ত এবং সেনাবাহিনীর জন্য নিরাপদ ছিল। মাঝখানের পথটি আরুনা নামের স্থানের মধ্য দিয়ে সরাসরি মেগিড্ডোর দিকে গেছে। কিন্তু সেটি এত সংকীর্ণ ছিল যে অনেক জায়গায় সৈন্যদের এক সারিতে চলতে হতো। সেখানে শত্রু ওত পেতে থাকলে মিসরীয় বাহিনীর সামনের অংশ আক্রান্ত হওয়ার সময় পেছনের সৈন্যরা সাহায্য করতে পারত না। রথ, ঘোড়া ও রসদ নিয়ে এমন পথে অগ্রসর হওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তৃতীয় থুতমোসের সেনাপতিরা নিরাপদ পথ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ফারাও যুক্তি দেন, শত্রুও নিশ্চয় ধরে নেবে মিসরীয়রা প্রশস্ত পথগুলোর একটি বেছে নেবে। তাই তিনি সবচেয়ে সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক আরুনা পথ দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কারনাকের বিবরণে সিদ্ধান্তটিকে ফারাওয়ের ব্যক্তিগত সাহস ও দূরদর্শিতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। রাজকীয় প্রচারণার অংশ থাকলেও এর মধ্যে বাস্তব সামরিক যুক্তি স্পষ্ট। তৃতীয় থুতমোস ঝুঁকি নিয়েছিলেন, কিন্তু ঝুঁকিটি ছিল হিসাব করা। অপ্রত্যাশিত পথ বেছে নিয়ে তিনি শত্রুর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে অকার্যকর করে দিতে চেয়েছিলেন।
তিনি নিজে বাহিনীর সামনে থেকে সংকীর্ণ গিরিপথ অতিক্রম করেন। কোনো বড় প্রতিরোধ ছাড়াই মিসরীয় বাহিনী জেজরিল উপত্যকায় বেরিয়ে এলে কানানীয় জোট বিস্মিত হয়। তারা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ পথগুলো পাহারা দেওয়ার জন্য বাহিনী ছড়িয়ে রেখেছিল। ফলে মিসরীয়রা এমন এক অবস্থানে পৌঁছে যায়, যেখান থেকে সরাসরি মেগিড্ডো ও শত্রুর মূল বাহিনীকে আক্রমণ করা সম্ভব।
এটি সামরিক ইতিহাসে ভূপ্রকৃতি, গোয়েন্দা তথ্য, শত্রুর প্রত্যাশা এবং চমকের সমন্বিত ব্যবহারের অন্যতম প্রাচীন নথিবদ্ধ উদাহরণ।
যুদ্ধক্ষেত্রে ফারাও
মিসরীয়রা উপত্যকায় প্রবেশের পরপরই আক্রমণ করেনি। তৃতীয় থুতমোস প্রথমে তাঁর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বাহিনীকে একত্র করেন, শিবির স্থাপন করেন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। পরদিন সকালে মিসরীয় বাহিনীকে তিনটি অংশে সাজানো হয়। কেন্দ্রীয় অংশের নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং ফারাও। দুই পাশের বাহিনী এমনভাবে অবস্থান নেয়, যাতে কানানীয় বাহিনীর উভয় প্রান্তকে চাপের মধ্যে রাখা যায়।
সেই সময় মিসরীয় সেনাবাহিনীর প্রধান শক্তি ছিল পদাতিক সৈন্য ও ঘোড়ায় টানা হালকা যুদ্ধরথ। রথের ওপর থেকে ধনুক ব্যবহারকারী যোদ্ধারা দ্রুত আক্রমণ, অবস্থান পরিবর্তন ও শত্রুর সারি ভাঙতে পারতেন। কানানীয় জোটের কাছেও রথ ও পদাতিক বাহিনী ছিল। তবে দুই পক্ষের সৈন্যসংখ্যা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। আধুনিক গবেষকদের কিছু অনুমানে উভয় বাহিনীতে প্রায় দশ হাজার করে সৈন্য থাকার কথা বলা হলেও এগুলো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নয়।
যুদ্ধ শুরু হলে মিসরীয়দের কেন্দ্রীয় ও দুই পার্শ্বীয় বাহিনী একযোগে এগিয়ে যায়। অপ্রত্যাশিত দিক থেকে মিসরীয়দের উপস্থিতি এবং দ্রুত আক্রমণের ফলে কানানীয় জোটের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে। তাদের সৈন্যরা মেগিড্ডোর দুর্গপ্রাচীরের দিকে পালাতে শুরু করে।
পালিয়ে যাওয়া সৈন্যদের জন্য শহরের প্রধান দরজা খুলে রাখা বিপজ্জনক ছিল। মিসরীয় বাহিনীও তাদের পিছু নিয়ে ঢুকে পড়তে পারত। ফলে মেগিড্ডোর রক্ষীরা দরজা বন্ধ করে দেয়। দুর্গের ভেতরের লোকেরা পোশাক ও কাপড় বেঁধে দড়ির মতো তৈরি করে পলায়নরত যোদ্ধা এবং কিছু নেতাকে প্রাচীরের ওপর টেনে তোলে।
যুদ্ধক্ষেত্রে মিসরীয়দের বিজয় প্রায় সম্পূর্ণ ছিল। কিন্তু যে মুহূর্তে তারা মেগিড্ডো দখল করতে পারত, ঠিক তখনই শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।
লুটের লোভে হাতছাড়া বিজয়
কানানীয় সেনারা পালিয়ে যাওয়ার পর মিসরীয় সৈন্যরা তাদের পিছু নিয়ে শহরে প্রবেশ করার পরিবর্তে পরিত্যক্ত শিবির লুট করতে শুরু করে। সেখানে রথ, ঘোড়া, অস্ত্র, বর্ম এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী পড়ে ছিল। সৈন্যদের এই লুটপাট মেগিড্ডোর রক্ষীদের দরজা বন্ধ এবং প্রতিরক্ষা পুনর্গঠনের সময় দেয়।
কারনাকের বিবরণেও কার্যত স্বীকার করা হয়েছে যে মিসরীয় সৈন্যদের লুটের লোভের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে শহরটি দখল করা সম্ভব হয়নি। বিজয়ী পক্ষের রাজকীয় শিলালিপিতে নিজের বাহিনীর এমন ব্যর্থতা উল্লেখ করা বিরল। এটি ঘটনার ঐতিহাসিক বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা বাড়ায়, যদিও বর্ণনাটি শেষ পর্যন্ত ফারাওয়ের নির্দেশ অমান্য করা সৈন্যদের প্রতি নৈতিক শিক্ষা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
তৃতীয় থুতমোস তখন মেগিড্ডোকে ঘিরে ফেলেন। শহরের চারপাশে পরিখা, কাঠের প্রাচীর ও প্রতিরক্ষাবেষ্টনী তৈরি করা হয়, যাতে কেউ পালাতে না পারে এবং বাইরে থেকে খাদ্য বা সাহায্য পৌঁছাতে না পারে। মিসরীয়রা এই অবরোধের নাম দিয়েছিল—“এশীয়দের ঘিরে ফেলা মেনখেপেরের প্রাচীর।” মেনখেপেরে ছিল তৃতীয় থুতমোসের রাজকীয় নাম।
অবরোধ কতদিন স্থায়ী হয়েছিল তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রচলিত বিবরণে সাত বা আট মাসের কথা বলা হয়। দীর্ঘ অবরোধের পর খাদ্যসংকট ও সামরিক বিচ্ছিন্নতার কারণে মেগিড্ডোর শাসকেরা আত্মসমর্পণ করেন। তবে কানানীয় জোটের প্রধান নেতা কাদেশের শাসক পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
তৃতীয় থুতমোস আত্মসমর্পণকারী শহর ধ্বংস কিংবা সাধারণ অধিবাসীদের নির্বিচারে হত্যা করেননি। তিনি স্থানীয় শাসকদের আনুগত্য গ্রহণ করেন, বিপুল সম্পদ ও যুদ্ধসামগ্রী বাজেয়াপ্ত করেন এবং মিসরীয় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
কারনাকের শিলালিপিতে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের দীর্ঘ তালিকা রয়েছে—শত শত রথ, বর্ম, ধনুক, ঘোড়া, গবাদিপশু এবং বিপুলসংখ্যক ভেড়া। এসব সংখ্যার নির্ভুলতা যাচাই করা সম্ভব নয়। প্রাচীন রাজকীয় শিলালিপিতে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা ছিল। তবু তালিকাটি যুদ্ধের অর্থনৈতিক চরিত্র বোঝায়। প্রাচীন যুদ্ধে বিজয় মানে শুধু ভূখণ্ড নয়; শ্রমশক্তি, পশু, অস্ত্র, খাদ্য ও মর্যাদাও অর্জন করা।
এক যুদ্ধ থেকে মিসরীয় সাম্রাজ্যের উত্থান
মেগিড্ডোর বিজয় কানানে মিসরের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনলেও একটি অভিযানে পুরো অঞ্চল স্থায়ীভাবে শান্ত হয়নি। তৃতীয় থুতমোস পরবর্তী প্রায় দুই দশকে সিরিয়া ও লেভান্তে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁর সামরিক অভিযানে মিসরের প্রভাব ইউফ্রেটিস নদীর দিক পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং অষ্টাদশ রাজবংশের মিসর একটি পূর্ণাঙ্গ সাম্রাজ্যিক শক্তিতে পরিণত হয়।
পরাজিত নগররাষ্ট্রগুলোর আনুগত্য নিশ্চিত করতে তিনি একটি কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। স্থানীয় শাসকদের সন্তানদের মিসরের রাজদরবারে পাঠানো হতো। সেখানে তারা মিসরীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতি শিখে বড় হতো। পরে নিজ নিজ অঞ্চলে শাসক হিসেবে ফিরে গেলে তারা সাধারণত মিসরের প্রতি অনুগত থাকত। এটি ছিল বলপ্রয়োগ ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের সম্মিলিত সাম্রাজ্যনীতি।
মেগিড্ডোর বিজয় তৃতীয় থুতমোসকে মিসরের ইতিহাসে অন্যতম সফল সামরিক শাসকে পরিণত করে। তবে তাঁকে কখনো কখনো আধুনিক ভাষায় ‘প্রাচীন মিসরের নেপোলিয়ন’ বলা হলেও এই তুলনা সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। দুই শাসক সম্পূর্ণ ভিন্ন যুগ, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মানুষ। তৃতীয় থুতমোসকে তাঁর নিজস্ব ব্রোঞ্জযুগীয় সাম্রাজ্যিক বাস্তবতার মধ্যেই বোঝা অধিক যুক্তিসঙ্গত।
প্রথম নথিবদ্ধ যুদ্ধ—কিন্তু প্রথম যুদ্ধ নয়
মেগিড্ডোকে প্রায়ই ‘ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ’ বলা হয়। কথাটি আক্ষরিক অর্থে ঠিক নয়। এর হাজার বছর আগেও নগররাষ্ট্র, রাজ্য ও গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে। সুমেরীয় শিল্প ও শিলালিপিতেও যুদ্ধের দৃশ্য এবং বিজয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।
মেগিড্ডোর বিশেষত্ব হলো, এটি প্রথম যুদ্ধ যার অভিযানপথ, সামরিক পরামর্শ, বিকল্প পথ নির্বাচন, যুদ্ধক্ষেত্রে বাহিনীর বিন্যাস, বিজয়, লুটপাট এবং পরবর্তী অবরোধ সম্পর্কে ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ এটি মানবজাতির প্রথম যুদ্ধ নয়; বরং বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ প্রথম সামরিক অভিযানগুলোর একটি।
তবু উৎসটির সীমাবদ্ধতা মনে রাখা জরুরি। আমাদের হাতে কানানীয় জোটের কোনো সমপর্যায়ের বিবরণ নেই। তারা কেন বিদ্রোহ করেছিল, নিজেদের স্বাধীনতার দাবিকে কীভাবে দেখত কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনাকে কীভাবে বর্ণনা করত—তা অজানা। মিসরীয় শিলালিপিতে তারা বিদ্রোহী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী; কিন্তু নিজেদের চোখে তারা হয়তো বিদেশি সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা করছিল।
এই অনুপস্থিত কণ্ঠ ইতিহাসের একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দেয়: প্রাচীন যুদ্ধের অধিকাংশ বিবরণ বিজয়ীদের হাতে রচিত।
মেগিড্ডো থেকে ‘আর্মাগেডন’
মেগিড্ডোর নাম শুধু সামরিক ইতিহাসেই টিকে থাকেনি; এটি ধর্মীয় কল্পনায় পৃথিবীর শেষ যুদ্ধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। নতুন নিয়মের বুক অব রেভেলেশন বা প্রকাশিত বাক্যের ১৬:১৬-তে ‘হার-মাগেডন’ নামের একটি স্থানে চূড়ান্ত সংঘর্ষের জন্য রাজাদের সমবেত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ‘হার মেগিড্ডো’কে সাধারণত ‘মেগিড্ডোর পাহাড়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। সেখান থেকেই ইংরেজি ‘Armageddon’ শব্দটির উৎপত্তি।
মেগিড্ডো ও তার আশপাশে বিভিন্ন যুগে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ৬০৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিসরের ফারাও দ্বিতীয় নেকোর সঙ্গে সংঘর্ষে জুডাহর রাজা জোশিয়া নিহত হন। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ জেনারেল এডমন্ড অ্যালেনবির নেতৃত্বাধীন বাহিনী অটোমানদের বিরুদ্ধে ওই অঞ্চলে বড় বিজয় অর্জন করে; সেই অভিযানও ‘ব্যাটল অব মেগিড্ডো’ নামে পরিচিত।
অতএব ইতিহাসে মেগিড্ডোর যুদ্ধ একটিমাত্র নয়। কিন্তু ‘প্রথম বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ যুদ্ধ’ বলতে সাধারণত তৃতীয় থুতমোসের ১৫ শতক খ্রিস্টপূর্বাব্দের অভিযানকেই বোঝানো হয়।
তেল মেগিড্ডোর প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরগুলো দেখায়, শহরটি বারবার নির্মিত, ধ্বংস এবং পুনর্নির্মিত হয়েছে। এই দীর্ঘ যুদ্ধস্মৃতিই সম্ভবত মেগিড্ডোকে পরবর্তী ধর্মীয় সাহিত্যে সর্বশেষ মহাযুদ্ধের প্রতীকে পরিণত করেছিল। বর্তমানে ‘আর্মাগেডন’ শব্দটি ধর্মীয় পরিসরের বাইরেও পারমাণবিক যুদ্ধ, বৈশ্বিক বিপর্যয় কিংবা সভ্যতা ধ্বংসের সম্ভাবনা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
মেগিড্ডোর যুদ্ধের স্থায়ী গুরুত্ব শুধু এই নয় যে সেখানে তৃতীয় থুতমোস বিজয়ী হয়েছিলেন। এর গুরুত্ব হলো, এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা প্রথমবারের মতো একজন প্রাচীন সেনানায়কের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দেখতে পাই—কীভাবে তিনি ভূপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছিলেন, সেনাপতিদের পরামর্শ শুনেছিলেন, বিপজ্জনক পথ বেছে নিয়েছিলেন এবং শত্রুর প্রত্যাশাকে তার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছিলেন।
একই সঙ্গে আমরা দেখি বিজয়ের পর শৃঙ্খলা হারালে কীভাবে তাৎক্ষণিক সাফল্য দীর্ঘ অবরোধে পরিণত হতে পারে। মিসরীয় বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ী হয়েছিল, কিন্তু লুটের লোভে মেগিড্ডো দখলের সুযোগ হারিয়েছিল। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পরও এই শিক্ষা সামরিক ইতিহাসে প্রাসঙ্গিক: একটি সাহসী কৌশল যুদ্ধ জেতাতে পারে, কিন্তু শৃঙ্খলা ছাড়া সেই বিজয়ের পূর্ণ ফল অর্জন করা যায় না।
আপনার মতামত জানানঃ