
বাজার থেকে মাছ কিনে আঁশ ছাড়ানো, নাড়িভুঁড়ি ফেলে ভালোভাবে ধুয়ে রান্না করার পর আমরা সাধারণত মনে করি খাবারটি পরিষ্কার। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এমন একটি দূষণের কথা জানাচ্ছে, যা চোখে দেখা যায় না, সাধারণভাবে ধুয়ে পুরোপুরি সরানো যায় না এবং রান্নার পরও সব ক্ষেত্রে নিশ্চিহ্ন হয় না। সেই দূষণের নাম মাইক্রোপ্লাস্টিক।
সমুদ্র, নদী, হাওর, পুকুর—প্রায় সব ধরনের জলজ পরিবেশেই এখন ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হচ্ছে। প্ল্যাঙ্কটন ও ছোট জলজ প্রাণী থেকে শুরু করে মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া ও ঝিনুকের শরীরেও এসব কণা পাওয়া গেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে: আমরা যখন মাছ খাই, তখন কি মাছের সঙ্গে প্লাস্টিকও আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে করছে। তবে কোন মাছ থেকে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে আসছে এবং সেই পরিমাণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর—এই দুই প্রশ্নের উত্তর এখনো সমানভাবে নিশ্চিত নয়।
মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী?
সাধারণভাবে পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এর চেয়েও ক্ষুদ্র, সাধারণত এক মাইক্রোমিটারের নিচের কণাকে বলা হয় ন্যানোপ্লাস্টিক। ন্যানোপ্লাস্টিক এতটাই ছোট যে সাধারণ মাইক্রোস্কোপ ও প্রচলিত পরীক্ষাপদ্ধতিতেও তা শনাক্ত করা কঠিন।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি অংশ শুরু থেকেই ক্ষুদ্র আকারে তৈরি হয়। শিল্পকারখানার প্লাস্টিক কাঁচামাল, প্রসাধনী, পরিষ্কারক পণ্য এবং বিভিন্ন উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক দানা এর উদাহরণ।
আরেক ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয় বড় প্লাস্টিক ভেঙে। পানির বোতল, পলিথিন, মাছ ধরার জাল, দড়ি, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্য সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, ঢেউ, ঘর্ষণ এবং তাপমাত্রার প্রভাবে ক্রমাগত ছোট হতে থাকে। একপর্যায়ে এগুলো অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়।
সিনথেটিক কাপড় ধোয়ার সময় বের হওয়া পলিয়েস্টার ও নাইলনের সূক্ষ্ম আঁশও নদী ও সমুদ্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের বড় উৎস। গাড়ির টায়ারের ক্ষয় থেকে বের হওয়া কণা বৃষ্টির পানির সঙ্গে নালা, নদী ও উপকূলীয় এলাকায় পৌঁছে যেতে পারে।
প্লাস্টিক তাই প্রকৃতি থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে না; মূলত আরও ছোট হয়ে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
মাছের শরীরে প্লাস্টিক ঢোকে কীভাবে?
মাছ সব সময় প্লাস্টিককে খাবার মনে করে খায়—বিষয়টি কেবল এমন নয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক পানিতে এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে খাবার গ্রহণ ও শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেও তা মাছের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
জুপ্ল্যাঙ্কটন ও ছোট জলজ প্রাণী প্রথমে এসব কণা গ্রহণ করে। ছোট মাছ প্ল্যাঙ্কটন খায়, মাঝারি মাছ ছোট মাছ খায় এবং বড় মাছ মাঝারি মাছ খায়। এভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে চলাচল করতে পারে। একই সঙ্গে মাছ সরাসরি পানি থেকে কণা গ্রহণ করতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় মাছের পাকস্থলী, অন্ত্র ও ফুলকায় মাইক্রোপ্লাস্টিক বেশি পাওয়া গেছে। ২০২১ সালের একটি বৈশ্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক বিবেচনায় নেওয়া গবেষণাগুলোয় প্রায় ২৬ শতাংশ মাছের শরীরে প্লাস্টিক গ্রহণের প্রমাণ ছিল এবং সময়ের সঙ্গে এই হার বেড়েছে। তবে অঞ্চল, প্রজাতি, মাছের খাদ্যাভ্যাস এবং পরীক্ষাপদ্ধতি অনুযায়ী ফলাফলে বড় পার্থক্য ছিল। গবেষণাটির সারসংক্ষেপ
সমুদ্রের তলদেশে খাদ্য সংগ্রহকারী মাছ, দূষিত মোহনা ও শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি থাকা প্রজাতি এবং ছাঁকনির মাধ্যমে পানি থেকে খাদ্য গ্রহণকারী ঝিনুকজাতীয় প্রাণীর দূষিত হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি।
খামারে উৎপাদিত মাছও ঝুঁকিমুক্ত নয়। পুকুরের পানি, প্লাস্টিকের আস্তরণ, কৃত্রিম খাবার, মাছের খাবারের প্যাকেজিং, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে। ফলে শুধু সমুদ্রের মাছেই প্লাস্টিক থাকে আর চাষের মাছ সম্পূর্ণ নিরাপদ—এমন সরল বিভাজনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
নাড়িভুঁড়ি ফেলে দিলে কি ঝুঁকি শেষ?
অধিকাংশ মাছের মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রধানত পরিপাকতন্ত্রে পাওয়া যায়। আমরা সাধারণত মাছের পাকস্থলী ও অন্ত্র ফেলে দিয়ে শুধু পেশি বা মাংস খাই। এ কারণে সম্পূর্ণ মাছ বা পরিপাকতন্ত্রসহ খাওয়া জলজ প্রাণীর তুলনায় বড় মাছের মাংস থেকে মানুষের মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের পরিমাণ কম হওয়ার কথা।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাও বলছে, অধিকাংশ মাছের পরিপাকতন্ত্র বাদ দেওয়ায় মানুষের সরাসরি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ অনেকটাই কমে যায়। অন্যদিকে ঝিনুক, শামুক এবং ছোট মাছ যখন সম্পূর্ণ খাওয়া হয়, তখন অন্ত্রে থাকা কণাগুলোও খাবারের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। মৎস্য ও অ্যাকুয়াকালচারে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে FAO-এর পর্যালোচনা
তবে নাড়িভুঁড়ি ফেলে দিলেই সব প্লাস্টিক দূর হয়ে যায়—এমন নিশ্চয়তা নেই। খুব ছোট মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক অন্ত্রের বাধা অতিক্রম করে রক্তপ্রবাহ, যকৃৎ কিংবা পেশিতে পৌঁছাতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। পরীক্ষাগার ও প্রাণীর ওপর করা গবেষণায় এমন স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেলেও বাস্তব পরিবেশে ধরা মাছের ভোজ্য পেশিতে কতটা কণা জমে, তা নিয়ে গবেষণার ফল এখনো অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
২০২১ সালে প্রকাশিত ১৩২টি গবেষণার একটি মূল্যায়ন বলেছিল, মাছ ও ক্রাস্টেশিয়ানের ভোজ্য পেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার প্রমাণ তখনো সীমিত ছিল। গবেষকদের মতে, অনেক গবেষণায় নমুনা দূষণ, অপর্যাপ্ত শনাক্তকরণ এবং পরীক্ষাপদ্ধতির দুর্বলতা ছিল। গবেষণা মূল্যায়নের সারসংক্ষেপ
কিন্তু নতুন ও অধিক সংবেদনশীল পদ্ধতি ব্যবহার করে সাম্প্রতিক গবেষণায় ভোজ্য অংশেও কণা পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন উপকূল ও বাজার থেকে সংগ্রহ করা ১৮২টি মাছ ও ক্রাস্টেশিয়ান নমুনার ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় ভোজ্য টিস্যুতে ব্যাপকভাবে মানবসৃষ্ট ক্ষুদ্র কণা শনাক্ত হয়। গবেষণায় সিনথেটিক তন্তু ছিল সবচেয়ে সাধারণ দূষকগুলোর একটি। বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাত করার বিভিন্ন পর্যায়েও দূষণ যুক্ত হতে পারে বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন। Frontiers in Toxicology-তে প্রকাশিত গবেষণা
অর্থাৎ মাছটি কোন জলাশয় থেকে এসেছে, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য নয়। ধরা, পরিবহন, বরফে রাখা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং এবং রান্নাঘরের পরিবেশেও নতুন প্লাস্টিক কণা যুক্ত হতে পারে।
আমরা আসলে কতটা প্লাস্টিক খাচ্ছি?
এই প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর দেওয়া এখনো কঠিন। কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিক মাপার জন্য বিশ্বব্যাপী অভিন্ন পরীক্ষাপদ্ধতি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
কোনো গবেষণা ৫০০ মাইক্রোমিটারের বড় কণা শনাক্ত করে, অন্য গবেষণা আরও ক্ষুদ্র কণা শনাক্ত করতে পারে। কোনো পরীক্ষায় শুধু দৃশ্যমান পর্যবেক্ষণ করা হয়, আবার কোনো গবেষণায় ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি বা রামান স্পেকট্রোস্কোপির মাধ্যমে কণাটি সত্যিই প্লাস্টিক কি না যাচাই করা হয়। পরীক্ষাগারের বাতাস, পোশাক কিংবা ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি থেকেও নমুনায় তন্তু পড়ে ফলাফল বদলে যেতে পারে।
২০২০ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে ৫০টি গবেষণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অধিকাংশ গবেষণায় সামুদ্রিক খাদ্যে প্রতি গ্রামে একটি কণার কম মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেও ফলাফলের ব্যবধান ছিল বিশাল। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো কোনো খাদ্যাভ্যাসে বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ৫৫ হাজার কণা গ্রহণের সম্ভাবনা অনুমান করা হয়েছিল। কিন্তু গবেষকেরা নিজেরাই বলেছেন, নমুনা, অঞ্চল ও পরীক্ষাপদ্ধতির ব্যাপক ভিন্নতার কারণে এই সংখ্যা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। Environmental Health Perspectives-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণ
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কণার সংখ্যা দিয়ে ঝুঁকি পুরোপুরি বোঝা যায় না। দশটি অপেক্ষাকৃত বড় কণা এবং দশ হাজার ন্যানোপ্লাস্টিক কণার জৈবিক আচরণ এক নয়। কণার আকার, আকৃতি, প্লাস্টিকের ধরন, রাসায়নিক সংযোজন, পৃষ্ঠে লেগে থাকা দূষক এবং শরীরে অবস্থানের সময়—সবকিছু ঝুঁকি নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
মানুষের শরীরে গেলে কী হতে পারে?
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগের তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে।
প্রথমটি হলো কণার শারীরিক প্রভাব। অতিক্ষুদ্র কণা অন্ত্রের আবরণে জ্বালা, কোষীয় চাপ বা প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে—এমন প্রমাণ পরীক্ষাগার ও প্রাণী গবেষণায় পাওয়া গেছে।
দ্বিতীয়টি হলো প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক। রং, নমনীয়তা, অগ্নিপ্রতিরোধ অথবা স্থায়িত্ব বাড়াতে প্লাস্টিকে বিভিন্ন সংযোজক ব্যবহার করা হয়। এর কিছু রাসায়নিক হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
তৃতীয়টি হলো মাইক্রোপ্লাস্টিকের পৃষ্ঠে পরিবেশের অন্য দূষক ও জীবাণু আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা। ভারী ধাতু, দীর্ঘস্থায়ী জৈব দূষক এবং অণুজীব প্লাস্টিক কণার সঙ্গে চলাচল করতে পারে। তবে মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে পৌঁছানো মোট দূষণের কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক বহন করে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃৎ, কিডনি, ধমনি ও মস্তিষ্কের নমুনায় মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার খবর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মৃত মানুষের মস্তিষ্ক, যকৃৎ ও কিডনিতে প্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়; মস্তিষ্কে পাওয়া কণার বড় অংশ ছিল ন্যানো আকারের। তবে গবেষণাটি কণাগুলো কোন উৎস—মাছ, পানি, খাবারের প্যাকেজিং নাকি শ্বাসের বাতাস—থেকে এসেছে তা নির্ধারণ করেনি। প্লাস্টিক পাওয়া গেছে মানেই তা নির্দিষ্ট রোগ সৃষ্টি করেছে—এ কথাও গবেষণাটি প্রমাণ করেনি। Nature Medicine-এ প্রকাশিত গবেষণা
২০২৪ সালের আরেক পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় মানুষের ক্যারোটিড ধমনির প্লাকে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক থাকা এবং পরবর্তী হৃদ্রোগজনিত ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া যায়। কিন্তু এটি কারণ-ফল সম্পর্কের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। প্লাস্টিক রোগ সৃষ্টি করেছে, নাকি অসুস্থ টিস্যুতে প্লাস্টিক বেশি জমেছে—এই প্রশ্ন এখনো খোলা রয়েছে। গবেষণাটির PubMed তথ্য
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়নও একই সতর্ক অবস্থান নির্দেশ করে। খাদ্য, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মানুষ প্লাস্টিক কণার সংস্পর্শে আসছে, কিন্তু বর্তমান তথ্য দিয়ে স্বাভাবিক মাত্রার খাদ্যাভ্যাসে নির্দিষ্ট রোগঝুঁকি নির্ভুলভাবে হিসাব করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ন্যানোপ্লাস্টিক শনাক্তকরণ, শরীরে শোষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে বড় তথ্যঘাটতি রয়েছে। WHO-এর খাদ্য ও শ্বাসের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক সংস্পর্শবিষয়ক প্রতিবেদন
অতএব, “মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিরাপদ”—এ দাবি যেমন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়, তেমনি “মাছ খেলেই প্লাস্টিকজনিত গুরুতর রোগ হবে”—এ কথাও বর্তমান প্রমাণ সমর্থন করে না।
রান্না, ধোয়া ও করণীয়
মাছ ভালোভাবে ধুলে তার বাইরের পৃষ্ঠে লেগে থাকা কিছু কণা সরে যেতে পারে। নাড়িভুঁড়ি ও ফুলকা বাদ দিলে সেখানে জমে থাকা অধিকাংশ কণা খাবারের বাইরে চলে যায়। কিন্তু পেশির ভেতরে প্রবেশ করা অতিক্ষুদ্র কণা ধোয়ার মাধ্যমে বের করা সম্ভব নয়।
রান্নার তাপও মাইক্রোপ্লাস্টিককে নিশ্চিতভাবে ধ্বংস করে না। বরং উচ্চ তাপে কিছু প্লাস্টিক নরম, ভঙ্গুর অথবা আরও ছোট কণায় বিভক্ত হতে পারে। মাছ ভাজা, সিদ্ধ বা ঝোল করার কোন পদ্ধতিতে কতটা কণা কমে—এ বিষয়ে গবেষণার ফল এখনো পর্যাপ্ত নয়।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঝুঁকি কিছুটা কমানোর জন্য বড় মাছের নাড়িভুঁড়ি ও ফুলকা পরিষ্কারভাবে বাদ দেওয়া, মাছ ভালোভাবে ধোয়া এবং খাবার গরম করার সময় প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার না করা যুক্তিসংগত। গরম মাছ পাতলা পলিথিনে রাখা, প্লাস্টিকের বাক্সে দীর্ঘক্ষণ গরম অবস্থায় সংরক্ষণ করা অথবা অনুপযুক্ত প্লাস্টিকের পাত্রে মাইক্রোওয়েভ করা নতুন রাসায়নিক ও কণা দূষণ বাড়াতে পারে।
তবে সমস্যাটির মূল সমাধান রান্নাঘরে নয়। নগরের বর্জ্য নদীতে যাওয়া বন্ধ করা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো, শিল্পবর্জ্য ও পয়োবর্জ্য শোধন, সিনথেটিক কাপড়ের ক্ষুদ্র তন্তু নিয়ন্ত্রণ এবং মাছ ধরার পরিত্যক্ত জাল উদ্ধার—এসব ব্যবস্থা ছাড়া খাদ্যশৃঙ্খলে প্লাস্টিকের প্রবেশ কমানো যাবে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের নদীগুলো ঘনবসতিপূর্ণ শহর, পোশাকশিল্প, প্লাস্টিক কারখানা, বাজার ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ বহন করছে। নদী ও উপকূলীয় মাছের পাশাপাশি পুকুরে চাষ করা মাছের পানি, খাবার এবং উৎপাদন সরঞ্জামও নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু মাছের পাকস্থলীতে কণা গুনলেই যথেষ্ট হবে না; ভোজ্য পেশি, প্রক্রিয়াজাত মাছ এবং বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপ পরীক্ষা করতে হবে।
মাছ খাওয়া কি তাহলে বন্ধ করতে হবে?
বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মাছ খাওয়া বন্ধ করার পরামর্শ দেয় না। মাছ উচ্চমানের প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, আয়োডিন, ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় খনিজের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তায় মাছের ভূমিকা অত্যন্ত বড়।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে মাছ বাদ দিলে তার প্রতিষ্ঠিত পুষ্টিগুণ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। বরং প্রয়োজন হলো বিভিন্ন উৎসের মাছ খাওয়া, পরিষ্কার ও নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিক প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো।
প্রশ্নটি তাই শুধু “মাছের সঙ্গে আমরা প্লাস্টিক খাচ্ছি কি না”—এখানে শেষ হয় না। বড় প্রশ্ন হলো, আমরা প্রতিদিন যে প্লাস্টিক ব্যবহার করে ফেলে দিচ্ছি, সেটি শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে।
বিজ্ঞান বলছে, তার একটি অংশ হারিয়ে যাচ্ছে না। তা ভেঙে নদীতে যাচ্ছে, প্ল্যাঙ্কটনের শরীরে ঢুকছে, মাছের খাদ্যশৃঙ্খলে ঘুরছে এবং শেষ পর্যন্ত আবার আমাদের খাবারের টেবিলে ফিরে আসছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ তাই মাছের সমস্যা নয়; এটি মানুষের উৎপাদন ও ভোগের এমন এক বৃত্ত, যেখানে আমাদের ফেলে দেওয়া বর্জ্য অদৃশ্য কণায় পরিণত হয়ে আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসছে।
আপনার মতামত জানানঃ