চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান আমাদের সামনে আবারও এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে। মাত্র এক মাসে দেশে ৫৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৪৬ জন মানুষের মৃত্যু—এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্প। একই সময়ে ১ হাজার ২০৪ জন আহত হয়েছেন, যাদের অনেকেই হয়তো আজীবন শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির বোঝা বহন করবেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী রেল ও নৌপথ মিলিয়েও মোট দুর্ঘটনা দাঁড়িয়েছে ৫৯৭টি, যেখানে প্রাণ গেছে ৫৮৬ জনের। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায়—বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা এখনো একটি গভীর জাতীয় সংকট।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার উচ্চ হার। জানুয়ারিতে ২০৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২২৩ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৮ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর প্রায় ৪১ শতাংশ। এই প্রবণতা আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা নির্দেশ করে। দ্রুতগামী, তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ চালকের হাতে থাকা মোটরসাইকেল এখন সড়ক নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১৩২টি দুর্ঘটনা এবং ১৩৩ জন নিহত হওয়ার তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। রাজধানীকেন্দ্রিক যানজট, অতিরিক্ত যানবাহন, অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবহার এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলার ঘাটতি এখানে বড় ভূমিকা রাখছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অন্যদিকে সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা কম হলেও সেটি সন্তোষজনক অবস্থার ইঙ্গিত দেয় না; বরং এটি দেখায় যে সমস্যাটি দেশব্যাপী বিস্তৃত।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে প্রথমেই আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। বাংলাদেশে এখনো অনেক চালক ট্রাফিক আইনকে বাধা হিসেবে দেখেন, নিরাপত্তার উপাদান হিসেবে নয়। অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, সিগন্যাল অমান্য করা, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো—এসব আচরণ প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে। অথচ বিশ্বব্যাপী গবেষণা বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার বড় অংশই মানবিক ভুলের কারণে ঘটে। তাই চালক প্রশিক্ষণকে আধুনিক, বাধ্যতামূলক ও কঠোর মানদণ্ডের আওতায় আনতে হবে।
মোটরসাইকেল খাতে বিশেষ নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তরুণ চালকেরা লাইসেন্স ছাড়া বা অল্প প্রশিক্ষণ নিয়ে রাস্তায় নামছেন। হেলমেট ব্যবহারও এখনো শতভাগ নিশ্চিত হয়নি। সরকার চাইলে মোটরসাইকেল লাইসেন্স প্রক্রিয়া আরও কঠোর করতে পারে, বাধ্যতামূলক রাইডিং প্রশিক্ষণ চালু করতে পারে এবং হেলমেট ও সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে পারে। শহরভিত্তিক আলাদা মোটরসাইকেল লেন চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে।
সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নও দুর্ঘটনা কমানোর বড় উপায়। দেশের অনেক মহাসড়কে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, ভাঙা রাস্তা, অপর্যাপ্ত সাইনেজ এবং রাতের আলো স্বল্পতা রয়েছে। কোথাও কোথাও ইউ-টার্ন বা ক্রসিং ডিজাইনই দুর্ঘটনা ডেকে আনে। উন্নত দেশগুলোতে ‘ব্ল্যাক স্পট’ বা দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান শনাক্ত করে দ্রুত প্রকৌশলগত সমাধান দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও সড়ক ও জনপথ বিভাগকে ডাটা-ভিত্তিক এই পদ্ধতি আরও জোরদার করতে হবে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এখন অপরিহার্য। অনেক বড় শহরে এখনো ম্যানুয়াল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরতা বেশি। স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, ক্যামেরা-ভিত্তিক আইন প্রয়োগ, স্বয়ংক্রিয় স্পিড মনিটরিং—এসব প্রযুক্তি দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে অটোমেটেড স্পিড ক্যামেরা চালু করা হলে তাৎক্ষণিক জরিমানার ব্যবস্থা চালকদের আচরণ বদলাতে সাহায্য করবে।
গণপরিবহন খাতের সংস্কারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস প্রতিযোগিতা, যাত্রী তুলতে বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন—এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের। অনেক বাসচালক দৈনিক চুক্তিভিত্তিক আয়ে কাজ করেন, ফলে বেশি ট্রিপ দিতে গিয়ে তারা ঝুঁকি নেন। সরকার যদি চালকদের জন্য নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে পারে এবং মালিক-চালক সম্পর্ককে নিয়মের মধ্যে আনে, তাহলে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা অনেকটাই কমতে পারে।
আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা বাড়ানোও জরুরি। বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়—বিশেষ অভিযানে কিছুদিন কঠোরতা থাকে, তারপর আবার শিথিল হয়ে যায়। কিন্তু সড়ক নিরাপত্তায় সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান আইন প্রয়োগ। লাইসেন্সবিহীন চালনা, অতিরিক্ত গতি, ফিটনেসবিহীন যান, সিগন্যাল ভঙ্গ—এসব অপরাধে নিয়মিত ও স্বচ্ছ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। পথচারীরাও অনেক সময় ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করে ঝুঁকি নেন। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে দেশব্যাপী ধারাবাহিক সচেতনতা কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।
জরুরি চিকিৎসা সেবার উন্নয়নও মৃত্যুহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রাণহানি বাড়ে। মহাসড়কে অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, ট্রমা সেন্টার এবং ‘গোল্ডেন আওয়ার’ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা গেলে বহু জীবন বাঁচানো সম্ভব। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতালের মধ্যে সমন্বিত জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ডাটা সংগ্রহ ও গবেষণার ক্ষেত্রেও উন্নতি দরকার। বর্তমানে দুর্ঘটনার অনেক তথ্য বিচ্ছিন্নভাবে সংগ্রহ হয়। একটি সমন্বিত জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা ডাটাবেজ তৈরি করা গেলে নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর হবে। কোথায়, কখন, কী কারণে দুর্ঘটনা বেশি—এই বিশ্লেষণভিত্তিক পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে সফলতা এনে দিতে পারে।
সরকার ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে—সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন, হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম জোরদার, কিছু স্থানে স্পিডগান ব্যবহার ইত্যাদি। তবে বাস্তবতা বলছে, এসব উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত, সমন্বিত ও ধারাবাহিক করতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর প্রয়োগই এখানে মূল চাবিকাঠি।
সবচেয়ে বড় কথা, সড়ক নিরাপত্তা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। চালক, যাত্রী, পথচারী, পরিবহন মালিক, স্থানীয় প্রশাসন—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব এটি। প্রতিটি হেলমেট পরা, প্রতিটি সিটবেল্ট বাঁধা, প্রতিটি নিয়ম মানা—একটি করে জীবন বাঁচাতে পারে।
জানুয়ারির পরিসংখ্যান আমাদের সতর্কবার্তা দিচ্ছে। যদি এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই সংখ্যা কেবল বাড়তেই থাকবে। কিন্তু আশার জায়গাও আছে। বিশ্বের বহু দেশ পরিকল্পিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পেরেছে। বাংলাদেশও পারবে—যদি আমরা সংখ্যাকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে প্রতিটি সংখ্যার পেছনের মানুষের গল্পকে গুরুত্ব দিই এবং সেই অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করি।
আপনার মতামত জানানঃ