বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের সাফল্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ১১–দলীয় জোটের ৭৭টি আসনের মধ্যে ৬৮টি আসন জামায়াতের ঝুলিতে যাওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। নির্বাচনপূর্ব সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ‘জয়ের আবহ’ তৈরি হয়েছিল—রাজনৈতিক পরিভাষায় যাকে ‘পারসেপশন অব উইনেবিলিটি’ বলা হয়—জামায়াত তা কৌশলে কাজে লাগাতে পেরেছে। কিন্তু তাৎক্ষণিক সাফল্যের উচ্ছ্বাসের বাইরে গিয়ে এখন মূল প্রশ্নটি হলো, এই অর্জন কতটা টেকসই? এটি কি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা, নাকি বিশেষ কিছু পরিস্থিতির ফল?
প্রথমেই আসে বিরোধী শিবিরের ভাঙনের প্রশ্ন। প্রায় ৩০টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ভোট বিভক্ত হয়েছে। রাজনৈতিক তত্ত্বে এটি নতুন কিছু নয়। একই ঘরানার একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোট ছড়িয়ে পড়ে এবং তৃতীয় কোনো শক্তি সুবিধা পায়—এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশসহ বহু দেশেই দেখা গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যদি ভবিষ্যতে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তখন কি জামায়াত একইভাবে সুবিধা পাবে? নাকি এই সাফল্যের একটি বড় অংশ ছিল প্রতিদ্বন্দ্বীর বিভক্তির সুযোগ?
ভোটার উপস্থিতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৬০ শতাংশ টার্নআউট দেখিয়েছে যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাননি। বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বিএনপির সম্ভাব্য জয়ের ধারণা থেকে কিছু ভোটারের মধ্যে আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছিল। বিপরীতে জামায়াত একটি ক্যাডারভিত্তিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ দল হিসেবে তাদের সমর্থকদের সংগঠিতভাবে ভোটকেন্দ্রে নিতে সক্ষম হয়েছে। ‘গেট আউট দ্য ভোট’ কৌশল বহু দেশে ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ নির্বাচনে জামায়াত সেই জায়গায় স্পষ্ট সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো যদি একই কৌশলগত প্রস্তুতি নেয়, তখন এই প্রাধান্য কি বজায় থাকবে?
জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক কাজও আলোচনায় এসেছে। ২০১৪ সালের পর প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি দুর্বল হলেও দলটি মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বন্ধ করেনি। ঘরোয়া তালিম, ধর্মীয় আলোচনা, সামাজিক সহায়তা, নারী কর্মীদের বাড়ি বাড়ি যোগাযোগ এবং অনলাইন প্রচারণা—এসবের মাধ্যমে তারা একধরনের সামাজিক উপস্থিতি ধরে রেখেছে। রাজনৈতিক সংগঠন বিষয়ে গবেষণা বলছে, যে দল ‘সোশ্যাল এমবডিডনেস’ তৈরি করতে পারে—অর্থাৎ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে—সে দল সুযোগ এলে দ্রুত শক্তি দেখাতে পারে। তুরস্কের একে পার্টি কিংবা লাতিন আমেরিকার খ্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টিগুলোর অভিজ্ঞতাও এমনটাই বলে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই সামাজিক নেটওয়ার্ক কি আদর্শগত দৃঢ়তার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, নাকি রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে বিস্তৃত হয়েছে?
ভোটের একটি অংশ বিএনপি থেকে জামায়াতের দিকে সরে গেছে—এমন ধারণাও আলোচনায় আছে। কিন্তু এটি কি ‘আইডিওলজিক্যাল রিয়্যালাইনমেন্ট’, নাকি সাময়িক ‘স্ট্র্যাটেজিক শিফট’? যদি ভোটাররা নীতিগতভাবে অবস্থান বদলে থাকেন, তবে তা টেকসই হতে পারে। কিন্তু যদি হতাশা, বিভ্রান্তি বা সাময়িক রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে হয়ে থাকে, তবে পরিবেশ বদলালে সেই ভোট আবার সরে যেতে পারে। বাংলাদেশের ভোটারদের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে ‘সুইং’ বা দোদুল্যমান; তারা প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় সমীকরণ বা তাৎক্ষণিক ইস্যুর ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন। ফলে জামায়াতের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এই সমর্থনকে স্থায়ী রাজনৈতিক আনুগত্যে রূপ দেওয়া।
তরুণ ভোটারদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এবারের নির্বাচনে অনেক তরুণ প্রথমবার ভোট দিয়েছেন, এবং তাঁদের রাজনৈতিক ধারণা অনেকটাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর। এখানে ‘ইকো চেম্বার’ প্রভাব কাজ করতে পারে—যেখানে মানুষ নিজের মতের সঙ্গে মিল আছে এমন তথ্যই বেশি দেখে। এতে সমর্থনের একধরনের দৃঢ় অনুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তব নীতিগত প্রশ্ন সামনে এলে বা দলীয় পারফরম্যান্স প্রত্যাশা পূরণ না করলে সেই সমর্থন দ্রুত বদলে যেতে পারে।মালয়েশিয়া বা পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তরুণ ভোটারদের উচ্ছ্বাস দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে সুস্পষ্ট নীতি, কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক কর্মসূচি এবং বাস্তব পারফরম্যান্স দেখাতে হয়। জামায়াত কি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে?
সীমান্তবর্তী ও তুলনামূলক দরিদ্র জেলাগুলোতে জামায়াতের সাফল্য আরেকটি দিক নির্দেশ করে। সামাজিক সহায়তা, চিকিৎসা ও শিক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা স্থানীয় আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক তত্ত্বে একে ‘কল্যাণভিত্তিক রাজনীতি’ বা ‘ক্লায়েন্টেলিজম’ বলা হয়। সরাসরি সুবিধা প্রদান ভোটার আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু এটি টেকসই করতে হলে ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। প্রতিদ্বন্দ্বী দল যদি আরও কার্যকর কর্মসূচি দেয়, ভোটের ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির ঘোষিত বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবে রূপ পেলে দরিদ্র অঞ্চলের ভোটাররা কী সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটিই ভবিষ্যতের সমীকরণ নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মনস্তত্ত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই শ্রেণি সাধারণত সুশাসন, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রত্যাশা করে। কোনো দল যদি তাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পাঠায়—যেমন নীতিগত অস্পষ্টতা, নারী প্রশ্নে বিতর্ক বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অস্পষ্ট অবস্থান—তবে সমর্থন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মধ্যবিত্তের আস্থা অর্জন করতে হলে শুধু সাংগঠনিক শক্তি নয়, বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক বয়ান প্রয়োজন।
জামায়াতের রাজনৈতিক এজেন্সির প্রশ্নও সামনে এসেছে। তারা কতটা স্বতন্ত্রভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, আর কতটা বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবের মধ্যে অবস্থান করে—এ নিয়ে জনমনে আলোচনা আছে। অতীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে নানা বিতর্ক হয়েছে। একটি আদর্শভিত্তিক দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট ও ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরতে না পারলে বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সামনের দিনগুলোতে তাদের নীতিগত স্বচ্ছতা ও কূটনৈতিক অবস্থান কতটা দৃঢ় থাকে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভাজনও উপেক্ষা করা যায় না। দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামপন্থী রাজনীতি নানা দল ও মতভেদে বিভক্ত। ঐক্যবদ্ধ ‘ইসলামি ভোটব্যাংক’ গড়ে তোলা সহজ নয়। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়লে সমর্থন ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নারী প্রতিনিধিত্ব ও সামাজিক সহনশীলতার প্রশ্নে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হলে তা মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, আন্দোলন-অভ্যুত্থানপরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশে কোনো দল অস্থায়ী সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, গণভিত্তি ও নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। নির্বাচনপরবর্তী সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের আচরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা কেবল আন্দোলননির্ভর কৌশল গ্রহণ করে, তবে জনমতের একটি অংশ ক্লান্ত হতে পারে। আবার যদি গঠনমূলক সংসদীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করে, তবে তা নতুন রাজনৈতিক মানদণ্ড তৈরি করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, জামায়াতের সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত। এটি দেখিয়েছে যে সংগঠিত প্রচার, শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মীভিত্তি ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল মিলিয়ে নির্বাচনে বড় ফল আনা সম্ভব। কিন্তু টেকসই রাজনীতি শুধু নির্বাচনী সমীকরণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। আদর্শগত স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক কর্মসূচির বাস্তবায়ন, মধ্যবিত্তের আস্থা, তরুণদের প্রত্যাশা এবং সামাজিক সহনশীলতা—সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে হয়। এই পরীক্ষায় জামায়াত কতটা সফল হবে, তা নির্ধারণ করবে তাদের ভবিষ্যৎ অবস্থান। আপাতত নিশ্চিত করে বলা যায়, এই সাফল্য তাদের সামনে যেমন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, তেমনি কঠিন পরীক্ষারও সূচনা করেছে।
আপনার মতামত জানানঃ