মধ্যপ্রাচ্য আবারও একটি বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লাগাতার বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা আক্রমণ পরিস্থিতিকে দ্রুত জটিল করে তুলেছে। সামরিক সংঘাত এখন আর কেবল দুই বা তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চলজুড়ে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনে।
পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি
গত কয়েক দিন ধরে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। বিস্ফোরণের বিকট শব্দ, ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বহুতল ভবনের দৃশ্য এখন তেহরানের দৈনন্দিন বাস্তবতা। অনেক বেসামরিক স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৭৪টি শহরে হামলা হয়েছে এবং তিন হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক শিশু রয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালেও হামলার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে তেহরানের অনেক বাসিন্দা শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। অনেক বাসিন্দা বলছেন, আগে যেখানে যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, এখন সেই রাস্তা কয়েক মিনিটেই পাড়ি দেওয়া যাচ্ছে।
ইরানের পাল্টা হামলা
অন্যদিকে ইরানও বসে নেই। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও ইসরায়েলি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০টি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে। ইরাকের এরবিল এবং কুয়েতের আরিফজান ঘাঁটিতেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের দিকে ছোড়া কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও শতাধিক ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। তবে কিছু ড্রোন দেশের ভেতরে আঘাত হানায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। কাতার ও বাহরাইনেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তেলবাহী জাহাজেও হামলার দাবি করেছে ইরান। এতে সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে নতুন এলাকায়
সংঘাত এখন আর শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে। ইরানের সীমান্তবর্তী আজারবাইজানের একটি বিমানবন্দরেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। আজারবাইজান দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
লেবাননেও উত্তেজনা বাড়ছে। ইসরায়েল সেখানে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে। পাল্টা হিসেবে হিজবুল্লাহও রকেট ও ড্রোন হামলা করছে। দক্ষিণ লেবাননের অনেক এলাকা থেকে মানুষ নিরাপত্তার খোঁজে রাজধানী বৈরুতসহ অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সংঘাত ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১৩টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে পুরো অঞ্চল একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক প্রস্তুতি
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সামরিক কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইতিমধ্যে অতিরিক্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্তত ১০০ দিন ধরে এই যুদ্ধ চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তুতিও চলছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভেবেছিল সীমিত হামলার মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। কিন্তু ইরানের শক্ত প্রতিরোধ সেই হিসাব পাল্টে দিয়েছে।
ইউরোপ ও মিত্রদেশগুলোর সম্পৃক্ততা
এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোরও সম্পৃক্ততার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্স সাইপ্রাসের নিরাপত্তা জোরদার করতে নৌবাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি মধ্যপ্রাচ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়াও মধ্যপ্রাচ্যে সংকট মোকাবিলার জন্য সামরিক সরঞ্জাম ও বিশেষ দল পাঠিয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, প্রয়োজনে তার দেশ যুদ্ধের অংশ হতে পারে।
ফলে ধীরে ধীরে এই সংঘাত একটি বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
রাশিয়ার সমালোচনা
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করেছে। মস্কোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র আরব দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াতে চাইছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে হলে ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে জড়িত না হলেও এই সংঘাতকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক ঝুঁকি
এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে দাবি করেছিলেন যে হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে বড় ধাক্কা দেওয়া হয়েছে।
তিনি ধারণা করেছিলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অভিযান শেষ হবে। কিন্তু ইরানের পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
এখন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
রিপাবলিকান পার্টির অনেক কৌশলবিদ মনে করছেন, এই যুদ্ধ জনসমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং এটি অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ ইস্যু থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দিতে পারে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী অঞ্চল। ফলে এই অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্বে।
পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ইতিমধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেক দেশ তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা করছে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন খরচও বাড়বে।
মানবিক সংকটের আশঙ্কা
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বোমা হামলা, নিরাপত্তাহীনতা, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট—সব মিলিয়ে ইরানসহ পুরো অঞ্চলে মানবিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক এলাকায় হাসপাতাল ও জরুরি সেবা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো যুদ্ধ থামানো এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং এটি ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
যদি আরও দেশ সরাসরি এতে জড়িয়ে পড়ে, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তখন এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের অন্যতম বড় সামরিক সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
বিশ্বজুড়ে তাই এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই যুদ্ধ কি দ্রুত থামবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘমেয়াদি এক অস্থিরতার যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে?
বর্তমান বাস্তবতা বলছে, যুদ্ধের আগুন ইতিমধ্যেই অনেক দূর ছড়িয়ে পড়েছে। এখন তা নিয়ন্ত্রণ করা আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য বড় এক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চাইলে আমি এটাকে আরও ভালো ম্যাগাজিন স্টাইল ফিচার (হেডিং, সাবহেডিং, কোট, বক্স আইটেমসহ) করে দিতে পারি, যা পত্রিকা বা অ্যাসাইনমেন্টে জমা দেওয়ার জন্য আরও শক্তিশালী হবে।
আপনার মতামত জানানঃ