মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরানের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক হামলা শুধু একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি গোটা অঞ্চলের ভঙ্গুর স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। কয়েক মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে যুদ্ধবিরতির যে ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক এই হামলা সেটিকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি, জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে এখন হরমুজ প্রণালি এবং ইরানকে ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন সংকট।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির আশেপাশে ইরানের চারটি ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক’ ড্রোন ভূপাতিত করার পর পঞ্চম ড্রোন উৎক্ষেপণের প্রস্তুতির সময় তারা বন্দর আব্বাসের একটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। সেন্টকম এই অভিযানের ব্যাখ্যায় বলেছে, এটি ছিল সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক এবং যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার স্বার্থে পরিচালিত সীমিত সামরিক পদক্ষেপ। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘আত্মরক্ষা’ শব্দটির ব্যাখ্যা প্রায়ই ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে। ইরান এই হামলাকে যুদ্ধবিরতির চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।
বন্দর আব্বাস শুধু একটি সামরিক ঘাঁটি নয়; এটি ইরানের অর্থনীতি, নৌবাণিজ্য এবং কৌশলগত প্রতিরক্ষার অন্যতম কেন্দ্র। হরমুজ প্রণালির খুব কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় এই অঞ্চল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। ইতোমধ্যেই দীর্ঘ সময় ধরে নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বহু দেশ অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, তাহলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও সরবরাহ সংকট নতুন মাত্রা পেতে পারে।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্য কার্যত এক নতুন সংঘাতের ভেতর প্রবেশ করে। একই সময়ে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হেজবুল্লাহর সাথেও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ইসরায়েল। ফলে যুদ্ধটি এখন কেবল একটি দেশের বিরুদ্ধে আরেক দেশের লড়াই নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিফলন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন শক্তির মধ্যে চলমান উত্তেজনা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে একদিকে যেমন শান্তি চুক্তির সম্ভাবনার কথা বলেছেন, অন্যদিকে আবার বড় আকারের সামরিক হামলার হুমকিও দিয়েছেন। তার বক্তব্যে একধরনের দ্বৈত কৌশল স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে আলোচনার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি, অন্যদিকে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এখন চুক্তির জন্য অত্যন্ত আগ্রহী এবং তাদের সামনে বিকল্প খুব কম। তবে একইসঙ্গে তিনি এটাও বলেছেন যে, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র “কাজ শেষ” করতে আবারও হামলা চালাবে।
মার্কিন প্রশাসনের ভেতর থেকেও একই ধরনের বার্তা এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে কোন কোন বিষয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মূল বিরোধের জায়গা হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত একটি খসড়া চুক্তি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সেখানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথা উল্লেখ ছিল। যদিও হোয়াইট হাউস এই খসড়াকে “সম্পূর্ণ মিথ্যা” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু এমন তথ্য প্রকাশ পাওয়াই প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে একাধিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। যুদ্ধক্ষেত্রে গোলাগুলি চললেও কূটনৈতিক দরকষাকষি থেমে নেই।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ এবং তেলবাহী ট্যাংকার আটকা পড়ে আছে বলে জানা গেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির বিষয় নয়; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রীয় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার বহু দেশ এই পরিস্থিতির কারণে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় ও আমদানি সংকটের মুখোমুখি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলা মূলত একটি কৌশলগত বার্তা। ওয়াশিংটন দেখাতে চাইছে যে, যুদ্ধবিরতি থাকলেও তারা নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও সক্ষমতা বজায় রাখবে। একইসঙ্গে এটি ইরানের জন্য সতর্কবার্তা যে, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের সামরিক তৎপরতা সহ্য করা হবে না। অন্যদিকে ইরানও অভ্যন্তরীণভাবে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ দেশটির সরকার যদি দুর্বল প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাহলে তা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে পরিণত হতে পারে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি ইতোমধ্যেই দাবি করেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। এসব দাবি কতটা সত্য, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এমন বহু সময় এসেছে, যখন সীমিত সামরিক সংঘাত দ্রুত বড় যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে যখন তেল, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি একই বিন্দুতে এসে দাঁড়ায়, তখন সংকট আরও জটিল হয়ে ওঠে। বর্তমান পরিস্থিতিও সেই আশঙ্কাকেই সামনে নিয়ে আসছে। কারণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মাটিতে বাস্তবতা ভিন্ন। হামলা, পাল্টা হামলা, ড্রোন ভূপাতিত করা, সামরিক মহড়া—সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চল এক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে।
বিশ্বরাজনীতিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই সংঘাত কি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে, নাকি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ তৈরি হবে? যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে আলোচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, কিন্তু একইসঙ্গে সামরিক চাপও অব্যাহত রাখছে। ফলে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে কূটনৈতিক অগ্রগতি এবং মাঠপর্যায়ের সামরিক অবস্থানের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দ্রুত কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। এতে শুধু জ্বালানি নয়, বিশ্ববাণিজ্যের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে এবং বিভিন্ন দেশ বিকল্প জ্বালানি রুট নিয়ে চিন্তা শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে বন্দর আব্বাসে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও গভীর করেছে। যুদ্ধবিরতির মাঝেও যখন সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকে, তখন শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ এই সংঘাতের ফলাফল শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতির ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ