ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বহু বছর ধরে যে টানাপোড়েন চলছে, তার কেন্দ্রীয় চরিত্রদের একজন নিঃসন্দেহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শুধু ইসরায়েলের রাজনীতির নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনারও একটি পরিচিত মুখ। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের বড় অংশজুড়ে ছিল একটি বার্তা—ইরানকে রুখতে হবে, যেকোনো মূল্যে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের কূটনৈতিক বাস্তবতা এমন এক প্রশ্ন সামনে এনেছে, যা হয়তো কয়েক বছর আগেও অচিন্তনীয় ছিল—ইরানকে নিয়ে নতুন কোনো সমঝোতা বা চুক্তি যদি বাস্তবায়নের দিকে এগোয়, তাহলে কি নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান ও উত্তরাধিকার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে?
ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতিতে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। ইসরায়েলের দৃষ্টিতে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দেশটির অস্তিত্বগত নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এই বয়ানকে সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে সামনে এনেছেন নেতানিয়াহু। তিনি বহুবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে সতর্ক করেছেন যে ইরানকে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ছাড় দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
এই অবস্থান শুধু কূটনৈতিক ছিল না; এটি ছিল তার রাজনৈতিক পরিচয়েরও অংশ। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, নেতানিয়াহু নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যিনি আপসের চেয়ে চাপের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তার বক্তব্যে বারবার এসেছে—শক্ত অবস্থান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
কিন্তু বাস্তবতা সবসময় রাজনৈতিক বক্তব্যের সরল রেখা অনুসরণ করে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, সামরিক সাফল্য ও কূটনৈতিক সমাধান একে অপরের বিকল্প নয়; বরং জটিল সমীকরণের অংশ। এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন দ্বন্দ্ব।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনাগুলো ইঙ্গিত করছে, যুক্তরাষ্ট্র আবারও এমন এক পথে হাঁটতে আগ্রহী হতে পারে যেখানে সামরিক চাপের পাশাপাশি আলোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উত্তেজনার পর অনেক সময় বড় শক্তিগুলো আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে—কারণ দীর্ঘ সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্যও কম নয়।
এই পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর জন্য অস্বস্তিকর হওয়ার কারণ আছে। কারণ তার রাজনৈতিক ভাষ্য দীর্ঘদিন ধরে দাঁড়িয়ে ছিল এই ধারণার ওপর যে ইরানের সঙ্গে আপস নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধই কার্যকর পথ। যদি নতুন কোনো সমঝোতা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং তা বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—তাহলে এতদিনের কঠোর অবস্থান কতটা কার্যকর ছিল?
এখানে আরেকটি বড় বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্ক। বহু বছর ধরে দুই দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ককে প্রায় অবিচ্ছেদ্য বলে মনে করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, দুই দেশের স্বার্থ সবসময় এক নয়। ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক হিসাব আর তেল আবিবের নিরাপত্তা হিসাবের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য থেকে যায়।
একসময় নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক আলোচনায় সরাসরি প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করতেন। অতীতে তিনি মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থানও নিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই কৌশল আগের মতো সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাত রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে। ফলে কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা তাকে আরও জটিল অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও বদলাচ্ছে। যুদ্ধের সময় সাধারণত সরকারের প্রতি সমর্থন বাড়ে—এটি অনেক দেশের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ভোটাররা অন্য প্রশ্ন করতে শুরু করেন। যুদ্ধের লক্ষ্য কী ছিল? কী অর্জিত হলো? দীর্ঘমেয়াদে দেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালী হলো?
যদি জনগণের একটি অংশ মনে করতে শুরু করে যে সংঘাত বাড়লেও কৌশলগত লাভ সীমিত ছিল, তাহলে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। কারণ ভোটাররা শুধু সামরিক পদক্ষেপ নয়, ফলাফলও মূল্যায়ন করেন।
নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি অভিযোগ করে আসছেন—তিনি নিরাপত্তা ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান তৈরিতে সবসময় সফল হন না। সমর্থকেরা অবশ্য উল্টো যুক্তি দেন—মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় শক্ত অবস্থান ছাড়া বিকল্প নেই।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই আজকের বিতর্ককে জটিল করেছে।
ইরান প্রশ্নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আঞ্চলিক ভারসাম্য। উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের কৌশল নতুনভাবে সাজিয়েছে। তারা একদিকে নিরাপত্তা চায়, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশও প্রয়োজন। ফলে সব পক্ষ একই মাত্রার সংঘাত চায় না।
এমন অবস্থায় যদি কোনো নতুন চুক্তি আঞ্চলিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি করে, তাহলে সেটি নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কারণ তখন আলোচনার সফলতা বনাম চাপের কৌশল—এই তুলনা সামনে চলে আসবে।
তবে এটাও সত্য, কূটনৈতিক চুক্তি মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোনো চুক্তি বাস্তবায়নের পরও সন্দেহ, নজরদারি, অভিযোগ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থেকে যায়। ফলে চুক্তি সফল হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগ, আন্তর্জাতিক আস্থা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আচরণের ওপর।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও এখানেই মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়। একজন নেতার উত্তরাধিকার শুধু তার নেওয়া সিদ্ধান্ত দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং সময়ের পরীক্ষায় সেই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
যদি ভবিষ্যতে ইতিহাস বলে যে কূটনৈতিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা এনেছিল, তাহলে নেতানিয়াহুর কঠোর অবস্থান নতুনভাবে মূল্যায়িত হতে পারে। আবার যদি কোনো সমঝোতা ব্যর্থ হয় এবং নিরাপত্তা সংকট আরও বাড়ে, তাহলে তার সতর্কবার্তাগুলো নতুন গুরুত্ব পেতে পারে।
রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন সত্য সম্ভবত এটাই—এক সময়ের দৃঢ় অবস্থান অন্য সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে, আবার কখনও সমালোচিত সিদ্ধান্তই পরে দূরদর্শী বলে বিবেচিত হয়।
ইরানকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি কূটনৈতিক আলোচনা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং একজন দীর্ঘমেয়াদি নেতার রাজনৈতিক পরিচয়ের পরীক্ষাও।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হয়তো এতটা নয় যে কোনো চুক্তি হবে কি হবে না। বরং প্রশ্ন হলো—যদি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়, তাহলে সেই বাস্তবতায় পুরোনো রাজনৈতিক দর্শনগুলো কতটা টিকে থাকবে। আর সেই উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ভবিষ্যৎ ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে—অটল নিরাপত্তানেতা হিসেবে, নাকি পরিবর্তিত ভূরাজনীতির মুখে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে।
আপনার মতামত জানানঃ