
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কেউই প্রকাশ্যে সংঘাত বাড়াতে চায় না, আবার পুরোনো সম্পর্কের কাঠামোয় ফিরে যাওয়াও সহজ নয়। ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বৈঠকে তাই “অনুকূল পরিবেশ” তৈরির আহ্বান নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়। এটি একই সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের আগ্রহ, রাজনৈতিক দূরত্বের স্বীকৃতি এবং ভারতের প্রতি বাংলাদেশের কয়েকটি প্রত্যাশার পরোক্ষ প্রকাশ।
এই বৈঠকের সময়টিই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ দাবি করে আসছে; অন্যদিকে ভারত বলছে, বিষয়টি তাদের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে পর্যালোচিত হচ্ছে। এমন উত্তেজনার মধ্যেই দুই দেশ সম্পর্ক উন্নয়নের ভাষা ব্যবহার করছে। অর্থাৎ হাসিনা প্রশ্নে মতবিরোধ আপাতত দূর না হলেও ঢাকা ও দিল্লি পুরো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি ইস্যুর কাছে জিম্মি রাখতে চাইছে না। Reuters
কিন্তু এখানেই নতুন সমীকরণের জটিলতা। গত দেড় দশকে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক মূলত দুই সরকারের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বন্দর ব্যবহার ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশের ভেতরে একটি ধারণা শক্তিশালী হয়েছিল—দিল্লি বাংলাদেশের রাষ্ট্রের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট সরকার ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই ধারণাই ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক সংকটে পরিণত হয়।
নতুন বাংলাদেশ সরকার সম্ভবত সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে হাঁটছে না। বরং তারা সম্পর্কের ভিত্তি বদলাতে চায়—ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক সম্পর্কের বদলে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান এবং দৃশ্যমান সমতার সম্পর্ক। তারেক রহমানের “অনুকূল পরিবেশ” কথাটির রাজনৈতিক অর্থ এখানেই। ঢাকা বোঝাতে চাইছে, উন্নত সম্পর্কের দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়; ভারতের আচরণেও পরিবর্তনের প্রমাণ থাকতে হবে।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তাঁর দিল্লি থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগকে বাংলাদেশ সরকার শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখছে না। ঢাকার দৃষ্টিতে এটি ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন। ভারত ওই অনুষ্ঠান আয়োজন বা সমর্থনের কথা অস্বীকার করলেও ঘটনাটি দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে। The Guardian
ভারতের অবস্থানও সহজ নয়। শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন দিল্লির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক অংশীদার ছিলেন। তাঁর সরকারের সময়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবিলা, সড়ক ও নৌ যোগাযোগ এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারে দিল্লি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পেয়েছে। ফলে তাঁকে প্রত্যর্পণ করা ভারতের কাছে শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়; এটি ভবিষ্যতে প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক মিত্রদের কাছে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
আবার তাঁকে অনির্দিষ্টকাল রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ দিলে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাও কঠিন হবে। ফলে দিল্লিকে এখন এমন একটি ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে, যেখানে পুরোনো মিত্রকে পুরোপুরি ত্যাগ করার বার্তা যাবে না, কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা যাবে।
দীনেশ ত্রিবেদীকে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে ঢাকায় পাঠানো ভারতের ক্ষেত্রে বিরল সিদ্ধান্ত। নিয়োগের সময় থেকেই এটিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। Reuters একজন রাজনৈতিক দূতের সুবিধা হলো, তিনি শুধু আমলাতান্ত্রিক ভাষায় সীমাবদ্ধ না থেকে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারেন।
তবে সম্পর্কের সংকট শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণেই সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্তে হত্যা, তিস্তার পানিবণ্টন, অন্যান্য অভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যবৈষম্য এবং বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অশুল্ক বাধা বহুদিনের অমীমাংসিত প্রশ্ন। বাংলাদেশ মনে করে, নিরাপত্তা ও যোগাযোগে ভারতকে দেওয়া সুবিধার তুলনায় পানি ও বাণিজ্যে প্রত্যাশিত প্রতিদান পাওয়া যায়নি।
বাণিজ্যিক সম্পর্কেও ভারসাম্যের ঘাটতি স্পষ্ট। ভারতের সরকারি বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানি ছিল প্রায় ১১.৪৬ বিলিয়ন ডলার; বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে আমদানি ছিল প্রায় ২.০৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের শিল্প আবার তুলা, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন কাঁচামালের জন্য ভারতীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। India Brand Equity Foundation
এই বৈষম্য শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়। ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশের সুযোগ, স্থলবন্দরের সক্ষমতা এবং অশুল্ক বাধা দূর না হলে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে সমতার সম্পর্ক বলা কঠিন। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণ বলছে, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের ভারতে রপ্তানি ১৮২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে; পরিবহন ও লেনদেন ব্যয় কমানো গেলে সম্ভাব্য বৃদ্ধি আরও বেশি। World Bank
যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একই দ্বৈততা রয়েছে। ভারত বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বন্দর ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে স্বল্প ব্যয়ে সংযোগ চায়। বাংলাদেশ চায় এই সংযোগ থেকে নেপাল ও ভুটানের বাজার, জলবিদ্যুৎ এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় সমান প্রবেশাধিকার। অর্থাৎ ট্রানজিট একমুখী সুবিধা না হয়ে পারস্পরিক অর্থনৈতিক করিডরে পরিণত হবে কি না, সেটিও নতুন সম্পর্কের পরীক্ষা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের উপস্থিতি। বাংলাদেশের অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ঢাকার জন্য চীনকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা বাস্তবসম্মত নয়। দিল্লি আবার বাংলাদেশে চীনের বাড়তি প্রভাবকে নিজের নিরাপত্তা ও বঙ্গোপসাগরীয় কৌশলের দৃষ্টিতে দেখে। ফলে বাংলাদেশকে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে, যেখানে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে অস্বীকার না করেও নিজেদের অর্থনৈতিক অংশীদার নির্বাচনের স্বাধীনতা বজায় থাকে।
তবে দিল্লিরও বুঝতে হবে, বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ককে শুধু ভারতবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখলে ঢাকার কৌশলগত স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হয়। বাংলাদেশ ভারতের প্রতিবেশী, কিন্তু ভারতের প্রভাববলয়ের অধীন কোনো রাষ্ট্র নয়। নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে ভারত এই বাস্তবতাকে কতটা গ্রহণ করে তার ওপর।
বাংলাদেশের সামনে আবার আবেগ ও বাস্তব স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভারতবিরোধী জনমতকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা সহজ; কিন্তু বিদ্যুৎ, খাদ্য, চিকিৎসা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সীমান্ত নিরাপত্তায় ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক বিকল্প তৈরি করা কঠিন। একইভাবে ভারতের পক্ষেও ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি অভিন্ন সীমান্তঘেরা বাংলাদেশকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীলতা, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের সহযোগিতা দিল্লির প্রয়োজন।
এই পারস্পরিক প্রয়োজনই সম্পর্ক পুনর্গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। কিন্তু প্রয়োজন থাকা আর আস্থা থাকা এক বিষয় নয়। আস্থা তৈরির জন্য দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। শেখ হাসিনাকে ভারতের ভূখণ্ড থেকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার সুযোগ না দেওয়া, প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে স্পষ্ট আইনি অবস্থান জানানো, সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করা এবং পানি ও বাণিজ্যের প্রশ্নে অগ্রগতি দেখানো ভারতের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও ভারতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং ভারতবিরোধী সহিংস তৎপরতার আশঙ্কা নিয়ে স্বচ্ছ অবস্থান প্রয়োজন। কূটনৈতিক সম্পর্ক যদি শুধু অভিযোগ বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে দুই দেশেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শক্তিশালী হবে এবং সমঝোতার জায়গা সংকুচিত হবে।
“অনুকূল পরিবেশ” তাই কোনো অস্পষ্ট কূটনৈতিক বাক্য নয়। এর মধ্যে কয়েকটি শর্ত লুকিয়ে আছে—বাংলাদেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, পুরোনো দলকেন্দ্রিক নীতি থেকে ভারতের সরে আসা এবং বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা। একই সঙ্গে এটি দিল্লির প্রতি ঢাকার বার্তা যে মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ দরজা বন্ধ করছে না।
ঢাকা–দিল্লির নতুন সম্পর্ক পুরোনো ঘনিষ্ঠতার হুবহু পুনরাবৃত্তি হবে না। আবার স্থায়ী বৈরিতাও দুই দেশের কারও স্বার্থে নয়। সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হলো সতর্ক সহযোগিতা—যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে পারস্পরিক সুবিধা দিয়ে বিচার করা হবে।
এখন মূল প্রশ্ন, দুই দেশ কি সম্পর্ককে ব্যক্তি ও দলের সীমা ছাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারবে? পারলে শেখ হাসিনা প্রশ্নে মতবিরোধ চললেও বাণিজ্য, পানি, সীমান্ত ও যোগাযোগে অগ্রগতি সম্ভব। আর তা না পারলে আজকের সৌজন্যমূলক বৈঠক আর “অনুকূল পরিবেশের” আহ্বান কূটনৈতিক বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ