
দুই বছর আগে যে দিনে শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন, সেই ৫ আগস্টকেই তিনি বেছে নিলেন ফেরার ঘোষণা দেওয়ার জন্য। দিল্লি থেকে সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার কথা বলা নিছক ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা নয়। এর মধ্যে আছে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন, আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মনোবল ফেরানোর চেষ্টা এবং বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ। কিন্তু একই দিনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মাগুরায় সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাকিব আল হাসানের বাড়িতে হামলা পুরো ঘটনাকে আরেকটি বিপজ্জনক মাত্রা দিয়েছে। বিদেশের মঞ্চে রাজনৈতিক বক্তব্য আর দেশের ভেতরে প্রতিক্রিয়াশীল সহিংসতা—এই দুই দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরোনো প্রতিশোধের চক্র ফিরে আসার আশঙ্কাকেই সামনে আনছে।
শেখ হাসিনা দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার আয়োজনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বলেন, কারাগার বা মৃত্যুর ভয় সত্ত্বেও তিনি দেশে ফিরবেন। তিনি নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন, আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিও জানান। অন্যদিকে জাতিসংঘের অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুর কথা উঠে এসেছে। ফলে হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি শুধু রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার অধিকারের নয়; এটি বিচার, জবাবদিহি ও একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের আইনি নিষ্পত্তির প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত।
দিল্লিতে এই সংবাদমাধ্যমের আয়োজন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল। ভারত সরকার জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যম-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের আয়োজন এবং এর সঙ্গে নয়াদিল্লির সরকারি সম্পৃক্ততা বা সমর্থন নেই। কিন্তু বাংলাদেশের আপত্তি কেবল কে আয়োজন করেছে, সেই কারিগরি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়ে আসছে। সেই ব্যক্তিই ভারতের মাটিতে থেকে বাংলাদেশের সরকার, বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্ষোভ জানিয়েছে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর এর বিরূপ প্রভাবের সতর্কতা দিয়েছে।
এখানে ভারতের অবস্থানের একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব আছে। একদিকে দিল্লি বলতে পারে, একটি বেসরকারি সংগঠনের সংবাদ সম্মেলন ভারত সরকারের নীতিগত অনুমোদন নয়। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই। ফলে তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতাকে পুরোপুরি ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে দেখানো কঠিন। বাংলাদেশে ভারতের সমালোচকেরা ঘটনাটিকে সাবেক শাসকের জন্য রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রচারের সুযোগ হিসেবে দেখবেন—এটি অনুমান করা কঠিন ছিল না। নয়াদিল্লি যদি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়তে চায়, তবে শুধু আনুষ্ঠানিক দূরত্ব ঘোষণা যথেষ্ট হবে না; তাকে বোঝাতে হবে যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত কোনো পক্ষের পুনর্বাসন প্রকল্পের অংশ নয়।
কিন্তু দিল্লির ভূমিকার সমালোচনা বাংলাদেশের ভেতরের সহিংসতাকে বৈধ করে না। ৫ আগস্ট রাত পৌনে নয়টার দিকে মাগুরার কেশব মোড় এলাকায় শাকিব আল হাসানের বাড়িতে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ইট ছুড়ে জানালার কাচ ভাঙে। স্থানীয় পুলিশের প্রাথমিক তথ্যে মূল ফটকে পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়ার চেষ্টা সন্দেহ করা হলেও পেট্রলবোমা ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিস্ফোরণের ভিডিওও পুলিশ তখন পর্যন্ত যাচাই করেনি। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে অতিরঞ্জিত তথ্য দ্রুত সহিংসতার নতুন যুক্তি তৈরি করতে পারে। তবে পেট্রলবোমা ব্যবহৃত হয়েছে কি না, সেটি হামলার মৌলিক চরিত্র বদলায় না—একজন রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তির পরিবারের বাড়ি লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে, এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরাধীদের শনাক্ত করা।
শাকিব আল হাসান একজন জনপ্রিয় ক্রিকেটার হলেও তিনি ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলার আসামিও। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার হতে পারে, হওয়াই উচিত। কিন্তু অভিযোগের জবাব আদালতে দিতে হবে; বাড়িতে হামলা করে নয়। ব্যক্তি দেশে না থাকলেও তাঁর বাড়ি, স্বজন কিংবা সম্পত্তিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের লক্ষ্য বানানো আইনের শাসনকে অস্বীকার করে। যে আন্দোলন বিচারহীনতা ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তার পরবর্তী রাষ্ট্র যদি বিরোধী পরিচয়ের মানুষের সম্পত্তি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে নৈতিক উচ্চতা দ্রুত ক্ষয়ে যায়।
ঘটনাটির সময়ও তাৎপর্যপূর্ণ। শাকিব ওই সংবাদমাধ্যমের আয়োজনে অংশ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাড়িটিতে হামলা হয়। তদন্ত ছাড়া হামলার উদ্দেশ্য বা হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে সময়গত যোগসূত্র রাজনৈতিক প্রতিশোধের ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ হবে এই ধারণাকে স্লোগান দিয়ে খণ্ডন করা নয়, দৃশ্যমান ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্য বের করা। কারা হামলা করেছে, আগে কোনো হুমকি ছিল কি না, পুলিশ কী নিরাপত্তা নিয়েছিল এবং ভিডিওতে দেখা ঘটনাগুলো সত্য কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ করতে হবে।
শেখ হাসিনার বক্তব্যও সমানভাবে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। তিনি যদি দেশে ফিরে রাজনীতি বা আইনি লড়াই করতে চান, তবে তাঁকে ২০২৪ সালের প্রাণহানি, গুম, দমন-পীড়ন এবং দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে। কেবল ষড়যন্ত্রের ভাষ্য দিয়ে সেই দায় মুছে ফেলা যাবে না। একইভাবে তাঁর বিরোধীরা যদি বিচারকে প্রতিশোধে এবং আইনের শাসনকে জনতার হামলায় প্রতিস্থাপন করে, তবে তারা শেষ পর্যন্ত সেই একই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরুৎপাদন করবে, যার বিরুদ্ধে পরিবর্তনের দাবি উঠেছিল।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের জন্য তিনটি বাস্তব পরীক্ষা সামনে এসেছে। প্রথমত, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি স্পষ্ট, কার্যকর কূটনৈতিক বোঝাপড়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, প্রত্যর্পণ-অনুরোধের আইনি অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ নীরবতার বদলে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দরকার। তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে নিজের ভূখণ্ডে প্রতিশোধমূলক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করে দেখাতে হবে যে রাজনৈতিক বিরোধের নিষ্পত্তি আদালত ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই হবে। এক পক্ষের কূটনৈতিক অসংবেদনশীলতা অন্য পক্ষের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার অজুহাত হতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ডিসেম্বরেই ফিরবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তাঁর ঘোষণা রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশলও হতে পারে। কিন্তু ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় যে কূটনৈতিক উত্তেজনা ও দেশীয় সহিংসতার ছবি দেখা গেল, তা বাস্তব। বাংলাদেশের সামনে এখন পছন্দটি খুব পরিষ্কার: অতীতের অপরাধের বিচার করতে হবে, কিন্তু নতুন অপরাধ সৃষ্টি করে নয়; প্রতিবেশীর হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ করতে হবে, কিন্তু নিজের নাগরিকের নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে নয়। প্রতিশোধের রাজনীতি ক্ষমতার মুখ বদলায়—রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় না। বাংলাদেশের প্রয়োজন সেই চরিত্র বদলানো।
আপনার মতামত জানানঃ