বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বরাবরই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভৌগোলিক নৈকট্য, অভিন্ন নদী, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, জ্বালানি, সংস্কৃতি এবং মানুষের পারস্পরিক যাতায়াত—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের পরিসর অনেক বিস্তৃত। ফলে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হলে বিদ্যমান নানা জটিলতা দূর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক মন্তব্যে।
ভারতের হাইকমিশনার বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একসাথে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তার ভাষায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত অনেক সম্মান করে। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনেছেন এবং মনে করেন, তিনি কথাগুলো অন্তর থেকে বলেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও ‘জনগণের ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেন। দুই দেশের এই দুই নেতা যখন আলোচনায় বসবেন, তখন অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন তিনি।
দীনেশ ত্রিবেদীর এই মন্তব্যের তাৎপর্য কেবল একটি কূটনৈতিক সৌজন্যবাক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। কোথাও মতপার্থক্য রয়েছে, কোথাও বাস্তবায়নের জটিলতা রয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক আস্থা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রশ্ন সামনে আসে। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ থাকলেও শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি রাজনৈতিক আলোচনা অনেক সময় এসব জটিলতার সমাধানের পথ সহজ করে দিতে পারে।
রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে শিশুদের জন্য একটি খেলার জায়গা উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হাইকমিশনার এসব কথা বলেন। ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে ভিসা আবেদন কেন্দ্রের একটি মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সেখানেই উঠে আসে দুই দেশের বৃহত্তর সম্পর্কের প্রসঙ্গ। দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, আলোচনা করলে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা যায়। তার বিশ্বাস, দুই দেশের মানুষ এক এবং সমস্যার সমাধান হবেই। তার বক্তব্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচকতার বদলে ইতিবাচক সম্ভাবনার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষের যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, পর্যটন কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রতিবছর ভারতে যাতায়াত করেন। ফলে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়া বা নির্দিষ্ট শ্রেণির ভিসা পুনরায় চালু হওয়া দুই দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। সেই বাস্তবতার জায়গা থেকেই ভিসা আবেদন কেন্দ্রের শিশুদের জন্য আলাদা খেলার জায়গা তৈরির উদ্যোগটিও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।
বাংলাদেশে দায়িত্ব নেওয়ার পর দীনেশ ত্রিবেদী ভিসা আবেদন কেন্দ্রে অপেক্ষমাণ অভিভাবকদের সঙ্গে আসা শিশুদের জন্য একটি আলাদা খেলার জায়গা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবে খেলার জায়গাটি উদ্বোধন করা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা আবার চালুর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল। ফলে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও চলাচলের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মূল আলোচ্য কেবল ভিসা বা পর্যটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়ে আসছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি সহযোগিতা, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ইস্যুর কোনোটি দ্রুত সমাধানযোগ্য, আবার কোনোটি বহুস্তরীয় আলোচনার দাবি রাখে। তাই শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগকে কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়।
দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি আলোচনায় বসানোর প্রত্যাশা। তিনি মনে করেন, দুই নেতা নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পেলে অনেক সমস্যা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে এবং সেখান থেকেই সমাধানের পথ বেরিয়ে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতপার্থক্যকে কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, সেটিই অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা প্রযোজ্য। দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বহু ক্ষেত্র যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু বিষয়ে মতপার্থক্যও আছে। ফলে সম্পর্ককে কেবল সমস্যা বা কেবল সাফল্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। বাস্তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হলো আলোচনা, সমঝোতা, স্বার্থের ভারসাম্য এবং পারস্পরিক আস্থার একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে। ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এটিই তার প্রথম সাক্ষাৎ। ফলে বৈঠকটি নিছক সৌজন্য সাক্ষাতের চেয়েও বেশি তাৎপর্য বহন করতে পারে। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সেখানে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বৈঠকের ক্ষেত্রে আলোচনার বিষয় আগে থেকে নির্ধারিত থাকলেও বৈঠকের রাজনৈতিক বার্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নতুন দায়িত্ব নেওয়া কোনো রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারের সঙ্গে সরকারপ্রধানের প্রথম সাক্ষাৎ সাধারণত ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপথ সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দেয়। বিশেষ করে প্রতিবেশী দুই দেশের ক্ষেত্রে এই ধরনের বৈঠক পারস্পরিক যোগাযোগের নতুন অধ্যায় তৈরি করতে পারে।
ভারতের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশের নতুন সরকারকে ঘিরে আগ্রহের কিছু ইঙ্গিত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের দিন ভারতের লোকসভার স্পিকার তারেক রহমানকে স্বপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠি হস্তান্তর করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানোর কথাও এসেছে।
এসব আমন্ত্রণ ও যোগাযোগকে বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনীতির অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ভারতও দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে আঞ্চলিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বিমসটেক, ব্রিকসসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে দুই দেশের যোগাযোগের গুরুত্বও বাড়ছে।
দীনেশ ত্রিবেদীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়ও তার কূটনৈতিক ভূমিকার ক্ষেত্রে আলোচনার বিষয়। গত ১২ জুন ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি ঢাকায় আসেন এবং সাবেক হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হন। একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ হিসেবে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয়। কূটনীতিতে পেশাদার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা অনেক সময় আলোচনাকে ভিন্ন মাত্রা দিতে পারে।
তার বক্তব্যের আরেকটি দিক বিশেষভাবে লক্ষণীয়—তিনি সমস্যার বদলে সমাধানের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ককে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেছেন এবং বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করা যায়। কূটনৈতিক ভাষায় এ ধরনের বক্তব্য সাধারণত আস্থার পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তবে কোন কোন ক্ষেত্রে অগ্রগতি আসে, সেটিই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। একইভাবে ভারতের জন্যও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও আঞ্চলিক গুরুত্ব রয়েছে। তাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া দুই দেশের জন্যই প্রয়োজন। কোনো একটি ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও বৃহত্তর সম্পর্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য নিয়মিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ অপরিহার্য।
দুই প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি বৈঠক হলে আলোচনায় কোন কোন বিষয় অগ্রাধিকার পাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয় বিষয়, মানুষের যাতায়াত, বাণিজ্য, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং চলমান বিভিন্ন ইস্যু আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব আলোচনা যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে এবং বাস্তব অগ্রগতির দিকে যায়।
শেষ পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক আস্থা এবং বাস্তবসম্মত সমঝোতার ওপর। দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য সেই আলোচনার জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তিনি মনে করেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। এখন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে কতটা রূপ দেওয়া যায়, সেটিই দেখার বিষয়। কারণ প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক যত বেশি স্থিতিশীল, কার্যকর ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক হবে, ততই তার সুফল পৌঁছাবে শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নয়, দুই দেশের সাধারণ মানুষের কাছেও।
আপনার মতামত জানানঃ