
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের নাম উচ্চারিত হলেই একসঙ্গে ভেসে ওঠে নিরাপত্তা, ভয়, বিতর্ক, ক্ষমতা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—সংক্ষেপে র্যাব—তেমনই একটি নাম। দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ দমন, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই বাহিনী। কিন্তু আজ যখন আবার র্যাবের ভবিষ্যৎ, কাঠামো এবং অস্তিত্ব নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—র্যাবকে আমরা কীভাবে স্মরণ করব? একটি সফল এলিট বাহিনী হিসেবে, নাকি এমন এক প্রতিষ্ঠানের প্রতীক হিসেবে, যার ইতিহাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ বারবার ফিরে এসেছে?
২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সন্ত্রাস ও সংগঠিত অপরাধ দমনের লক্ষ্য নিয়ে র্যাব গঠিত হয়। সে সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছিল। সরকার দাবি করেছিল, প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বিশেষ সক্ষমতাসম্পন্ন একটি এলিট ফোর্স প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয় র্যাব।
প্রতিষ্ঠার পরপরই বাহিনীটি আলোচিত হয়ে ওঠে। একের পর এক অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার বা নিহত হওয়ার খবর জনমনে স্বস্তি তৈরি করে। অনেকেই মনে করেছিলেন, রাষ্ট্র অবশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আরেকটি শব্দ র্যাবের নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জুড়ে যায়—‘ক্রসফায়ার’।
বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য ব্যক্তি র্যাবের অভিযানে নিহত হন। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় একই ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আসে—আসামিকে নিয়ে অভিযানে গেলে সঙ্গীদের হামলা, গোলাগুলি এবং পরে ‘ক্রসফায়ারে’ মৃত্যু। মানবাধিকার সংগঠনগুলো শুরু থেকেই এসব ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করে আসছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, বহু ক্ষেত্রে এসব ঘটনা প্রকৃতপক্ষে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, দেশীয় নাগরিক সংগঠন এবং আইনজীবীদের একটি বড় অংশ বারবার প্রশ্ন তুলেছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে আইনকে পাশ কাটিয়ে কোনো রাষ্ট্র কি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে?
র্যাবকে ঘিরে বিতর্কের মূল জায়গাটি এখানেই। একটি রাষ্ট্রে অপরাধী দমন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি আদালত, বিচারব্যবস্থা ও সাংবিধানিক অধিকারকে দুর্বল করে ফেলে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ বিচারবহির্ভূত কোনো পদ্ধতি একবার গ্রহণযোগ্য হয়ে গেলে তার লক্ষ্যবস্তু কেবল অপরাধী থাকে না; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, মতভিন্ন ব্যক্তি কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষও সেই ব্যবস্থার শিকার হতে পারেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। বিএনপি সরকারের আমলে যে বাহিনী তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার সেই বাহিনীকে শুধু বহালই রাখেনি, বরং আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। সমালোচকদের মতে, র্যাব ধীরে ধীরে কেবল অপরাধ দমনের বাহিনী নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি কার্যকর হাতিয়ারেও পরিণত হয়েছিল। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযানের অভিযোগে বাহিনীটি বারবার আলোচনায় এসেছে।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আসে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চরিত্র কেবল তার সদস্যদের দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং তাকে ব্যবহার করার রাজনৈতিক সংস্কৃতিও সেই চরিত্র গড়ে তোলে। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, যদি শক্তিশালী বাহিনীকে জবাবদিহির বাইরে রাখা হয়, তাহলে একই ধরনের অপব্যবহারের ঝুঁকি থেকে যায়। ফলে সমস্যাকে কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিচ্যুতি হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতাকে আড়াল করা হয়।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে বড় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগ ও ক্ষোভ নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে। সেই প্রেক্ষাপটে র্যাবের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তীব্র হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো আবারও বাহিনীটির বিলুপ্তি দাবি করে। এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও র্যাব বিলুপ্তির পক্ষে মত শোনা যায়। একপর্যায়ে বাহিনীর পক্ষ থেকেও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে দুঃখ প্রকাশের ঘটনা ঘটে, যা ছিল নজিরবিহীন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থান বদলাতে শুরু করে। এখন আলোচনা হচ্ছে নতুন আইন, নতুন কাঠামো কিংবা নতুন নামের। প্রশ্ন হলো, কেবল নাম পরিবর্তন করলেই কি একটি প্রতিষ্ঠানের অতীত বদলে যায়? একটি বাহিনীর পোশাক, লোগো বা সাংগঠনিক কাঠামো বদলানো সহজ; কিন্তু তার সংস্কৃতি, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার ব্যবহার পদ্ধতি বদলানো অনেক কঠিন।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা। র্যাবের জন্ম বিএনপি সরকারের আমলে। ফলে বাহিনীটির কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বিএনপির ভূমিকা অনিবার্যভাবেই সামনে আসে। একইভাবে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে র্যাব যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, সেই দায় থেকেও আওয়ামী লীগ মুক্ত নয়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অতীতের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সংস্কৃতির অভাব দীর্ঘদিনের। ক্ষমতায় থাকলে একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় বলা হয়, আর ক্ষমতার বাইরে গেলে একই প্রতিষ্ঠানকে দমন-পীড়নের হাতিয়ার বলা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের নাগরিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভিন্ন। তারা চায় এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা অপরাধ দমন করবে, কিন্তু একই সঙ্গে নাগরিক অধিকারও রক্ষা করবে। তারা এমন কোনো বাহিনী চায় না, যার নাম শুনলে নিরাপত্তার পাশাপাশি আতঙ্কও জন্ম নেয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এলিট ফোর্স রয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, জিম্মি উদ্ধার কিংবা বিশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এসব বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের কার্যক্রম কঠোর আইনি কাঠামো, সংসদীয় নজরদারি, স্বাধীন তদন্ত এবং বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় থাকে। ফলে তাদের দক্ষতা ও জবাবদিহি একসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জটি সেখানেই—রাষ্ট্র কি এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারবে, যা একই সঙ্গে কার্যকর এবং মানবিক?
র্যাবকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক তাই কেবল একটি বাহিনীকে নিয়ে নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, মানবাধিকারবোধ, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন। অতীতের ঘটনাগুলোকে দলীয় চশমা দিয়ে দেখলে হয়তো সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তাতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রশ্ন হলো, সেই শিক্ষা কি সত্যিই নেওয়া হবে? নাকি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কেবল হাত বদলাবে রাষ্ট্রীয় শক্তির নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু বদলাবে না তার চরিত্র? র্যাব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসলে এই প্রশ্নটিই রয়েছে।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রের ক্ষমতায় নয়, বরং আইনের প্রতি তার আনুগত্যে। কোনো বাহিনী যতই দক্ষ হোক, যদি তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নাগরিকের মনে ভয়, সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়, তাহলে সেই শক্তি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে। তাই র্যাবের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগে প্রয়োজন অতীতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, রাজনৈতিক দায় স্বীকার এবং এমন একটি কাঠামো নির্মাণ, যেখানে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জন্য সেটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় অর্জন।
আপনার মতামত জানানঃ