২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, সেটি শুধু একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্র, রাজনীতি, সেনাবাহিনী, বিদেশি শক্তি ও গণমাধ্যমের জটিল সমীকরণের এক অন্ধকার অধ্যায়। “ওয়ান-ইলেভেন” নামটি এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে একটি বিশেষ শব্দ—যার ভেতরে লুকিয়ে আছে ক্ষমতার পালাবদল, গোপন সমঝোতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের গল্প। প্রায় দুই দশক পর এসেও এই অধ্যায় নিয়ে কৌতূহল, বিতর্ক ও প্রশ্নের শেষ হয়নি।
২০০৪ সালের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে উঠতে থাকে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপনের একটি প্রবণতা দৃশ্যমান হয়। একযোগে ৬৩ জেলায় বোমা হামলা, জেএমবির উত্থান, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার মতো ঘটনাগুলো শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, বিদেশেও ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে। পশ্চিমা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। প্রতিবেশী দেশ ভারতও পরিস্থিতিকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। এই সময় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, তার কেন্দ্রে ছিল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা সংকট।
এরই মধ্যে ২০০৬ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট তৎকালীন নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র আন্দোলনে নামে। রাজপথ সহিংস হয়ে ওঠে। লগি-বৈঠার ঘটনাসহ বিভিন্ন সহিংসতা রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিরোধ, বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানো এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদের একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার সিদ্ধান্ত বিরোধী দল ও বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সেই সময় থেকেই “মাইনাস টু” ফর্মুলা আলোচনায় আসে—যেখানে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রীকে রাজনীতির বাইরে রাখার পরিকল্পনার কথা শোনা যায়।
অনুসন্ধান ও বিভিন্ন বক্তব্য থেকে উঠে এসেছে, ঢাকায় নিযুক্ত কয়েকজন পশ্চিমা কূটনীতিক তৎকালীন রাজনৈতিক সমীকরণে সক্রিয় আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া বিউটেনিস, বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের নাম বারবার আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা রাজনৈতিক সমাধানের নামে এমন এক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত সামরিক সমর্থিত সরকারের পথ সুগম করে। যদিও এসব অভিযোগের অনেকটাই রাজনৈতিক বক্তব্য ও ব্যক্তিগত বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল, তবু ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে আলোচনায় বিদেশি প্রভাবের বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে।
এই অস্থিরতার সুযোগ নেয় সেনাবাহিনীর একটি অংশ। সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে কয়েকজন প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে আসেন। জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিন, ব্রিগেডিয়ার বারীসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম সেই সময়ের “কুশীলব” হিসেবে বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করা হয়। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কার্যত চলে যায় সেনা-সমর্থিত প্রশাসনের হাতে।
ওয়ান-ইলেভেনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল দুই প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী—শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তার। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে একের পর এক রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। “ট্রুথ কমিশন” গঠন করে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন এবং মিডিয়ার একটি অংশের প্রকাশ্য সমর্থন তখন নতুন বাস্তবতা তৈরি করে। অনেকে মনে করেন, সেই সময় গণমাধ্যমের একটি অংশ “শুদ্ধি অভিযান”কে সমর্থন জানিয়ে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পরিবেশকে বৈধতা দিয়েছিল।
তৎকালীন সেনা নেতৃত্বের মধ্যেও মতবিরোধ ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। জেনারেল মইন ইউ আহমেদ নাকি নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন—এমন দাবিও এসেছে কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্যে। বলা হয়, তিনি সরাসরি ক্ষমতা নিয়ে ফৌজি শাসনের ঘোষণা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা এতে একমত ছিলেন না বলেও আলোচনা রয়েছে। ফলে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামোই বহাল থাকে।
এই সময় জাতিসংঘের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের একটি বক্তব্য সেনাবাহিনীর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছিল বলে জানা যায়। বলা হয়েছিল, সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে সেনাবাহিনী সহায়তা করলে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য শান্তিরক্ষা মিশন শুধু আন্তর্জাতিক মর্যাদার বিষয় নয়, অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই বার্তা সেনা নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল বলে অনেকে মনে করেন। তবে এই বক্তব্য জাতিসংঘ সদর দপ্তরের আনুষ্ঠানিক অবস্থান ছিল কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
ওয়ান-ইলেভেনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল “নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র” প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেটি কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ছিল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনের একটি অংশ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনার জন্য কাজ করেছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের বিপুল বিজয় এবং বিএনপির ভরাডুবি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। যদিও নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়, তবু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তার বক্তব্যে নির্বাচনী প্রকৌশলের অভিযোগ সামনে আসে।
ওয়ান-ইলেভেন বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে বদলে দেয়। এই ঘটনার পর রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বলতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং বিদেশি প্রভাবের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সংঘাত এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছিল, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অগণতান্ত্রিক শক্তি সুযোগ পেয়ে যায়।
এ ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। যখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে অন্য শক্তি সামনে আসে। ওয়ান-ইলেভেন সেই বাস্তবতারই একটি নির্মম উদাহরণ।
আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় ওয়ান-ইলেভেন ফিরে আসে সতর্কবার্তা হিসেবে। কেউ এটিকে “শুদ্ধি অভিযান” বলে আখ্যা দেন, কেউ বলেন এটি ছিল পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রকল্প। কারও কাছে এটি ছিল দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, আবার কারও কাছে গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার এক সুপরিকল্পিত প্রয়াস। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে দ্বিমত কম—এই অধ্যায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
সময় পেরিয়ে গেলেও ওয়ান-ইলেভেনের প্রকৃত নেপথ্য কাহিনি এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। সেনা কর্মকর্তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক নেতাদের দাবি, বিদেশি কূটনীতিকদের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব—সব মিলিয়ে এটি আজও রহস্যে ঘেরা। তবে ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষমতার অদৃশ্য খেলোয়াড়রা সামনে চলে আসে। ওয়ান-ইলেভেন ছিল সেই অদৃশ্য শক্তিগুলোর দৃশ্যমান হয়ে ওঠার এক বাস্তব উদাহরণ।
আপনার মতামত জানানঃ