বাংলাদেশের অর্থনীতি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকার আগামী পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে চাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে বাজেট সহায়তা হিসেবে দ্রুত আরও কয়েক বিলিয়ন ডলার পাওয়ার উদ্যোগ চলছে। এই পরিকল্পনাকে কেউ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন—এটি বাংলাদেশের ঋণনির্ভর অর্থনীতির আরও গভীর সংকেত।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে গেলে গত কয়েক বছরের পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হয়। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। একদিকে ডলারের সংকট, অন্যদিকে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহে ওঠানামা—সব মিলিয়ে অর্থনীতি একটি কঠিন সময় পার করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া সরকারকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দিকে আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলেছে।
এমন বাস্তবতায় আইএমএফ ও এডিবির মতো বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণকে সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার অন্যতম উপায় হিসেবে দেখছে। কারণ এই ধরনের ঋণ তুলনামূলক দীর্ঘমেয়াদি এবং সুদের হারও বাণিজ্যিক ঋণের তুলনায় কম। তাছাড়া আইএমএফের সঙ্গে একটি কার্যকর কর্মসূচি থাকলে বিশ্বব্যাংক, জাইকা, এআইআইবি কিংবা অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকেও সহজে সহায়তা পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও এটি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়।
সম্প্রতি এডিবি প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা বাংলাদেশ সফরে এসে আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। এই অর্থ মূলত সমন্বিত প্রবৃদ্ধিভিত্তিক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ব্যয় করা হবে। সরকার আশা করছে, এই অর্থ দিয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। প্রতিবছর গড়ে এক বিলিয়ন ডলার করে অর্থায়নের পরিকল্পনা বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে নতুন গতি আনতে পারে।
একই সময়ে আইএমএফের সঙ্গে নতুন তিন বছর মেয়াদি সংস্কারভিত্তিক ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে। সরকার চাইছে পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলারের নতুন সহায়তা। তবে এই ঋণ কেবল অর্থ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানা ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কারের শর্ত। আইএমএফ সাধারণত করব্যবস্থা সংস্কার, ভর্তুকি হ্রাস, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, ব্যাংক খাতের জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোতে জোর দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
গত কয়েক বছরে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সংস্কার বাস্তবায়ন। অভিন্ন ভ্যাট হার চালু, কর অব্যাহতি কমানো, ডলারের বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নির্ধারণ, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি হ্রাস এবং ব্যাংক খাত সংস্কারের মতো বিষয়ে সরকার ও আইএমএফের মধ্যে বারবার মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। বাস্তবতা হলো, এসব সংস্কারের অনেকগুলোর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও বড়। হঠাৎ ভর্তুকি কমানো বা কর বৃদ্ধি করলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে সরকারকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।
নতুন কর্মসূচি নিয়ে সরকারের বক্তব্য হলো, তারা সংস্কার থেকে সরে আসতে চায় না; বরং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে এগোতে চায়। এই অবস্থান অনেকাংশে বাস্তবসম্মত। কারণ অর্থনীতির সংস্কার শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব জীবনে মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে তার অভিঘাত দ্রুত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে পড়ে। ফলে অর্থনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
তবে প্রশ্ন হলো—ঋণ নিয়ে কি সত্যিই অর্থনীতি পুনর্গঠন সম্ভব? উত্তরটি সহজ নয়। ঋণ নিজে কোনো সমস্যা নয়, যদি সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হয় এবং ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে তা পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করে। উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায়ই বড় অবকাঠামো নির্মাণ, জ্বালানি খাত উন্নয়ন কিংবা শিল্পায়নের জন্য বৈদেশিক ঋণ নেয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ঋণের অর্থ অপচয় হয়, দুর্নীতি বাড়ে বা প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক বড় প্রকল্প সময়মতো শেষ হয়নি, ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে নতুন ঋণ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা না গেলে ভবিষ্যতে ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যখন বৈদেশিক ঋণ ডলারে পরিশোধ করতে হয়, তখন ডলারের বিনিময় হার বেড়ে গেলে সেই চাপ আরও তীব্র হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। অথচ উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও সরকারি সেবার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। সরকার যদি অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়াতে না পারে, তাহলে ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। আইএমএফও দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থা। খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মধ্যে রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংক খাতে কঠোর সংস্কার প্রয়োজন। শুধু নতুন ঋণ নিয়ে সাময়িক সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা ছাড়া স্থায়ী সমাধান আসবে না।
এদিকে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে। একই সঙ্গে এলএনজি, সার এবং শিপিং খরচ বৃদ্ধির প্রভাব পড়ে শিল্প ও কৃষিতে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সহায়তা সরকারের জন্য একধরনের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে পারে।
তবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে প্রশ্নটি আরও সরল—এই ঋণের প্রভাব তাদের জীবনে কী হবে? যদি ঋণের অর্থ দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ে, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয় এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকে, তাহলে মানুষ এর সুফল পাবে। কিন্তু যদি এর ফল হয় কর বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, তাহলে জনগণের চাপও বাড়বে। তাই অর্থনৈতিক নীতির সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবন কতটা সহজ বা কঠিন হচ্ছে তার ওপর।
বাংলাদেশ এখন এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিও নিচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণের পর অনেক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা কমে যেতে পারে। ফলে রপ্তানি খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। আন্তর্জাতিক ঋণ যদি এই রূপান্তরের পথে সহায়ক হয়, তাহলে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থা তৈরি করা। শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার আস্থা নয়, দেশের মানুষ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাও জরুরি। অর্থনৈতিক নীতিতে ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে ঋণ কার্যকর উন্নয়নের হাতিয়ার হতে পারে। অন্যথায় এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি অতীতেও নানা সংকট মোকাবিলা করেছে। তৈরি পোশাক খাতের উত্থান, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ এবং কৃষি উৎপাদনের সাফল্য দেশের অর্থনীতিকে বারবার এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এখনকার চ্যালেঞ্জ ভিন্ন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু ঋণ নয়, প্রয়োজন কার্যকর নীতি, সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
সরকারের ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিকল্পনা তাই শুধু অর্থ সংগ্রহের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনারও একটি বড় ইঙ্গিত। এই অর্থ দেশকে নতুন গতি দেবে, নাকি আরও বড় দায় তৈরি করবে—তার উত্তর নির্ভর করবে ঋণের পরিমাণের ওপর নয়, বরং সেই অর্থ কতটা দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে ব্যবহৃত হয় তার ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ