বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশি ঋণ দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান অর্থায়নের উৎস। অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খাতের উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ—এসব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি ঋণের আরেকটি দিক ক্রমশ সামনে চলে এসেছে, আর সেটি হলো ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপ। একসময় যে ঋণ উন্নয়নের সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, এখন সেই ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশকে বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে ৪১৩ কোটি ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড। শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, অর্থনীতির ওপর এর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা, আমদানি ব্যয় মেটানো, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে দেশ।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বিদেশি ঋণ নিজে কোনো সমস্যা নয়। বরং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হলে ঋণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকে এবং তার বিপরীতে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায় না। তখন ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের দায় রাষ্ট্রের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতিও অনেকটা সেই বাস্তবতার প্রতিফলন।
গত এক দশকে বাংলাদেশে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক, সেতু, রেলপথ, বন্দর এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলো এখনও চলমান, আবার কিছু প্রকল্প ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ঋণ নেওয়ার কয়েক বছর পর থেকেই কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় এখন সেই দায় দ্রুত বাড়ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করছে, তা কয়েক বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩৭ কোটি ডলার। পরবর্তী অর্থবছরে তা বেড়ে ৪০৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই সেই রেকর্ড অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী এবং আগামী বছরগুলোতে এই চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এই চাপে ভূমিকা রাখছে। করোনা মহামারির পর বিশ্ব অর্থনীতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি। এর মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক সুদের হার বৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ফলে বিদেশি ঋণ ব্যবস্থাপনা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে ঋণের অর্থছাড় এবং ঋণ পরিশোধ প্রায় সমান গতিতে চলতে থাকায় নেট সুবিধা কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ যে পরিমাণ নতুন ঋণ আসছে, তার বড় একটি অংশ আবার পুরোনো ঋণ শোধ করতেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এতে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য কার্যকরভাবে যে অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকার কথা, তা সীমিত হয়ে পড়ছে। অর্থনীতির ভাষায় একে অনেক সময় ‘ডেট সার্ভিস প্রেসার’ বা ঋণসেবা চাপ বলা হয়।
বর্তমানে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপান, রাশিয়া, চীন এবং ভারত বাংলাদেশের প্রধান উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে অন্যতম। এসব উৎস থেকে বাংলাদেশ নিয়মিত ঋণ পেয়ে থাকে। চলতি অর্থবছরেও সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। এরপর রয়েছে রাশিয়া ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। তবে ঋণ পাওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বিদেশি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে এখন আরও সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব প্রকল্প সরাসরি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না অথবা দ্রুত আর্থিক রিটার্ন দেয় না, সেসব প্রকল্পে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি লাভ-ক্ষতির বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিদেশি ঋণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। যেহেতু অধিকাংশ ঋণ ডলার বা অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়, তাই রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ডলারের প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ঋণ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এখনও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপর আস্থা রাখছে। উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন অব্যাহত রয়েছে এবং বিভিন্ন খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও সংকটময় নয়। সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন প্রয়োজন ঋণনির্ভর উন্নয়ন থেকে ধীরে ধীরে আয়নির্ভর উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হওয়া। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক সূচকে উন্নতির পেছনে বিদেশি ঋণেরও অবদান রয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের এই যাত্রা টেকসই করতে হলে ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক ও দূরদর্শী হতে হবে। কারণ ঋণ নেওয়া সহজ হলেও তা পরিশোধের দায় দীর্ঘমেয়াদি এবং এর প্রভাব পুরো অর্থনীতির ওপর পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিদেশি ঋণ অর্থনীতির জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, তবে সেই সুযোগকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে না পারলে তা বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ঋণ গ্রহণ, ঋণের ব্যবহার এবং ঋণ পরিশোধ—এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
আপনার মতামত জানানঃ