
ইরানে যুদ্ধ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে, কিন্তু তার অর্থনৈতিক মূল্য বাংলাদেশকেও দিতে হতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে থাকার পরও বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা, প্রবাসী আয়, শিল্পোৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজার মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে এত নিবিড়ভাবে যুক্ত যে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিতে একসঙ্গে একাধিক ধাক্কা দিতে পারে। দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক মডেলিং নেটওয়ার্ক—SANEM-এর একটি নীতি-সমীক্ষায় বলা হয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আগামী দুই বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত পতনের পূর্বাভাস নয়; জ্বালানির দাম, রেমিট্যান্স, রপ্তানি ও বিনিয়োগ—একাধিক প্রতিকূলতা একসঙ্গে দেখা দিলে কী ঘটতে পারে, তার একটি ঝুঁকিভিত্তিক হিসাব। The Daily Star
বাংলাদেশের জন্য প্রথম এবং সবচেয়ে দ্রুত আঘাতটি আসবে জ্বালানি বাজার থেকে। দেশের পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানি করা পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার জন্য আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির গুরুত্বও বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে কিংবা হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে শুধু তেল ও গ্যাসের দামই বাড়ে না—জাহাজভাড়া, যুদ্ধঝুঁকি বিমা এবং সরবরাহের সময়ও বেড়ে যায়।
বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্য ও সরবরাহের ঝুঁকি ইতিমধ্যে বেড়েছে। বাংলাদেশের মতো এলএনজি-নির্ভর দেশের ক্ষেত্রে এর চাপ পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর। সংঘাত দীর্ঘ হলে জ্বালানির পাশাপাশি সার সরবরাহও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সবচেয়ে বেশি ভুগবে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা প্রকল্পে অতিরিক্ত ৩৫ কোটি ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। World Bank
জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব পেট্রলপাম্প বা বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ডিজেল ব্যয় বাড়লে কৃষকের সেচ, ট্রাক ও নৌপথে পণ্য পরিবহন এবং শহরের গণপরিবহন—সবকিছুর খরচ বাড়ে। এলএনজির দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে; সরকার দাম সমন্বয় না করলে ভর্তুকি বাড়ে, আর সমন্বয় করলে শিল্প ও সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপ পড়ে। তৈরি পোশাক, সিরামিক, ইস্পাত, সার ও ক্ষুদ্র উৎপাদন খাতে গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে উৎপাদিত পণ্যের দামও বাড়ে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের একটি সামরিক সংঘাত শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বাজারে চাল, সবজি, বাসভাড়া ও কারখানার উৎপাদন খরচে দৃশ্যমান হতে পারে।
এর দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়ছে। IMF-এর জানুয়ারি ২০২৬-এর হিসাবে চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে। এই পূর্বাভাসে নতুন কোনো বড় সরবরাহ-সংকট না হওয়ার ধারণা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি, সার, খাদ্য এবং পরিবহন ব্যয় আবার বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। IMF
এখানে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে একটি কঠিন দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সুদহার উঁচু রাখা হলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি রক্ষার চেষ্টা করলে টাকার অবমূল্যায়ন ও পণ্যমূল্য আরও বাড়তে পারে। একইভাবে জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়ালে সাধারণ মানুষ সাময়িক স্বস্তি পাবে, কিন্তু বাজেট ঘাটতি ও সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন বাড়বে। যুদ্ধ তাই শুধু আমদানি ব্যয় বাড়ায় না; অর্থনীতি পরিচালনার জন্য সরকারের হাতে থাকা নীতিগত বিকল্পও সীমিত করে দেয়।
তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে সংবেদনশীল ঝুঁকিটি রেমিট্যান্সে। বাংলাদেশের লাখ লাখ শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে কর্মরত। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে মোট রেমিট্যান্সের ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ এসেছে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। এর মধ্যে সৌদি আরব একাই ছিল অন্যতম বৃহৎ উৎস। Bangladesh Bank
সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গাগুলোর একটি। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩০ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। এই অর্থ পরিবারগুলোর ভোগব্যয় চালানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি পরিশোধ এবং টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। Bangladesh Bank
তবে যুদ্ধ শুরু হলেই রেমিট্যান্স তাৎক্ষণিকভাবে কমবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। অনিশ্চয়তার প্রথম পর্যায়ে প্রবাসীরা পরিবারের কাছে বেশি অর্থ পাঠাতে পারেন, ফলে সাময়িকভাবে রেমিট্যান্স বাড়তেও পারে। প্রকৃত ঝুঁকি তৈরি হবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে। তেলের রপ্তানি, নির্মাণ, পর্যটন, বিমান পরিবহন ও অন্যান্য ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মঘণ্টা কমা, বেতন আটকে যাওয়া, নতুন নিয়োগ স্থগিত হওয়া কিংবা শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটতে পারে। আকাশসীমা ও বিমান চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে কর্মী পাঠানো এবং দেশে ফেরার খরচও বাড়বে। সেই ধাক্কা কিছুটা সময় নিয়ে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে দেখা দিতে পারে।
চতুর্থ ঝুঁকি রপ্তানি ও বৈশ্বিক চাহিদায়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়লে এসব দেশের ভোক্তার প্রকৃত আয় কমে এবং তারা পোশাকের মতো তুলনামূলকভাবে অপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় কমায়। ইতিমধ্যে বৈশ্বিক কারখানাগুলো উচ্চ ব্যয় ও দুর্বল নতুন ক্রয়াদেশের মুখে পড়েছে বলে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকে দেখা যাচ্ছে। Reuters
ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা একই সময়ে দুই দিক থেকে চাপে পড়তে পারেন—দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কাঁচামালের ব্যয় বাড়বে, বিদেশে ক্রেতারা দাম কমাতে বা ক্রয়াদেশ সীমিত করতে চাইবেন। জাহাজকে ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে দীর্ঘপথে যেতে হলে পরিবহন ব্যয় ও পণ্য পৌঁছানোর সময়ও বাড়বে। এতে সময়নির্ভর পোশাক রপ্তানি প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই সমস্ত চাপ একত্রিত হলেই জিডিপিতে বড় ক্ষতির আশঙ্কাটি বাস্তব হয়। আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ে; রেমিট্যান্স বা রপ্তানি কমলে ডলারের সরবরাহ দুর্বল হয়; টাকা অবমূল্যায়িত হলে আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়; মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে; আর উচ্চ সুদ ও জ্বালানি-সংকটে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। এটি একটি নেতিবাচক চক্র। SANEM-এর সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ জিডিপি ক্ষতির দৃশ্যপট মূলত এমন একাধিক ধাক্কা একসঙ্গে ঘটার আশঙ্কাকেই তুলে ধরে।
তবে পরিস্থিতি একমাত্রিক নয়। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল ফিরলে এবং জ্বালানির দাম দ্রুত কমে এলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার অবকাঠামো ব্যয় ও শ্রমবাজার সচল রাখতে পারলে রেমিট্যান্সও স্থিতিশীল থাকতে পারে। তাই ৩ শতাংশকে অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখা যেমন ভুল, তেমনি ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বাংলাদেশ নিরাপদ থাকবে ধরে নেওয়াও বিপজ্জনক।
বাংলাদেশের করণীয় হলো সংকটকে শুধু জ্বালানি সংগ্রহের সমস্যা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে মোকাবিলা করা। তেল ও এলএনজির উৎস বহুমুখী করা, দীর্ঘমেয়াদি ও স্পট চুক্তির মধ্যে ভারসাম্য রাখা, প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও সারের কৌশলগত মজুত নিশ্চিত করা এবং সরকারি সংস্থার ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারকে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা এবং গণপরিবহন ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সীমিত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। সবার জন্য নির্বিচার ভর্তুকি দিলে তার বড় অংশ উচ্চ আয়ের ভোক্তারাও পায় এবং বাজেটের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হয়।
প্রবাসী কর্মীদের জন্য উপসাগরীয় দেশভিত্তিক জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা, বকেয়া বেতন আদায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান এখন থেকেই প্রয়োজন। রপ্তানির ক্ষেত্রেও তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষিপণ্য, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের উৎপাদন বাড়ানোর পুরোনো প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তব নীতিতে রূপ দিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে বাজারে কৃত্রিম বিনিময় হার ধরে রাখার কাজে অতিরিক্ত ব্যয় না করে খাদ্য, জ্বালানি, সার ও শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জন্য সংরক্ষণ করাই বেশি যুক্তিসংগত।
ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের সৃষ্টি করা সংকট নয়, কিন্তু এর ক্ষতি কতটা গভীর হবে তা অনেকাংশে নির্ভর করবে বাংলাদেশের প্রস্তুতির ওপর। এই যুদ্ধ আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে, দূরের ভূরাজনৈতিক সংঘাতও আমদানিনির্ভর ও সীমিত অর্থনৈতিক সুরক্ষাবিশিষ্ট একটি দেশের রান্নাঘর, কারখানা এবং কর্মসংস্থানে পৌঁছে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশকে মূল্য দিতে হবে কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো—মূল্যটি কতটা কমিয়ে আনার মতো প্রস্তুতি রাষ্ট্রের আছে।
আপনার মতামত জানানঃ