বিপুল জনসমর্থন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি এবং মানুষের উচ্চ প্রত্যাশা—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি ছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সাধারণ মানুষ আশা করেছিল, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির মধ্য দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া রাষ্ট্রযন্ত্রে নতুন সরকার দ্রুত কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারবে। সরকার গঠনের পর এখন প্রায় ১০০ দিনের পথ অতিক্রম করতে যাচ্ছে বিএনপি। এই স্বল্প সময়ে সরকার কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় তাদের সামনে উঠে এসেছে একাধিক জটিল সংকট। ফলে সরকারের প্রথম ১০০ দিন নিয়ে জনমনে যেমন আশার আলো আছে, তেমনি রয়েছে হতাশা, প্রশ্ন এবং উদ্বেগও।
ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা এবং বিভিন্ন খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণের মতো উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলে। নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব কর্মসূচিকে সরকার বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য ভাতা চালু করা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের অংশ হিসেবে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করার সিদ্ধান্তও আলোচনায় আসে। সরকার চেয়েছে এসব উদ্যোগের মাধ্যমে জনবান্ধব ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে।
প্রথম থেকেই সরকার ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংযম দেখানোর বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বিএনপির সংসদ সদস্যদের করমুক্ত গাড়ি সুবিধা ত্যাগের সিদ্ধান্তকে অনেকেই প্রতীকী কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন। সাধারণ মানুষের কষ্টের সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই ধরনের পদক্ষেপ কিছুটা হলেও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মসূচি চালুর ঘোষণাও সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।
তবে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। ক্ষমতায় আসার সময় থেকেই সরকার পেয়েছে উচ্চ ঋণের বোঝা, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিনিয়োগ সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির মতো জটিল বাস্তবতা। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়—নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে এই তিন ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব বেশি চোখে পড়েনি।
মূল্যস্ফীতি গত এক বছরে ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। মার্চে কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিললেও এপ্রিলেই তা আবার ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। অনেক পরিবার এখন দৈনন্দিন খরচ কমিয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে। নতুন সরকারকে ঘিরে মানুষের যে বড় প্রত্যাশা ছিল, তার অন্যতম ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বাস্তবতা এখনো সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও সরকারের জন্য নতুন চাপ তৈরি করে। সরকার গঠনের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার অফিস, ব্যাংক, শপিং মল ও বাজারের সময়সূচি সীমিত করে জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ নেয়। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ থেকে এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেশের অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের অভিযোগ রয়েছে। লোডশেডিং কমলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরেনি।
অর্থনীতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নাজুক ছিল। বিভিন্ন এলাকায় মব অ্যাটাক, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ও সহিংসতার ঘটনা বেড়ে যায়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মানুষ আশা করেছিল পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। কিন্তু তিন মাস পরও অপরাধের ঘটনা কমেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশজুড়ে খুন, ছিনতাই, অপহরণ ও গণপিটুনির ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন অপরাধবিরোধী অভিযান চালালেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এখনো দৃশ্যমান সফলতা দেখাতে পারেনি। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনগণ প্রথমেই নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা চায়। কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ কিংবা সামাজিক স্বাভাবিকতা—সবকিছুই নির্ভর করে নিরাপদ পরিবেশের ওপর। তাই সরকারের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সমন্বয়ের অভাব। তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী হয়তো ইতিবাচক পরিবর্তন চান, কিন্তু মন্ত্রীদের মধ্যে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার্যকর সমন্বয় দেখা যাচ্ছে না। অনেক সময় মন্ত্রীরা নিজেদের দায়িত্বের বাইরেও মন্তব্য করছেন, যা বিভ্রান্তি তৈরি করছে। সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও একধরনের ধীরগতি ও অসামঞ্জস্য চোখে পড়ছে। তার মতে, সরকারের নীতিগত অবস্থান ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ফারাক তৈরি হলে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্বাস্থ্য খাতেও সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। দেশজুড়ে হাম বা হাম-সদৃশ উপসর্গে শত শত শিশুর মৃত্যুর খবর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, টিকা সংকট ও সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব নিয়ে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু সেই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহ, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং স্বাস্থ্য খাতে প্রশাসনিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবু পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, সরকার কিছু জনবান্ধব উদ্যোগ নিলেও কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। প্রশাসনিক দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংকট এবং দীর্ঘদিনের অদক্ষতা এখনো রয়ে গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণ পরিহার করা জরুরি। কারণ যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ না দিলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতাও কমে যাবে।
অন্যদিকে সরকারের শীর্ষ নেতারা দাবি করছেন, বর্তমান সংকটের বড় অংশই তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, ঋণের চাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ফল এখন সামনে আসছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে এবং এর ফলাফল জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। তিনি সমন্বয়হীনতার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ও হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হচ্ছে, মাত্র তিন মাসে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসন ও নাজুক নিরাপত্তা পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগবে। বাস্তবতা হলো, জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। কারণ বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা যে কোনো সরকারের প্রতি মানুষের স্বাভাবিকভাবেই আশা থাকে দ্রুত পরিবর্তন দেখার।
এই মুহূর্তে বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তারা কি তাদের বিপুল জনসমর্থনকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতায় রূপ দিতে পারবে? প্রথম ১০০ দিন সাধারণত কোনো সরকারের জন্য দিকনির্দেশনা তৈরির সময়। এই সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিএনপি সরকার কিছু ইতিবাচক বার্তা দিতে সক্ষম হলেও অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও জনসেবার মতো মৌলিক খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি।
আগামী মাসগুলো তাই সরকারের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জনগণ এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে ফলাফল দেখতে চায়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সংস্কার, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান তৈরির মতো ক্ষেত্রগুলোতে দ্রুত ও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে জনমনে হতাশা বাড়তে পারে। আবার এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারলে সরকার দীর্ঘমেয়াদে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের ধৈর্য অনেক সময় সীমিত থাকে। তাই বিএনপি সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো—প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান কমিয়ে আনা। কারণ শেষ পর্যন্ত জনগণ কথার চেয়ে কাজেই বেশি বিশ্বাস করে।
আপনার মতামত জানানঃ