
বাংলাদেশে পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনগুলোতে একটি পরিচিত চিত্র দেখা যায়। পাসের হার, জিপিএ–৫ কিংবা মেধাতালিকার আলোচনায় মেয়েরা প্রায়ই ছেলেদের সমান অথবা এগিয়ে থাকে। বিদ্যালয়ে ভর্তি ও টিকে থাকার ক্ষেত্রেও কয়েক দশকে মেয়েদের অগ্রগতি দেশের অন্যতম বড় সামাজিক অর্জন।
কিন্তু পরীক্ষার কক্ষ পেরিয়ে কর্মজীবনের দরজায় পৌঁছালে ছবিটি আমূল বদলে যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, ২০২৪ সালে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৩৮ দশমিক ৪০ শতাংশ; পুরুষের ক্ষেত্রে তা ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। কর্মরত নারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ২৯ লাখ, বিপরীতে কর্মরত পুরুষ প্রায় ৪ কোটি ৬২ লাখ। অর্থাৎ কর্মসংস্থানে ব্যবধান দুই কোটিরও বেশি। আরও উদ্বেগের বিষয়, ২০২২ সালের পর নারীর কর্মসংস্থান কমেছে। শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন
বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক হিসাবেও একই বৈষম্য স্পষ্ট। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের কর্মক্ষম নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ আনুমানিক ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষের হার ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক জেন্ডার ডেটা পোর্টাল
প্রশ্নটি তাই শুধু নারীরা কত দূর পড়াশোনা করছেন, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো—তাঁদের শিক্ষা কেন অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, আয়, পেশাগত পরিচয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় একই মাত্রায় রূপান্তরিত হচ্ছে না?
শিক্ষায় যে পরিবর্তন ঘটেছে
বাংলাদেশে মেয়েদের বিদ্যালয়মুখী করার পেছনে উপবৃত্তি, বিনা মূল্যের পাঠ্যপুস্তক, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিস্তার, সামাজিক সচেতনতা এবং পরিবারগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন বড় ভূমিকা রেখেছে। মেয়ের শিক্ষাকে একসময় অনেক পরিবার অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হিসেবে দেখলেও এখন মাধ্যমিক কিংবা উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পড়ানোর আকাঙ্ক্ষা ব্যাপক হয়েছে।
ইউনেসকোর ২০২৬ সালের বাংলাদেশবিষয়ক শিক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ১৯৯০ সালের ৩৪ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৯০ শতাংশে উঠেছে। নিম্নমাধ্যমিক সমাপ্তির হার একই সময়ে ২৩ শতাংশ থেকে ৭৪ শতাংশ হয়েছে। ইউনেসকো গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট
সাম্প্রতিক পরীক্ষাগুলোতেও মেয়েদের ভালো করার উদাহরণ রয়েছে। ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় মেয়েদের পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৪৭ শতাংশ, ছেলেদের ৬৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। পরীক্ষা ও কর্মসংস্থানের তুলনামূলক তথ্য
এই অর্জনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। একটি মেয়ের বিদ্যালয়ে যাওয়া শুধু তার ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়; এর সঙ্গে বাল্যবিবাহ বিলম্বিত হওয়া, স্বাস্থ্যসচেতনতা, সন্তানের শিক্ষা এবং পরিবারের সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের সম্পর্ক রয়েছে।
তবে পরীক্ষায় ভালো ফল এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এক বিষয় নয়। শিক্ষা যদি চাকরির দরজায় গিয়ে থেমে যায়, তাহলে রাষ্ট্র ও পরিবার যে বিনিয়োগ করছে, তার বড় অংশ অর্থনীতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে না।
সনদ আছে, উপযুক্ত কাজ নেই
বাংলাদেশের কর্মবাজারে সাধারণভাবেই মানসম্মত চাকরির সংকট রয়েছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী স্নাতক হলেও সেই অনুপাতে আনুষ্ঠানিক, নিরাপদ ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। এই সংকট নারী-পুরুষ উভয়কে প্রভাবিত করে, কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে তার সঙ্গে যুক্ত হয় অতিরিক্ত সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা।
অনেক শিক্ষিত নারী সরকারি চাকরিকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পেশা হিসেবে দেখেন। কারণ সেখানে তুলনামূলক চাকরির নিরাপত্তা, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। কিন্তু সরকারি চাকরির সংখ্যা সীমিত। বেসরকারি খাতে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম বেতন, অনিশ্চিত নিয়োগ এবং পরিবার থেকে দূরে থাকার প্রয়োজন অনেক নারীকে আবেদন কিংবা চাকরি গ্রহণ থেকে বিরত রাখে।
শিক্ষার বিষয় নির্বাচনেও লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন আছে। মেয়েরা মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান ও সাধারণ শিক্ষায় বেশি কেন্দ্রীভূত হলেও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও উচ্চ আয়ের নতুন খাতে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। ইউনেসকোর পর্যবেক্ষণ হলো, নারীরা কোন বিষয়ে ডিগ্রি নিচ্ছেন, তার সঙ্গে ভবিষ্যতে উচ্চ আয়ের পেশায় প্রবেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চশিক্ষায় নারীর অগ্রগতি সম্পর্কিত ইউনেসকোর বিশ্লেষণ
তবে সমস্যাটিকে কেবল মেয়েদের বিষয় নির্বাচনের ব্যর্থতা বললে ভুল হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও কর্মবাজার মিলেই তাঁদের সামনে ‘গ্রহণযোগ্য’ পেশার একটি সংকীর্ণ তালিকা তৈরি করে দেয়। যে মেয়েকে ছোটবেলা থেকে ঝুঁকি না নিতে, দূরে না যেতে এবং পুরুষ-প্রধান পরিবেশ এড়িয়ে চলতে শেখানো হয়, তার কাছ থেকে হঠাৎ প্রযুক্তি, প্রকৌশল কিংবা মাঠপর্যায়ের চাকরিতে প্রবেশের প্রত্যাশা স্ববিরোধী।
চাকরি করার অনুমতি আছে, শর্তসাপেক্ষে
বাংলাদেশের বহু পরিবার এখন মেয়েদের চাকরির বিরোধিতা করে না। কিন্তু সেই সম্মতির সঙ্গে প্রায়ই অদৃশ্য কিছু শর্ত যুক্ত থাকে—কর্মস্থল বাড়ির কাছে হতে হবে, সন্ধ্যার আগে ফিরতে হবে, পরিবেশ ‘ভালো’ হতে হবে, পুরুষ সহকর্মীর সংখ্যা বেশি হওয়া চলবে না, বদলি কিংবা ভ্রমণ করা যাবে না এবং সংসারের কাজে কোনো ঘাটতি তৈরি হওয়া যাবে না।
ছেলের চাকরির প্রয়োজনে অন্য শহরে যাওয়া পেশাগত অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়। একই সিদ্ধান্ত মেয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, পারিবারিক সম্মান কিংবা ভবিষ্যৎ বিবাহের ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ফলে নারী চাকরি খোঁজার আগেই তার সম্ভাব্য কর্মক্ষেত্র ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে সংকুচিত হয়ে যায়। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি শুধু এমন কাজ খুঁজতে বাধ্য হন, যা পরিবারের সব শর্ত পূরণ করে। কর্মবাজারে সেই ধরনের কাজ পর্যাপ্ত না থাকলে তাঁর নাম ‘কাজ করতে অনিচ্ছুক’ নারীর তালিকায় যুক্ত হয়।
কিন্তু এই অনিচ্ছা কতটা ব্যক্তিগত, আর কতটা সামাজিক বাধার ফল—প্রচলিত পরিসংখ্যান সব সময় সেই পার্থক্য দেখায় না।
বিয়ে ও মাতৃত্বের পর দ্বিতীয় ছাঁকনি
শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে যাওয়ার প্রথম বাধাটি আসে চাকরি পাওয়ার সময়। দ্বিতীয় এবং আরও বড় বাধা আসে বিয়ে ও সন্তান জন্মের পর।
একজন কর্মজীবী পুরুষ বিয়ে করলে তাঁর পেশাগত ধারাবাহিকতা সাধারণত প্রশ্নের মুখে পড়ে না। নারী বিয়ে করলে কোথায় থাকবেন, কখন ফিরবেন, সংসার কে সামলাবে এবং সন্তান হলে চাকরি চালিয়ে যাবেন কি না—এসব প্রশ্ন সামনে আসে।
গৃহস্থালি কাজ, শিশু, অসুস্থ ও বয়স্ক সদস্যের যত্ন এখনো প্রধানত নারীর দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত। এই কাজের অর্থনৈতিক মূল্য আছে, কিন্তু মজুরি নেই এবং জাতীয় হিসাবে তার অধিকাংশ দৃশ্যমান নয়।
নারী অফিসে আট ঘণ্টা কাজ করলেও ঘরে ফিরে তাঁর দ্বিতীয় কর্মদিবস শুরু হয়। পুরুষ সহকর্মী যে সময় অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, নেটওয়ার্কিং অথবা পদোন্নতির প্রস্তুতিতে ব্যয় করতে পারেন, নারীকে সেই সময় রান্না, শিশুর পড়াশোনা ও পরিবারের যত্নে দিতে হতে পারে।
আইএলও বলছে, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক অবৈতনিক পরিচর্যার কাজ। বাংলাদেশে নারীরা অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমিকদের প্রায় ৬৫ শতাংশ। বাংলাদেশের পরিচর্যা অর্থনীতি নিয়ে আইএলওর তথ্য
মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান থাকলেও সব প্রতিষ্ঠান তা কার্যকরভাবে মানে না। আনুষ্ঠানিক খাতের বাইরের বিপুলসংখ্যক নারী কোনো সুরক্ষাই পান না। মানসম্মত ও সাশ্রয়ী শিশুযত্ন কেন্দ্রের অভাবে অনেক নারী সন্তানের জন্মের পর সাময়িক বিরতি নেন; সেই বিরতিই পরে স্থায়ীভাবে কর্মবাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণ হয়।
নিরাপত্তা একটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন
নারীর কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনায় নিরাপত্তাকে প্রায়ই সামাজিক সমস্যা হিসেবে আলাদা করে দেখা হয়। বাস্তবে এটি সরাসরি অর্থনৈতিক বাধা।
গণপরিবহনে হয়রানি, রাতে নিরাপদ যাতায়াতের অভাব, কর্মস্থলের যৌন হয়রানি এবং অভিযোগ করলে চাকরি হারানোর ভয়—সবকিছু নারীর পেশা নির্বাচনের পরিধি কমিয়ে দেয়। পরিবারও এসব ঝুঁকি দেখিয়ে মেয়েকে দূরের কিংবা সন্ধ্যাকালীন চাকরিতে যেতে বাধা দেয়।
একই শহরের মধ্যে একজন পুরুষ যেখানে বহু এলাকায় চাকরি খুঁজতে পারেন, একজন নারী নিরাপদ পরিবহন ও গ্রহণযোগ্য কর্মঘণ্টার কারণে কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারেন। ফলে তাঁর সম্ভাব্য চাকরির সংখ্যা, দর-কষাকষির ক্ষমতা এবং আয়—সবই কমে যায়।
নারীর জন্য নিরাপদ বাস, আলোকিত রাস্তা, অভিযোগের কার্যকর ব্যবস্থা এবং কর্মস্থলে হয়রানিবিরোধী নীতি তাই কেবল কল্যাণমূলক ব্যবস্থা নয়। এগুলো শ্রমবাজারের অবকাঠামো।
নিয়োগের টেবিলেও বৈষম্য
চাকরির সাক্ষাৎকারে একজন নারীকে প্রায়ই এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, যা পুরুষকে করা হয় না—বিয়ে হয়েছে কি না, কবে সন্তান নেবেন, রাতে কাজ করতে পারবেন কি না, পরিবারের অনুমতি আছে কি না।
নিয়োগকর্তা কখনো মনে করেন, নারী মাতৃত্বকালীন ছুটি নেবেন, সন্তান অসুস্থ হলে অনুপস্থিত থাকবেন কিংবা দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠানে থাকবেন না। এই অনুমান নারীর যোগ্যতার আগেই তাঁকে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করে।
কিন্তু প্রতিষ্ঠান যদি শিশুযত্ন, নমনীয় কর্মপদ্ধতি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত না করে, তবে তার নিজের কাঠামোগত ব্যর্থতার দায় নারীর ওপর চাপানো হয়। নারীকে চাকরি না দিয়ে বলা হয় তিনি হয়তো একসময় চাকরি ছেড়ে দেবেন; আবার সুযোগ না পাওয়ায় নারীর কম অংশগ্রহণকে তাঁর পেশাগত অনাগ্রহের প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়। এটি একটি আত্মপূরণকারী চক্র।
কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও নারীরা নেতৃত্বে পৌঁছানোর পথে ‘কাচের ছাদ’-এর মুখোমুখি হন। একই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পুরুষের দিকে বেশি যেতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানের নিচের স্তরে নারী থাকলেও ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণে তাঁদের উপস্থিতি কম থাকে।
সংখ্যার ভেতর লুকানো কাজ
নারীর কাজের একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিক চাকরির বাইরে। কৃষিকাজ, গবাদিপশু পালন, পারিবারিক ব্যবসা, ঘরে পণ্য উৎপাদন কিংবা পরিবারের আয়মূলক কাজে সহায়তা করেও অনেক নারী নিজেকে ‘কর্মজীবী’ হিসেবে পরিচয় দেন না। পরিবারের অন্যরাও তাঁদের কাজকে সহযোগিতা হিসেবে দেখেন, পেশা হিসেবে নয়।
ফলে শ্রমশক্তির তথ্যে নারীর কাজ কখনো কম গণনা হতে পারে। আবার অংশগ্রহণের হার বাড়লেও সেটি সব সময় উন্নত কর্মসংস্থানের নির্দেশক নয়। বিনা মজুরির পারিবারিক শ্রম, অনিয়মিত কাজ কিংবা খুব কম আয়ের আত্মকর্মসংস্থানও কর্মরত হিসেবে গণ্য হতে পারে।
তাই শুধু কত শতাংশ নারী কাজ করছেন, তা দিয়ে অগ্রগতি মাপা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে তাঁরা কী ধরনের কাজ করছেন, নিজের আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ আছে কি না, সামাজিক সুরক্ষা পাচ্ছেন কি না এবং কাজটি তাঁদের দক্ষতা ও শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
শিক্ষার কাঠামোও কি প্রস্তুত করছে?
পরীক্ষায় ভালো ফল করা মূলত পাঠ্যবই আয়ত্ত, নিয়মিত অধ্যয়ন ও নির্ধারিত মূল্যায়নে সফলতার প্রমাণ। কর্মজীবনে প্রয়োজন হয় তার সঙ্গে যোগাযোগ, দর-কষাকষি, সমস্যা সমাধান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, পেশাগত নেটওয়ার্ক এবং ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে এই দক্ষতা গড়ে তুলতে দুর্বল। তবে মেয়েরা সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে শ্রেণিকক্ষের বাইরের অভিজ্ঞতা, ইন্টার্নশিপ, বিতর্ক, ভ্রমণ ও পেশাগত যোগাযোগের সুযোগ তুলনামূলক কম পেতে পারেন। ফলে ফলাফলে এগিয়ে থেকেও কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতায় প্রয়োজনীয় কিছু সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পথ হতে পারে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। ২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশভিত্তিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ শিক্ষার সমপর্যায়ের নারীদের তুলনায় কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত নারীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ধারাবাহিকভাবে বেশি। কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানবিষয়ক গবেষণা
অর্থাৎ সমাধান মেয়েদের কম পড়ানো নয়; বরং শিক্ষাকে কর্মবাজার, প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক দক্ষতার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা।
কী পরিবর্তন প্রয়োজন?
প্রথমত, নারীশিক্ষার সাফল্যের সূচককে পরীক্ষার ফল ও ভর্তির হারের বাইরে নিতে হবে। শিক্ষাজীবন শেষ করার তিন বা পাঁচ বছর পর কতজন নারী চাকরি, উদ্যোক্তা কার্যক্রম কিংবা দক্ষতাভিত্তিক পেশায় আছেন—সেটিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের সূচক হওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই মেয়েদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা, আর্থিক জ্ঞান, ডিজিটাল দক্ষতা ও পেশাগত নির্দেশনা দিতে হবে। শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না; ইন্টার্নশিপ ও চাকরির সঙ্গে তার সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাতকে শিশুযত্ন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে হবে। কর্মক্ষেত্রসংলগ্ন মানসম্মত ডে-কেয়ার, পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং পরিবারের নারী-পুরুষ উভয়ের পরিচর্যার দায়িত্ব স্বীকার না করলে মাতৃত্বের পুরো মূল্য নারীর পেশার ওপরই পড়বে।
চতুর্থত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন, কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং অভিযোগকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। আইনের অস্তিত্বের পাশাপাশি তার বাস্তব প্রয়োগ ও পর্যবেক্ষণ দরকার।
পঞ্চমত, কর্মজীবনে বিরতি নেওয়া নারীদের ফিরে আসার পথ তৈরি করতে হবে। পুনঃপ্রশিক্ষণ, নমনীয় কাজ, খণ্ডকালীন পেশার সুরক্ষা ও ‘রিটার্নশিপ’ কর্মসূচি একজন দক্ষ মাকে স্থায়ীভাবে শ্রমবাজারের বাইরে চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
ষষ্ঠত, নিয়োগ, বেতন ও পদোন্নতির লিঙ্গভিত্তিক তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পরিমাপ না করলে বৈষম্য সহজেই অদৃশ্য থেকে যায়।
সবশেষে, পরিবারে পুরুষের পরিচর্যা ও গৃহস্থালি দায়িত্বকে স্বাভাবিক করতে হবে। নারীকে কর্মজীবী হতে উৎসাহ দেওয়া, কিন্তু ঘরের সব দায়িত্বও তাঁর ওপর রেখে দেওয়া—সমতা নয়; এটি একই মানুষের ওপর দ্বিগুণ প্রত্যাশা।
বাংলাদেশ মেয়েদের বিদ্যালয়ে নিয়ে আসার কঠিন কাজটি অনেকাংশে সফলভাবে করেছে। এখন আরও কঠিন একটি কাজ সামনে—বিদ্যালয় থেকে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত পথটিকে নিরাপদ, ন্যায্য ও ব্যবহারযোগ্য করা।
পরীক্ষার ফল মেয়েদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। কর্মজীবনে তাদের অনুপস্থিতি সেই সামর্থ্যের অভাব নয়; বরং রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মবাজারের সমন্বিত ব্যর্থতার প্রমাণ।
মেয়েদের হাতে সনদ তুলে দিয়ে যদি চাকরির দরজাটি অদৃশ্য শর্তে বন্ধ রাখা হয়, তবে শিক্ষার সাফল্য হারিয়ে যায় না শুধু একজন নারীর জীবনে। হারিয়ে যায় পরিবারের বিনিয়োগ, রাষ্ট্রের মানবসম্পদ এবং পুরো অর্থনীতির সম্ভাবনা।
আপনার মতামত জানানঃ