পশ্চিমবঙ্গে BJP সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষদের নিয়ে রাজ্য সরকারের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। একদিকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে বাংলাদেশ থেকে আসা নির্দিষ্ট শ্রেণির শরণার্থীদের Citizenship Amendment Act বা CAA-এর আওতায় নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে CAA-এর আওতায় না থাকা ব্যক্তিদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ২০ মে ‘detect, delete and deport’ নীতির ঘোষণা দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, CAA-এর আওতায় পড়েন না—এমন কথিত অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং পরবর্তী ধাপে তাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সীমান্তে দীর্ঘদিনের অসম্পূর্ণ বেড়া নির্মাণের জন্য BSF-কে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্তও ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, CAA-এর আওতাভুক্ত শরণার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতি নেওয়া হয়েছে। ১ আগস্ট পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ৫,৯৬৬ জনকে CAA-এর অধীনে নাগরিকত্বের সনদ দেওয়া হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন। বাকি আবেদনগুলোও আগামী ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে মূল রাজনৈতিক বৈপরীত্য। একই বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষের ক্ষেত্রে একজনকে ‘শরণার্থী’ এবং অন্যজনকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে—যার ভিত্তি হচ্ছে মূলত আইনি যোগ্যতা, আগমনের সময় এবং CAA-এর আওতায় পড়ার প্রশ্ন। CAA-তে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য নাগরিকত্বের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সরাসরি বাংলাদেশ-সংযোগ। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বড় একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের নতুন অভিবাসন ও সীমান্তনীতি শুধু রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় নয়; এর প্রভাব দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সম্পর্কের ওপরও পড়তে পারে।
ইতোমধ্যে কথিত অবৈধ বিদেশিদের রাখার জন্য পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় holding centre তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মে মাসে মালদায় প্রথম এমন কেন্দ্র চালু হয় এবং সেখানে নয়জন সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিককে রাখা হয়েছিল। এরপর মুর্শিদাবাদেও একটি কেন্দ্র চালু করা হয়।
এর ফলে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—ভারত থেকে কাউকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আগে তার নাগরিকত্ব কীভাবে যাচাই করা হবে? পরিচয় নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ভুল হলে তার দায় কে নেবে? আর ভারত যাদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করবে, বাংলাদেশ কি প্রত্যেককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণ করবে?
এই প্রশ্নগুলো ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও মানবিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
BJP অবশ্য এই নীতিকে ‘দ্বিমুখী’ হিসেবে দেখে না। দলটির বক্তব্য হলো, ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে আসা নির্দিষ্ট শরণার্থী এবং অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে আসা বিদেশিদের আলাদা করা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও বলেছেন, যোগ্য শরণার্থীদের CAA-এর অধীনে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে এবং ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের Matua, Namasudra-সহ অন্যান্য শরণার্থী সম্প্রদায়ের জন্য CAA-এর নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া দ্রুত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। একই সময়ে ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও বলেন।
অর্থাৎ BJP-র রাজনৈতিক বয়ানে বিষয়টি পরিষ্কার—‘যোগ্য শরণার্থী’ নাগরিকত্ব পাবেন, আর ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’কে ভারত থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।
পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ ও অনুপ্রবেশের প্রশ্ন BJP-র রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি এখন শুধু নির্বাচনী বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই; নাগরিকত্ব, ভোটার তালিকা, সীমান্ত নিরাপত্তা, পুলিশি অভিযান এবং holding centre-এর মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।
এখানেই ধর্মীয় রাজনীতির একটি নতুন মাত্রা তৈরি হচ্ছে। BJP বাংলাদেশ থেকে আসা নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ‘নির্যাতিত শরণার্থী’ হিসেবে নাগরিকত্ব দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে, আবার অন্যদিকে কথিত অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে। ফলে বাংলাদেশ ইস্যু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একই সঙ্গে নাগরিকত্ব, ধর্ম, সীমান্ত নিরাপত্তা ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
তবে এই নীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে পরিচয় নির্ধারণের স্বচ্ছতা। একজন প্রকৃত ভারতীয় নাগরিককে ভুলভাবে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তার পরিণতি গুরুতর হতে পারে। একইভাবে প্রকৃত বিদেশি নাগরিক শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।
তাই বিতর্কটি শুধু BJP-র নীতি ‘দ্বিমুখী’ কি না, সেখানে সীমাবদ্ধ নয়। আসল প্রশ্ন হলো—একই সীমান্তের ওপার থেকে আসা মানুষদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ও মানবিক মর্যাদা নির্ধারণের মানদণ্ড কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনি হবে?
পশ্চিমবঙ্গের BJP সরকারের ‘শরণার্থী বনাম অনুপ্রবেশকারী’ নীতি আগামী দিনে শুধু রাজ্য রাজনীতির গতিপথই বদলাবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও। বিশেষ করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়, সেটিই হবে এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার জায়গা।
আপনার মতামত জানানঃ