প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া হয়েছিল ৩৫ হাজার টাকা। উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধে অংশ নেওয়া ভারতীয় সৈন্যদের ভরণপোষণে সহায়তা করা। সময়টা ১৯১৭ সাল। এরপর পেরিয়ে গেছে ১০৯ বছর। ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে, ভারত স্বাধীন হয়েছে, বদলে গেছে পৃথিবীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু সেই ঋণের হিসাব যেন এখনো শেষ হয়নি। মধ্যপ্রদেশের এক ভারতীয় পরিবারের দাবি, তাদের পূর্বপুরুষ ব্রিটিশ সরকারকে যে ৩৫ হাজার টাকা ধার দিয়েছিলেন, তা আজও ফেরত দেওয়া হয়নি। এবার সেই অর্থ সুদ, চক্রবৃদ্ধি সুদ ও অন্যান্য খরচসহ ফেরত চেয়েছে পরিবারটি।
ঘটনাটির কেন্দ্রে রয়েছেন ব্যবসায়ী শেঠ জুম্মালাল রুঠিয়া। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে তিনি ব্রিটিশ সরকারের হাতে এই অর্থ তুলে দিয়েছিলেন বলে দাবি করছে তার পরিবার। এত বছর পর পুরোনো নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে পরিবারটি সেই ঋণের একটি শংসাপত্র খুঁজে পায়। ১৯১৭ সালের ৪ জুন তারিখ দেওয়া ওই নথিতেই ৩৫ হাজার টাকার আর্থিক লেনদেনের উল্লেখ রয়েছে বলে পরিবারটির দাবি।
রুঠিয়া পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে ভারতীয় সৈন্যরাও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিচ্ছিলেন। যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এবং সৈন্যদের ভরণপোষণের জন্য ব্রিটিশ সরকার অর্থ সংগ্রহ করছিল। সেই সময় স্থানীয় একজন ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে জুম্মালাল রুঠিয়া সরকারের পাশে দাঁড়ান। তিনি সাধারণ কোনো ব্যক্তিকে নয়, ব্রিটিশ সরকারকেই ঋণ দিয়েছিলেন বলে পরিবারটির দাবি।
নথিটি খুঁজে পাওয়ার পর বিষয়টি আর পারিবারিক ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। চলতি বছরের শুরুতে অন্য একটি মামলার জন্য পুরোনো কাগজপত্র খুঁজছিল রুঠিয়া পরিবার। সেখানেই বেরিয়ে আসে এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ওই ঋণের নথি। এরপর একজন আইনজীবীর মাধ্যমে তারা যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, কয়েক মাস অপেক্ষার পর অবশেষে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে তারা সাড়া পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের ডেট ম্যানেজমেন্ট দফতর বিষয়টি যাচাই করতে পরিবারটির কাছে আরও নথিপত্র চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক বংশতালিকা, পুরোনো সনদ, ঋণের নথি এবং ১৯১৭ সালে ব্যবহৃত সংশ্লিষ্ট ফর্ম বা কাগজপত্র।
এই যোগাযোগকে অবশ্য ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে ঋণ স্বীকার করে নেওয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিষয়টি এখনো যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। কর্তৃপক্ষের মূল কাজ হবে ১৯১৭ সালে জুম্মালাল রুঠিয়া যে অর্থ দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তার সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব রেকর্ডের কোনো মিল আছে কি না, তা খুঁজে দেখা। একই সঙ্গে ১০৯ বছর পর যারা অর্থ দাবি করছেন, তারা সত্যিই সেই মূল পরিবারের উত্তরসূরি কি না, সেটিও যাচাই করা হবে।
রুঠিয়া পরিবারের সদস্য গৌতম রুঠিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো ইমেইলে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে এবং তদন্তের জন্য তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। পরিবারও প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—১০৯ বছর আগের ৩৫ হাজার টাকা আজকের দিনে কত টাকায় দাঁড়ায়?
এই হিসাব এখনো চূড়ান্ত করেনি রুঠিয়া পরিবার। তবে তাদের পরিকল্পনা বেশ বিস্তৃত। শুধু আসল ৩৫ হাজার টাকা নয়, এর সঙ্গে সুদ, চক্রবৃদ্ধি সুদ এবং অন্যান্য সম্ভাব্য খরচও যোগ করতে চায় তারা। এরপর সেই অর্থের বর্তমান মূল্য নির্ধারণের কথাও ভাবছে পরিবারটি।
অর্থাৎ, ১৯১৭ সালের ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে আজকের দিনে কী পরিমাণ অর্থ দাবি করা যায়, সেটি হয়ে উঠতে পারে এই দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক দাবির সবচেয়ে আলোচিত অংশ। কারণ এক শতাব্দীরও বেশি সময়ে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা এবং মুদ্রার মূল্য ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
রুঠিয়া পরিবারের বক্তব্য, বিষয়টি তাদের কাছে শুধু অর্থ পাওয়ার প্রশ্ন নয়। তাদের কাছে এটি পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক দায়ের বিষয়। পরিবারের সদস্য বিনয় রুঠিয়ার ভাষায়, ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে পাওয়া প্রথম প্রতিক্রিয়াই তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সৃষ্টি করেছে। অর্থের পাশাপাশি পারিবারিক ঐতিহ্যের বিষয়টিকেও তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
জুম্মালাল রুঠিয়া যে সময় এই অর্থ দিয়েছিলেন, তখন ভারত ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল ইউরোপজুড়ে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছিলেন। ভারত থেকেও হাজার হাজার সৈন্য ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। যুদ্ধের বিশাল ব্যয় সামাল দিতে ব্রিটিশ সরকারকে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়েছিল।
রুঠিয়া পরিবার এটিকে সেই যুদ্ধকালীন অর্থসংগ্রহের অংশ হিসেবে দেখছে। পরিবারের দাবি, এটি কোনো সাধারণ ব্যাংক ঋণের মতো নির্দিষ্ট পাঁচ বা দশ বছরের মেয়াদি ঋণ ছিল না। যুদ্ধের প্রয়োজনে দেওয়া অর্থ হওয়ায় যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে এর পরিশোধের সম্পর্ক ছিল বলে তারা মনে করে। ফলে নির্দিষ্ট মেয়াদ না থাকার কারণে এত বছর পরও দাবি তোলার সুযোগ রয়েছে—এমন যুক্তি তুলে ধরছে পরিবারটি।
তবে এই দাবির আইনি ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একদিকে রয়েছে ১৯১৭ সালের একটি নথি। অন্যদিকে রয়েছে ১০৯ বছরের ব্যবধান, ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন, ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ঋণ পুনর্গঠনের ইতিহাস। ফলে শুধু একটি পুরোনো সনদ থাকলেই দাবি প্রতিষ্ঠিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
রুঠিয়া পরিবার অবশ্য ব্রিটিশ সরকারের পুরোনো যুদ্ধঋণের ইতিহাসও খতিয়ে দেখেছে। তাদের দাবি, ২০১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নেওয়া বিপুল পরিমাণ পুরোনো ঋণের একটি অংশ পরিশোধ করেছিল। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া সরকারি তথ্যেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-সম্পর্কিত বিপুল অঙ্কের বকেয়া ঋণের কথা উল্লেখ ছিল। এর মধ্যে যুদ্ধকালীন কিছু ঋণ ও সরকারি বন্ডও ছিল।
কিন্তু এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। ১৯১৭ সালে জুম্মালাল রুঠিয়ার দেওয়া ৩৫ হাজার টাকা সেই সরকারি ঋণ বা বন্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি। পরিবারের হাতে থাকা নথি এবং ব্রিটিশ সরকারের আর্কাইভ বা আর্থিক রেকর্ডের মধ্যে মিল পাওয়া গেলেই কেবল দাবিটির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
জুম্মালাল রুঠিয়া নিজেও সে সময় সাধারণ কোনো ব্যবসায়ী ছিলেন না বলে পরিবারটি জানিয়েছে। তাদের দাবি, তার বড় ব্যবসা ছিল এবং প্রায় তিন হাজার গরু নিয়ে একটি গোশালাও পরিচালনা করতেন তিনি। আফিম চাষের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল বলে পরিবার জানিয়েছে। এমনকি তার নিজের একটি রোলস রয়েস গাড়িও ছিল। ফলে ৩৫ হাজার টাকা ঋণ দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তার ছিল—এমনটাই বোঝাতে চায় পরিবারটি।
১৯৩৭ সালে মারা যান জুম্মালাল রুঠিয়া। তার মৃত্যুর প্রায় এক দশক পর, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হয় এবং ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। কিন্তু রুঠিয়া পরিবারের দাবি, স্বাধীনতার পরও ওই ঋণের কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নথিটি পরিবারের পুরোনো কাগজপত্রের মধ্যে পড়ে ছিল। অবশেষে ২০২৬ সালে সেটি নতুন করে সামনে আসে।
এখন প্রশ্ন, ব্রিটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়। কর্তৃপক্ষ যদি নথিগুলো যাচাই করে দেখে যে ঋণটি সত্যিই ব্রিটিশ সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছিল এবং তা পরিশোধ করা হয়নি, তাহলে পরবর্তী আইনি ও আর্থিক প্রক্রিয়া কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আবার নথির সত্যতা বা সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিল না থাকলে পরিবারটির দাবি প্রত্যাখ্যাতও হতে পারে।
পরিবারটি জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে তারা আইনি পদক্ষেপ এবং আরবিট্রেশনের পথেও যেতে পারে। তবে তার আগে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায় তারা।
১০৯ বছর আগে দেওয়া ৩৫ হাজার টাকার এই গল্প তাই কেবল একটি পুরোনো ঋণের গল্প নয়। এটি ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়, যেখানে একটি ব্যক্তিগত পরিবারের সংরক্ষিত নথি হঠাৎ করে যুক্ত হয়ে গেছে একটি সাম্রাজ্যের যুদ্ধকালীন অর্থব্যবস্থার সঙ্গে। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে পরিবারের কাগজপত্রে ঘুমিয়ে থাকা সেই দাবি এখন আবার আলোচনায় এসেছে।
তবে শেষ পর্যন্ত ৩৫ হাজার টাকা কত বড় অঙ্কে পরিণত হবে, কিংবা আদৌ কোনো অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কি না—তার উত্তর এখনো অজানা। আপাতত রুঠিয়া পরিবারের হাতে রয়েছে পুরোনো নথি, পারিবারিক ইতিহাস এবং একটি দীর্ঘ অপেক্ষা। আর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে সেই দাবির সত্যতা যাচাই করার দায়িত্ব। ১০৯ বছর পর তাই এক ভারতীয় পরিবারের প্রশ্ন এখন একটাই—যে টাকা একদিন যুদ্ধের প্রয়োজনে দেওয়া হয়েছিল, ইতিহাসের এত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই ঋণের হিসাব কি এবার সত্যিই মিটবে?
আপনার মতামত জানানঃ