
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “গুম” শব্দটি বহু বছর ধরেই আতঙ্ক, অন্ধকার আর অজানা ভয়ের প্রতীক হয়ে আছে। কোনো ব্যক্তি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা, আর পরে ফিরে এসে ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা—এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এগুলো রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানবাধিকারের গভীর প্রশ্নও সামনে আনে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এক জবানবন্দি আবারও সেই পুরোনো আতঙ্ককে সামনে নিয়ে এসেছে।
যশোরের মনিরামপুরের ব্যবসায়ী নাজিম উদ্দিনের বক্তব্য এখন নতুন করে আলোচনায়। তিনি দাবি করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিপক্ষে লেখালেখি করার কারণে তাকে গুম করা হয়েছিল। শুধু গুমই নয়, দীর্ঘ সময় ধরে তাকে নির্যাতন ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। তার এই বক্তব্য এখন দেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
নাজিম উদ্দিন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং একইসঙ্গে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি মনিরামপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক হিসেবেও পরিচিত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৫ মে ঢাকার মিরপুর-১২ নম্বর এলাকা থেকে তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায়।
তিনি আদালতে বলেছেন, যেখানে তাকে রাখা হয়েছিল, সেই স্থানের দেয়ালে লেখা ছিল—“এটা ডিজিএফআই এর হেডকোয়ার্টার জেআইসি সেল।” সেখানে তাকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো কেন তিনি আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরুদ্ধে লেখেন। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়, মানসিক চাপ এবং মৃত্যুর হুমকির কথা।
নাজিম দাবি করেন, তাকে বলা হয়েছিল—তিনি কি খালে-বিলে বস্তাবন্দী লাশ দেখেননি? ট্রেনলাইনে পড়ে থাকা অতিরিক্ত মৃতদেহ দেখেননি? একই ধরনের লেখালেখি করলে তাকেও বস্তায় ভরে ফেলে দেওয়া হবে। এই কথাগুলো শুধু হুমকি নয়; বরং একটি ভয়ভীতির সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশকেই অপরাধ হিসেবে দেখা হয়।
তার জবানবন্দিতে আরও উঠে এসেছে একাধিক ব্যক্তির নাম, যারা একই ধরনের আটক অবস্থায় ছিলেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সেলে আরও কয়েকজনকে আটক রাখা হয়েছিল, যাদের কেউ রাজনৈতিক কর্মী, কেউ প্রবাসী, কেউ আবার অন্য পরিচয়ের মানুষ। তাদের মধ্যে কেউ বাড্ডার, কেউ রাজশাহীর, কেউ লক্ষ্মীপুরের। অর্থাৎ অভিযোগ অনুযায়ী, এই আটক ও নির্যাতনের শিকার ছিলেন বিভিন্ন অঞ্চল ও পেশার মানুষ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুমের অভিযোগ নতুন নয়। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিরোধী রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার এ ধরনের অভিযোগ তুলেছে। অনেক পরিবার দাবি করেছে, তাদের স্বজনদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছিল, পরে আর খোঁজ মেলেনি। কেউ ফিরে এসেছেন, কেউ আজও নিখোঁজ।
গুমের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এটি শুধু একজন মানুষকে হারিয়ে ফেলে না, একটি পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। একজন মা জানেন না তার সন্তান বেঁচে আছে কি না, একজন স্ত্রী জানেন না তার স্বামী কোথায়, একটি শিশু অপেক্ষা করে বাবার ফেরার। এই অনিশ্চয়তা বছরের পর বছর মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।
নাজিম উদ্দিনের বর্ণনায় উঠে এসেছে স্থান পরিবর্তনের কথাও। তিনি দাবি করেছেন, তাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়া হয়। কোথাও বলা হয়েছে র্যাব-২, কোথাও র্যাব-১০, পরে চট্টগ্রামে র্যাব-৭। তার ভাষ্যমতে, একপর্যায়ে তাদের বাথরুমে আটকে রাখা হয়েছিল। এই বিবরণগুলো যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে গোপন আটক ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হবে।
আদালতে দেওয়া তার বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে—“মঞ্চস্থ” অভিযানের অভিযোগ। তিনি বলেছেন, একদিন ভোরে তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে কিছু অস্ত্র ও ব্যাগের পাশে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হয়। এরপর সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। তাদের কোনো কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরে থানায় হস্তান্তর করে বিভিন্ন মামলা দেওয়া হয়।
এ ধরনের অভিযোগ অতীতে বহুবার উঠেছে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে “ক্রসফায়ার”, “বন্দুকযুদ্ধ” বা সাজানো অভিযানের অভিযোগ এসেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট বাহিনী সাধারণত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং আইন অনুযায়ী অভিযান পরিচালনার কথা বলেছে।
এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক-বর্তমান সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, বাকিরা পলাতক বলে জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া এখন রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মূলত ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এখন এই ট্রাইব্যুনালে গুম ও নির্যাতনের মতো অভিযোগ নিয়ে বিচার শুরু হওয়া নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। এটি রাজনৈতিকভাবে যেমন আলোচিত, তেমনি আইনি ও মানবাধিকার প্রশ্নেও তাৎপর্যপূর্ণ।
রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অতীতের অভিযোগ সামনে আসা বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। তবে গুমের মতো অভিযোগ যখন আদালতে সাক্ষ্য ও জবানবন্দির মাধ্যমে সামনে আসে, তখন তা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। কারণ এসব ঘটনা শুধু রাজনীতির লড়াই নয়; এগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন রাজনৈতিক মত প্রকাশের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে সাধারণ মানুষও এখন রাজনৈতিক মতামত দেন। কিন্তু সেই মত প্রকাশ যদি ভয়, হুমকি বা নিপীড়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ভিন্নমত দমন করতে ভয়ভীতি ও গুমের সংস্কৃতি সমাজে আতঙ্ক তৈরি করে। এতে মানুষ নিজের মত প্রকাশে সংকুচিত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বিরোধিতা তখন শুধু রাজনৈতিক অবস্থান থাকে না; সেটি নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পরিণত হয়।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পক্ষ বরাবরই দাবি করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন অনুযায়ী কাজ করে এবং অনেক সময় বিরোধী পক্ষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অতিরঞ্জিত অভিযোগ তোলে। ফলে সত্য-মিথ্যা যাচাই এবং নিরপেক্ষ বিচার এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নাজিম উদ্দিনের এই জবানবন্দি তাই শুধু একজন ব্যক্তির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। তার বক্তব্য কতটা সত্য, আদালত ও তদন্তে তার কতটা প্রমাণ পাওয়া যাবে—সেটি বিচারিক প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে। তবে তার বর্ণনায় যে ভয়, অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক উঠে এসেছে, তা দেশের বহু আলোচিত গুমের ঘটনার স্মৃতিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য এই ধরনের মামলার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিচারহীনতা যেমন সমাজে অবিশ্বাস বাড়ায়, তেমনি সত্য উদঘাটন মানুষকে আস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগও তৈরি করে।
একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকে, আইন সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে এবং মানুষ ভয় ছাড়া কথা বলতে পারে। গুম, নির্যাতন ও ভয়ভীতির অভিযোগ সেই বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়। তাই এসব ঘটনার সত্য উদঘাটন শুধু আইনি দায়িত্ব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বও।
আপনার মতামত জানানঃ