ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সাধারণত সীমান্তের গল্প মানেই অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো, পাচার রোধ বা সীমান্তরক্ষীদের তৎপরতার খবর। কিন্তু এবার গল্পটা উল্টো। বহু বছর ধরে ভারতে বসবাস করা, কাজ করা এবং পরিবার গড়ে তোলা মানুষজন নিজেরাই সীমান্তে এসে দাঁড়াচ্ছেন বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার আশায়। কেউ অপেক্ষা করছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কেউ জেরার মুখোমুখি হচ্ছেন, কারও নথি যাচাই হচ্ছে, আবার কেউ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো ভারতকে বিদায় জানাচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে প্রতিদিনই ভিড় বাড়ছে। নারী, পুরুষ, শিশু—সবার হাতে ছোট ছোট ব্যাগ। তাদের অধিকাংশের দাবি, তারা কয়েক বছর কিংবা কয়েক দশক আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়েছিলেন। কেউ কাজের সন্ধানে, কেউ দারিদ্র্যের তাড়নায়, কেউ পরিবারের সঙ্গে ভালো জীবনের আশায় সীমান্ত পেরিয়েছিলেন। কিন্তু আজ তারা আবার সেই সীমান্তেই ফিরে এসেছেন, তবে এবার বিপরীত দিকে যাওয়ার জন্য।
বাচ্চু মুন্সির গল্প যেন এই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। তিনি জানান, মাত্র দশ বছর বয়সে বাবা-মায়ের হাত ধরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়েছিলেন। তারপর কেটে গেছে প্রায় আটত্রিশ বছর। জীবনের বড় অংশই কেটেছে ভারতের মাটিতে। সেখানে বিয়ে করেছেন, সন্তানদের বড় করেছেন, এমনকি তাদের বিয়েও দিয়েছেন। ভারতের সমাজের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিলেন যে নিজেকে আলাদা করে ভাবার সুযোগই ছিল না। কিন্তু এখন তিনি আবার বাংলাদেশে ফেরার জন্য সীমান্তে অপেক্ষা করছেন।
তার মতো আরও শত শত মানুষ সীমান্তে জড়ো হচ্ছেন। কেউ বলছেন তাদের বাড়ি যশোরে, কেউ খুলনায়, কেউ সাতক্ষীরায়। তাদের অনেকেই স্বীকার করছেন যে তারা অবৈধ পথেই ভারতে প্রবেশ করেছিলেন এবং বছরের পর বছর সেভাবেই বসবাস করেছেন। অনেকে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা করেছেন, কেউ গৃহকর্মী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। ভারতের অর্থনীতির নানা খাতে তারা শ্রম দিয়েছেন, কিন্তু আইনি স্বীকৃতি পাননি।
পরিস্থিতির মোড় ঘুরতে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর। সরকারের পক্ষ থেকে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভোটার তালিকা সংশোধন, নথিপত্র যাচাই এবং প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোর ফলে বহু মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। যারা এতদিন নানা উপায়ে নিজেদের পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের অনেকেই হঠাৎ করে বুঝতে পারেন যে সামনে হয়তো আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
হাকিমপুর সীমান্তে প্রতিদিনের দৃশ্য যেন একটি অস্থায়ী মানবিক নাট্যমঞ্চ। ভোর থেকেই মানুষজন জড়ো হতে শুরু করেন। প্রথমে তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষা করতে বলা হয়। এরপর একে একে ডেকে আনা হয়। তাদের নাম, পরিচয়, বাংলাদেশের ঠিকানা, পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। নথি যাচাই করা হয়। ছবি তোলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক তথ্যও নেওয়া হয়। সবকিছু শেষ হওয়ার পরও সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ মেলে না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কখনও কখনও পুরো দিন কেটে যায় এই প্রক্রিয়ায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে অনেককে অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাত কাটানোর পর পরবর্তী ধাপে সীমান্ত অতিক্রমের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে যারা দেশে ফিরতে এসেছেন, তাদের জন্য যাত্রাপথটি সহজ নয়; বরং মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা এবং উদ্বেগে ভরা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই মানুষদের অনেকের কাছেই ভারতের বিভিন্ন ধরনের পরিচয়পত্র রয়েছে। কারও কাছে ভোটার কার্ড, কারও আধার কার্ড, কারও প্যান কার্ড। বাচ্চু মুন্সি নিজেই জানিয়েছেন, তিনি ভোটার কার্ড সংগ্রহ করেছিলেন এবং একবার ভোটও দিয়েছেন। অর্থাৎ বহু বছর ধরে তারা স্থানীয় সমাজ ও প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হিসেবেই জীবনযাপন করছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয়ও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতি শুধু আইনি নয়, গভীরভাবে মানবিকও। একজন মানুষ যখন চার দশকের কাছাকাছি সময় একটি দেশে কাটান, সেখানে সন্তান জন্মায়, পরিবার গড়ে ওঠে, প্রতিবেশী তৈরি হয়, তখন সেই দেশকে শুধুমাত্র কর্মস্থল বলা যায় না। সেটি তার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। তাই বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত অনেকের জন্যই শুধু স্থান পরিবর্তন নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ জীবনকে পেছনে ফেলে যাওয়ার মতো কঠিন অভিজ্ঞতা।
নারীদের অভিজ্ঞতাও একইভাবে বেদনাদায়ক। সীমান্তে অপেক্ষমাণ নাজমা বলছিলেন, পরিস্থিতি এমন হয়ে উঠেছে যে ভারতে আর থাকা সম্ভব হচ্ছে না। তার মতে, প্রশাসনিক চাপ এবং গ্রেপ্তারের আশঙ্কা অনেককে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। ফলে যারা হয়তো আরও কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলেন, তারাও পরিবার নিয়ে ফিরে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক চাপ। সীমান্তে আসা অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে শুধু প্রশাসন নয়, স্থানীয় পর্যায়েও তাদের প্রতি সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। বাড়িওয়ালারা ভাড়া দিতে অনাগ্রহী, পুলিশ পরিচয়পত্র যাচাই করছে, বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফলে দৈনন্দিন জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
তবে দেশে ফিরে আসার পথও খুব সহজ নয়। অনেকেই বহু বছর আগে বাংলাদেশ ছেড়েছেন। কারও গ্রামের বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে, কারও আত্মীয়স্বজন ছড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন এলাকায়। অনেক শিশুই বাংলাদেশে কখনও বসবাস করেনি। তাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা—সবই ভারতে। ফলে বাংলাদেশে এসে নতুন করে জীবন শুরু করা তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। ভারতে কাজ করে যারা জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা দেশে ফিরে কী করবেন? কোথায় কাজ পাবেন? কীভাবে পরিবার চালাবেন? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর অনেকের কাছেই নেই। তবু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েই তারা ফিরে আসছেন, কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের কাছে সেটিই তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প বলে মনে হচ্ছে।
এই ঘটনাপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ায় সীমান্ত, অভিবাসন এবং নাগরিকত্বের জটিল বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক মিল, পারিবারিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে বহু মানুষ বছরের পর বছর সীমান্ত অতিক্রম করেছেন। কেউ বৈধভাবে, কেউ অবৈধভাবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে সেই দীর্ঘদিনের বাস্তবতাও দ্রুত বদলে যেতে পারে।
হাকিমপুর সীমান্তের দৃশ্য তাই কেবল কয়েকশ মানুষের যাত্রার গল্প নয়। এটি রাষ্ট্রের আইন, রাজনীতির প্রভাব, পরিচয়ের সংকট এবং মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের এক জটিল প্রতিচ্ছবি। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষের ব্যাগে হয়তো কয়েকটি কাপড়, কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর অল্প কিছু জিনিসপত্র রয়েছে। কিন্তু তাদের হৃদয়ে জমা আছে বহু বছরের স্মৃতি, সম্পর্ক, আশা এবং ভয়।
যারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ফিরছেন, তাদের অনেকেই বলছেন যে আর অবৈধভাবে ভারতে যাবেন না। কেউ কেউ বলছেন, যদি কখনও আবার যেতে হয়, তবে বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়েই যাবেন। এই বক্তব্যে যেমন বাস্তবতার স্বীকৃতি আছে, তেমনি রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার শিক্ষা।
সীমান্তে অপেক্ষমাণ সেই মানুষদের মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, অভিবাসনের গল্প কখনও শুধু পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এটি মানুষের গল্প। ঘর হারানোর গল্প। নতুন ঘর খোঁজার গল্প। আবার কখনও বহু বছর পর নিজের জন্মভূমিতে ফিরে আসার গল্প। হাকিমপুর সীমান্তে আজ যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা হয়তো ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসন ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হবে—যেখানে মানুষ সীমান্ত পেরিয়েছিল শুধু নতুন জীবনের সন্ধানে নয়, বরং আবার নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য।
আপনার মতামত জানানঃ