
রাশিয়া ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ভারতীয় রুপিতে নিষ্পত্তির যে প্রস্তাব সামনে এসেছে, সেটিকে শুধু একটি বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনের উদ্যোগ হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এটি একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থপ্রবাহ সচল রাখা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ পরিশোধের পথ তৈরি করা, ভারতীয় রুপির আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়ানো এবং দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নতুন ত্রিপক্ষীয় আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—এটি এখনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মস্কো ভারতীয় রুপিতে লেনদেনের পাশাপাশি একটি বিশেষায়িত দ্বিপক্ষীয় পেমেন্ট অবকাঠামো এবং ঢাকায় রুশ ব্যাংকের শাখা খোলার প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে; ভারতও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের অবস্থান জানায়নি।
এই প্রস্তাবের পেছনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক কারণ হলো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে রুশ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক ডলারভিত্তিক লেনদেনে তৈরি হওয়া জটিলতা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে পণ্য বা সেবা নিলেও অর্থ পরিশোধের নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এই সমস্যাকে বড় করে তুলেছে। প্রকল্পটি রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম নির্মাণ করছে এবং এর জন্য মস্কো ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে, যার পরিশোধ ২০২৭ সাল থেকে শুরু হওয়ার কথা। ফলে রুশ ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে বাংলাদেশকে শুধু বাণিজ্য নয়, একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বৃহৎ বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধেরও কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
রুপি কেন?
প্রথম দৃষ্টিতে প্রশ্ন উঠতে পারে—বাংলাদেশ ও রাশিয়ার লেনদেনে ভারতীয় রুপি কেন ব্যবহৃত হবে? দুই দেশের কেউই তো রুপির ইস্যুকারী নয়। উত্তরটি নিহিত রয়েছে ভারত ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং রাশিয়ার হাতে জমে থাকা রুপির মধ্যে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভারত বিপুল পরিমাণ ছাড়মূল্যের রুশ তেল কিনেছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভারত ও রাশিয়ার মোট বাণিজ্য ছিল ৬৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যার ৬১ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারই ছিল রাশিয়া থেকে ভারতে রপ্তানি। অর্থাৎ বাণিজ্যটি ছিল মারাত্মকভাবে রাশিয়ার অনুকূলে এবং রুশ রপ্তানিকারকদের হাতে বিপুল রুপি জমা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ভারতের রাশিয়ায় রপ্তানি একই হারে না বাড়ায় এই রুপি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটি দুই দেশের জন্যই একটি বাস্তব সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের সঙ্গে লেনদেনে সেই জমে থাকা রুপি ব্যবহার করা গেলে রাশিয়ার জন্য নতুন একটি পথ তৈরি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ রাশিয়ার পাওনা ভারতীয় রুপিতে পরিশোধ করলে সেই অর্থ ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রাখা বা ভারত থেকে পণ্য, পরিষেবা, সরকারি বন্ড ও অন্যান্য সম্পদ কেনার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে ডলার বা ইউরোর মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের প্রয়োজন কমে যাবে।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ রুপি ভস্ত্রো অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিদেশি ব্যাংককে ভারতে রুপি সংরক্ষণ ও ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় ভারতীয় আমদানিকারক বা তৃতীয় দেশের অংশগ্রহণকারী সরাসরি রুপিতে অর্থ পরিশোধ করতে পারে। তবে বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা, রুপির পূর্ণ রূপান্তরযোগ্য না হওয়া এবং মুদ্রার বিনিময়মূল্যের ঝুঁকি এখনো বড় বাধা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও রুপি একেবারে অপরিচিত কোনো নিষ্পত্তি মুদ্রা নয়। ২০২৩ সালে ভারত ও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের একটি অংশ রুপিতে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালু করেছিল। ফলে বাংলাদেশি ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের কাছে রুপিভিত্তিক বাণিজ্যের একটি প্রাথমিক কাঠামো ইতিমধ্যেই রয়েছে। রাশিয়াকে এই ব্যবস্থার সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত করা গেলে নতুন করে শূন্য থেকে অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজন কমতে পারে।
তবে এখানেই বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় থেকে ত্রিপক্ষীয় হয়ে ওঠে। ভারতীয় রুপি ব্যবহারের জন্য ভারতীয় ব্যাংক, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং ভারতের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা অপরিহার্য হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ও রাশিয়া রাজনৈতিকভাবে সম্মত হলেও ভারতের অনুমোদন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই ব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা
বাংলাদেশের জন্য প্রথম সম্ভাব্য সুবিধা হলো ডলারের ওপর চাপ কিছুটা কমানো। আমদানি, বৈদেশিক ঋণ, জ্বালানি এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্টের জন্য বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যবহার করতে হয়। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও রূপপুরের অর্থ পরিশোধের একটি অংশ রুপিতে করা গেলে ডলারের চাহিদা সীমিত মাত্রায় হলেও কমতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আটকে থাকা অর্থ পরিশোধের একটি গ্রহণযোগ্য পথ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ সময় অর্থ আটকে থাকলে জরিমানা, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, কূটনৈতিক বিরোধ কিংবা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা এসব সমস্যার কিছুটা সমাধান করতে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ রাশিয়ার বাজারে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য ও হালকা প্রকৌশলসামগ্রীর রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ নিয়ে আলোচনা করতে পারে। শুধু রুশ পণ্যের মূল্য পরিশোধের জন্য রুপি ব্যবহার করলে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর একটি নতুন চক্রে ঢুকে পড়বে। কিন্তু রাশিয়া যদি বাংলাদেশ থেকে রুপিতে পণ্য কেনে, তবে ব্যবস্থাটি তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।
চতুর্থত, এটি বাংলাদেশের জন্য বহু-মুদ্রাভিত্তিক বাণিজ্য কৌশল পরীক্ষার সুযোগ। ডলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হিসেবেই থাকবে; কিন্তু রুপি, ইউয়ান, টাকা বা অন্য মুদ্রায় সীমিত নিষ্পত্তি চালু থাকলে কোনো একটি ব্যাংকিং চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
তবে রুপিতে লেনদেন মানেই ডলার নির্ভরতার অবসান নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয়, বিমা এবং ঋণের হিসাব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখনো ডলারে নির্ধারিত হয়। ফলে রুপিতে অর্থ পরিশোধ করা হলেও চুক্তির মূল্য ডলার অনুযায়ী হিসাব করে পরে রুপিতে রূপান্তর করা হতে পারে। এতে ডলারের ব্যবহার সরাসরি কমলেও ডলারভিত্তিক মূল্যঝুঁকি থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি বের হতে পারবে না।
অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও জটিলতা
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো বিনিময় হার। বাংলাদেশি টাকা থেকে ভারতীয় রুপি এবং প্রয়োজনে রুপি থেকে রুবলে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় একাধিক মুদ্রার ওঠানামা কাজ করবে। রুপি বা রুবলের মূল্য দ্রুত পরিবর্তিত হলে বাংলাদেশকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হতে পারে।
দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো রুপির ব্যবহারযোগ্যতা। ডলার বিশ্বের প্রায় সব বাজারে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু রুপির ক্ষেত্র সীমিত। বাংলাদেশ যদি রুপিতে রপ্তানি আয় পায়, সেই রুপি দিয়ে কী কিনবে—ভারতীয় পণ্য, রুশ পণ্য, নাকি কোনো আর্থিক সম্পদ—তা আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় ব্যাংকগুলোর হিসাবে এমন রুপি জমা হতে পারে, যা সহজে ব্যবহার বা অন্য মুদ্রায় রূপান্তর করা যাবে না।
তৃতীয় সমস্যা বাণিজ্যের ভারসাম্য। রাশিয়া যদি বাংলাদেশে বেশি পণ্য রপ্তানি করে কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কম কেনে, তবে একদিকে রাশিয়ার পাওনা রুপি বাড়বে, অন্যদিকে বাংলাদেশের রুপি সংগ্রহের চাপ সৃষ্টি হবে। ভারত-রাশিয়া বাণিজ্যে যে অসমতা দেখা গেছে, বাংলাদেশকে সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
চতুর্থ এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল ঝুঁকি হলো নিষেধাজ্ঞা। মুদ্রা বদলে ফেললেই নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি শেষ হয় না। যে রুশ ব্যাংক, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেন হবে, তারা যদি মার্কিন বা ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি ব্যাংকও সেকেন্ডারি স্যাংশন, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সম্পর্ক হারানো বা কমপ্লায়েন্স জটিলতার মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান বাজার পশ্চিমা দেশগুলো। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও ব্যাংকিং খাতও ডলার এবং পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই রাশিয়ার সঙ্গে একটি বিকল্প চ্যানেল তৈরি করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক ঝুঁকিতে ফেলা বাংলাদেশের জন্য যুক্তিসংগত হবে না। প্রতিটি লেনদেনকে নিষেধাজ্ঞা, অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নিয়মের আলোকে যাচাই করতে হবে।
কূটনীতিতে ভারতের নতুন অবস্থান
এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ভারত কেবল একটি মুদ্রার মালিক দেশ থাকবে না; বাংলাদেশ-রাশিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি মধ্যবর্তী শক্তিতে পরিণত হবে। ভারতের ব্যাংকিং অবকাঠামো, রুপি অ্যাকাউন্ট এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ছাড়া লেনদেন চলবে না। ফলে বাংলাদেশের রাশিয়াসংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক পথও আংশিকভাবে নয়াদিল্লির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।
ভারতের জন্য এতে কয়েকটি সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, রুপির আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়বে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার কাছে জমে থাকা রুপি ব্যবহারের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ-রাশিয়া বাণিজ্যে ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি বাড়বে। চতুর্থত, দক্ষিণ এশিয়ার আর্থিক সংযোগে নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
কিন্তু বাংলাদেশের দৃষ্টিতে এর একটি কৌশলগত ঝুঁকিও আছে। রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য সহজ করার নামে ভারতনির্ভর নতুন আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি হলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে এই চ্যানেল কতটা স্থিতিশীল থাকবে, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
সুতরাং বাংলাদেশকে এমন ব্যবস্থা চাইতে হবে, যেখানে ভারত সহযোগী হবে কিন্তু নিয়ন্ত্রণকারী একমাত্র পক্ষ হবে না। লেনদেনের শর্ত, বিনিময় হার, অর্থ আটকে যাওয়ার পরিস্থিতি, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং নিষেধাজ্ঞাজনিত দায়—সবকিছু স্পষ্ট চুক্তিতে উল্লেখ থাকতে হবে।
রাশিয়ার লক্ষ্য: বাণিজ্যের চেয়ে বড়
মস্কোর কাছে এই প্রস্তাব শুধু বাংলাদেশের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নয়। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ডলার ও পশ্চিমা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করতে চাইছে। ভারতীয় রুপি, চীনা ইউয়ান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহাম এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় মুদ্রাব্যবস্থা—সবই সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতি রুপিভিত্তিক রাশিয়া-বাণিজ্যে যুক্ত হলে মস্কো দেখাতে পারবে যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তৃতীয় দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বিকল্প অর্থপ্রবাহ তৈরি করা সম্ভব। এটি রাশিয়ার জন্য অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রতীকী সাফল্যও হবে।
একই সঙ্গে রূপপুর প্রকল্প বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শেষ হলেই এই সম্পর্ক শেষ হবে না; জ্বালানি সরবরাহ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং ঋণ পরিশোধের কারণে দুই দেশ বহু বছর পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ফলে একটি স্থায়ী পেমেন্ট ব্যবস্থা মস্কোর জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের করণীয়
বাংলাদেশের জন্য এই প্রস্তাব সরাসরি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের বিষয় নয়; বরং কঠোর শর্তে আলোচনার বিষয়। প্রথমত, রূপপুর ঋণ এবং সাধারণ বাণিজ্যের লেনদেন আলাদা কাঠামোয় রাখা উচিত। দ্বিতীয়ত, রুপি ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করতে হবে, যাতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নতুন অসামঞ্জস্য সৃষ্টি না হয়।
তৃতীয়ত, রাশিয়াকে বাংলাদেশি পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতা বা প্রণোদনার আওতায় আনা যেতে পারে। রুপি পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে তৈরি পোশাক, ওষুধ, পাট, চামড়া ও কৃষিপণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশ বাস্তব বাণিজ্যিক লাভ পাবে।
চতুর্থত, কোনো নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ব্যাংকের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন না করে আইনসম্মত, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যাংকিং চ্যানেল নির্বাচন করতে হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে স্থায়ী তদারকি কাঠামো গড়া উচিত।
পঞ্চমত, ভারতের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করে নিশ্চিত করতে হবে যে রুপি নিষ্পত্তি ব্যবস্থা রাজনৈতিক চাপের অস্ত্র হয়ে উঠবে না। অর্থ আটকে যাওয়া, রুপি রূপান্তর, ব্যাংক ব্যর্থতা বা কূটনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্রে কী হবে, তার আগাম বিধান থাকতে হবে।
শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার প্রস্তাবকে ডলারের পতনের সূচনা হিসেবে দেখা অতিরঞ্জিত হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের গভীরতা, তারল্য ও গ্রহণযোগ্যতার বিকল্প এখনো কোনো একক মুদ্রা তৈরি করতে পারেনি। ভারতীয় রুপিও পূর্ণ রূপান্তরযোগ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা নয়।
তবু এই প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে অর্থনীতি ও কূটনীতি এখন নতুন পথে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ সেই পরিবর্তনের শুধু দর্শক নয়; রূপপুর, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের কারণে দেশটি নিজেই একটি পরীক্ষাগারে পরিণত হচ্ছে।
রুপিভিত্তিক লেনদেন বাংলাদেশের জন্য সাময়িক পেমেন্ট সমস্যার বাস্তব সমাধান হতে পারে। কিন্তু যথাযথ সুরক্ষা ছাড়া সেটি ডলারের নির্ভরতা কমিয়ে ভারতের আর্থিক অবকাঠামোর ওপর নতুন নির্ভরতা তৈরি করতে পারে। তাই সিদ্ধান্তটি মুদ্রা নির্বাচনের চেয়েও বড়—বাংলাদেশ কোন শক্তির সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে, কতটা ঝুঁকি নেবে এবং বহুমুখী কূটনীতির ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখবে, মূল প্রশ্ন সেটিই।
আপনার মতামত জানানঃ