রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত সড়কে এখন এক নতুন দৃশ্য চোখে পড়ছে। লাল বাতি জ্বলে উঠতেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে যানবাহন। মোটরসাইকেল চালকরা স্টপ লাইনের পেছনে থামছেন, অনেকেই হেলমেট ঠিকঠাক পরে নিচ্ছেন, গাড়িচালকরা সিট বেল্ট বেঁধে তবেই গাড়ি চালাচ্ছেন। আগে যেখানে ব্যস্ত মোড়গুলোতে সিগন্যাল অমান্য করা যেন ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক অভ্যাস, সেখানে এখন নিয়ম মানার প্রবণতা দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইচালিত ট্রাফিক ক্যামেরা।
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন নয়, তবে এবার যে পদ্ধতি চালু হয়েছে, সেটি আগের যেকোনো উদ্যোগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও স্বয়ংক্রিয়। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে স্থাপন করা এআইভিত্তিক ক্যামেরা এখন মুহূর্তের মধ্যেই শনাক্ত করতে পারছে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের নানা ঘটনা। লাল বাতি অমান্য করা, জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর গাড়ি থামানো, মোটরসাইকেলে হেলমেট না পরা, গাড়িতে সিট বেল্ট ব্যবহার না করা—সবকিছুই ক্যামেরার চোখ এড়াতে পারছে না। শুধু শনাক্ত করেই থেমে থাকছে না প্রযুক্তি; তাৎক্ষণিকভাবে মামলা প্রক্রিয়াও চালু হয়ে যাচ্ছে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে।
একসময় ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে বিশ্বের অন্যতম বিশৃঙ্খল নগর ব্যবস্থাপনার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। প্রতিদিনের যানজট, নিয়ম না মানার সংস্কৃতি, অতিরিক্ত হর্ন, সিগন্যাল ভাঙা আর বিশৃঙ্খল লেন পরিবর্তনের কারণে নগরবাসীর জীবন হয়ে উঠেছিল ক্লান্তিকর। ট্রাফিক পুলিশকে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করতে হতো। কিন্তু বাস্তবতা ছিল এমন যে, একজন পুলিশ সদস্যের পক্ষে একসঙ্গে সব দিক নজরদারি করা সম্ভব নয়। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে অনেক চালক নিয়ম ভাঙতেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেলচালকদের মধ্যে বেপরোয়া প্রবণতা ছিল বেশি। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়নায় অনেকেই লাল বাতি উপেক্ষা করতেন, উল্টো পথে চলতেন কিংবা জেব্রা ক্রসিং দখল করে দাঁড়াতেন।
এখন সেই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। কারণ মানুষ জানে, মোড়ের ওপরে লাগানো ক্যামেরা শুধু ছবি তুলছে না, তাদের প্রতিটি চলাচল বিশ্লেষণ করছে। এআই প্রযুক্তি নির্দিষ্ট আচরণ শনাক্ত করতে পারছে এবং নিয়ম ভাঙলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংরক্ষণ করছে। ফলে “দেখে কেউ নাই” এই মানসিকতা আর কাজ করছে না। চালকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের মানসিক সতর্কতা।
শাহবাগ মোড়ে প্রতিদিন অফিসগামী হাজারো মানুষের ভিড় জমে। আগে এই এলাকায় সিগন্যাল অমান্য করে গাড়ি পার হওয়া ছিল খুব সাধারণ ঘটনা। এখন সেখানে দাঁড়ালে পরিবর্তনটি সহজেই চোখে পড়ে। লাল বাতি জ্বললে গাড়িগুলো ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে। মোটরসাইকেল চালকেরা সাদা স্টপ লাইনের পেছনে থামছেন। অনেকে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালানো থেকেও বিরত থাকছেন। কারণ তারা জানেন, ক্যামেরা সবকিছুই ধরতে পারে।
পথচারীরাও এই পরিবর্তন ইতিবাচকভাবে দেখছেন। অনেকেই বলছেন, আগে রাস্তা পার হওয়া ছিল এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অভিজ্ঞতা। জেব্রা ক্রসিং থাকলেও গাড়ি থামত না। এখন অন্তত সিগন্যালের সময় মানুষ কিছুটা নিরাপত্তা অনুভব করছেন। বিশেষ করে স্কুল ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, নারী এবং বয়স্ক পথচারীদের জন্য এই শৃঙ্খলা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু আইন প্রয়োগ সহজ করছে না, এটি মানুষের আচরণেও পরিবর্তন আনছে। সামাজিক মনোবিজ্ঞানে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নিয়ম ভাঙলে তাৎক্ষণিক জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে, তখন তার আচরণে স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন আসে। ঢাকার সড়কেও এখন সেই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। অনেক চালক বলছেন, আগে হয়তো মাঝে মাঝে সিগন্যাল ভেঙে চলে যেতেন, কিন্তু এখন ঝুঁকি নিতে চান না। কারণ মামলা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং সেটি প্রমাণসহ সংরক্ষিত হচ্ছে।
বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং সেবার চালকদের মধ্যে পরিবর্তনটি স্পষ্ট। পাঠাও, উবার কিংবা অন্যান্য অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বেপরোয়া চালানোর অভিযোগ ছিল। দ্রুত ট্রিপ শেষ করে আরেকটি রাইড নেওয়ার প্রতিযোগিতায় তারা অনেক সময় ট্রাফিক আইন অমান্য করতেন। কিন্তু এখন অনেক চালকই বলছেন, ক্যামেরার কারণে তারা আরও সতর্ক হয়েছেন। হেলমেট ব্যবহার, নির্ধারিত লেন মেনে চলা এবং সিগন্যাল অনুসরণ করার প্রবণতা বেড়েছে।
শাহবাগ থানার ট্রাফিক ইন্সপেক্টর তারিকুল ইসলাম বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করেছে। তার ভাষায়, আগে কোনো চালক আইন ভেঙে দ্রুত চলে গেলে তাকে শনাক্ত করা কঠিন ছিল। এখন ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই তথ্য ধারণ করছে। ফলে আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা এসেছে এবং মানুষও বুঝতে পারছে যে নিয়ম ভাঙলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআইভিত্তিক এই ব্যবস্থা শুধু মামলা দেওয়ার জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সড়কে নিরাপদ সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হচ্ছে ট্রাফিক আইন অমান্য করা। অতিরিক্ত গতি, সিগন্যাল ভাঙা, হেলমেট না পরা কিংবা বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণহানি ঘটছে। এ অবস্থায় প্রযুক্তি যদি মানুষকে নিয়ম মানতে বাধ্য করতে পারে, তাহলে দুর্ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রেও এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই পরিবর্তনের মাঝেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক চালক এখনও প্রযুক্তিনির্ভর মামলার প্রক্রিয়া পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, ভুল শনাক্তের ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। যদি কোনো ভুল মামলা হয়, তাহলে দ্রুত যাচাই ও সমাধানের কার্যকর পদ্ধতি থাকতে হবে। অন্যথায় মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
এছাড়া শুধু প্রযুক্তি বসালেই সমস্যার সমাধান হবে না—এমন মতও রয়েছে। কারণ ঢাকার ট্রাফিক সংকটের পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক সমস্যা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত যানবাহন, সংকীর্ণ সড়ক, গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং জনসচেতনতার অভাব—সবকিছু মিলিয়েই এই সংকট তৈরি হয়েছে। তাই এআই ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও এটি বৃহত্তর সমাধানের একটি অংশ মাত্র।
তবুও বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন পর রাজধানীর সড়কে নিয়ম মানার দৃশ্য মানুষকে নতুন আশাবাদ দেখাচ্ছে। একসময় যেখানে ট্রাফিক সিগন্যালকে অনেকে গুরুত্বই দিতেন না, সেখানে এখন অনেক চালক স্বেচ্ছায় থেমে যাচ্ছেন। এই পরিবর্তন হয়তো রাতারাতি পুরো শহর বদলে দেবে না, কিন্তু এটি একটি নতুন সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে—যেখানে আইন মানা হবে ভয়ের কারণে নয়, অভ্যাসের অংশ হিসেবে।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠছে। বিশ্বের অনেক বড় শহর ইতোমধ্যেই স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেমের মাধ্যমে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশও এখন সেই পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এআইচালিত ক্যামেরা যদি কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, ট্রাফিক বিশ্লেষণ, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধেও এটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করতে পারবে।
রাজধানীর মানুষও এখন পরিবর্তনটি অনুভব করছেন। কেউ বলছেন, রাস্তায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরছে। কেউ বলছেন, অন্তত এখন সবাই একটু ভয় পাচ্ছে বলে নিয়ম মানছে। আবার কেউ এটিকে আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। সব মতের মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট—ঢাকার সড়কে প্রযুক্তির উপস্থিতি মানুষের আচরণ বদলাতে শুরু করেছে।
এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত রাজধানীর ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়ালে নতুন এক বাস্তবতা চোখে পড়ে—লাল বাতিতে থেমে থাকা গাড়ির সারি, হেলমেট পরে অপেক্ষা করা মোটরসাইকেল চালক, আর মাথার ওপরে নীরবে কাজ করে যাওয়া এআই ক্যামেরা। প্রযুক্তি যেন ধীরে ধীরে শিখিয়ে দিচ্ছে, নিয়ম মানা শুধু আইনের বিষয় নয়, এটি নগর সভ্যতারও অংশ।
আপনার মতামত জানানঃ