ইউরোপের প্রথম দিকের আধুনিক মানুষের চেহারা কেমন ছিল—এই প্রশ্নটি বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানী, নৃতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। অবশেষে সেই রহস্যের কিছুটা পর্দা উঠতে শুরু করেছে। সম্প্রতি চেক প্রজাতন্ত্রে পাওয়া প্রায় ৪৫ হাজার বছর পুরোনো এক নারীর খুলির ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা এমন একটি মুখাবয়ব পুনর্গঠন করেছেন, যা ইউরোপে বসবাসকারী প্রথম আধুনিক মানুষের সম্ভাব্য চেহারার ধারণা দেয়। এই নারীর পরিচয় “জ্লাতি কুন” বা সংক্ষেপে “জেডকে” নামে। গবেষকদের মতে, তিনি এমন এক সময়ে জীবিত ছিলেন, যখন আধুনিক মানুষ আফ্রিকা ছেড়ে ইউরোপে প্রবেশ করছিল এবং নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে তাদের মিলন সদ্য ঘটেছিল।
১৯৫০ সালে আবিষ্কৃত এই খুলিটি বর্তমানে প্রাগের ন্যাশনাল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। এত পুরোনো জীবাশ্ম হওয়া সত্ত্বেও এটি আশ্চর্যজনকভাবে ভালো অবস্থায় ছিল। ফলে বিজ্ঞানীরা শুধু হাড়ের গঠন নয়, মুখের সম্ভাব্য পেশি, ত্বক ও নরম টিস্যুর বিন্যাসও বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন। এই বিশেষ সংরক্ষিত অবস্থাই গবেষকদের নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে—৪৫ হাজার বছর আগে ইউরোপে থাকা মানুষদের চেহারা আদতে কেমন ছিল?
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা তিনটি ভিন্ন পদ্ধতিতে মুখমণ্ডলের পুনর্গঠন করেন। প্রথম পদ্ধতিতে খুলির ওপর আধুনিক মানুষের পরিচিত নরম টিস্যুর গড় পুরুত্ব ও মুখের পেশির অবস্থান বসিয়ে একটি সম্ভাব্য মুখ তৈরি করা হয়। এটিকে “মডেল এ” বলা হয়েছে। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে বিখ্যাত প্যালিওআর্টিস্ট ও ভাস্কর এলিজাবেথ দায়নেস গবেষণার তথ্য ব্যবহার করে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত হাতে তৈরি একটি মুখের প্রতিরূপ নির্মাণ করেন, যা “মডেল বি” নামে পরিচিত। তৃতীয় পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। খুলির ওপর ৭৮টি অ্যানাটমিক্যাল পয়েন্ট নির্ধারণ করে ভার্চুয়াল প্রযুক্তির মাধ্যমে আরেকটি মুখ তৈরি করা হয়, যাকে বলা হয়েছে “মডেল সি”।
তিনটি মডেলের মধ্যে প্রথম দুটি বেশ মিল দেখায়। সেখানে দেখা যায় নারীর নাক ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট কিন্তু চওড়া, নাকের হাড়ের অংশ প্রশস্ত এবং মুখও ছিল বিস্তৃত। অন্যদিকে তৃতীয় মডেলে কপাল কিছুটা উঁচু, নাক তুলনামূলক সরু এবং চিবুক বেশি সূচালো দেখা যায়। ফলে সেই মুখটি কিছুটা ত্রিভুজাকৃতির বলে মনে হয়। এই পার্থক্যগুলো বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করেছে যে, প্রাচীন মানুষের মুখ পুনর্গঠন পুরোপুরি নির্ভুল বিজ্ঞান নয়; বরং এটি অ্যানাটমি, জেনেটিক্স ও শিল্পকলার সম্মিলিত এক প্রচেষ্টা।
গবেষণার আরও আকর্ষণীয় অংশ ছিল আধুনিক মানুষের সঙ্গে তুলনা। বিজ্ঞানীরা এই পুনর্গঠিত মুখের গঠন আধুনিক চেক এবং ক্যামেরুনের নারীদের মুখাবয়বের সঙ্গে তুলনা করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রথম দুটি মডেল আধুনিক ক্যামেরুনিয়ান নারীদের মুখের বৈচিত্র্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। অর্থাৎ ইউরোপে বসবাসকারী প্রথম আধুনিক মানুষের মুখাবয়বে তখনও আফ্রিকান বৈশিষ্ট্যের শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল। তৃতীয় মডেলটি তুলনামূলকভাবে বর্তমান ইউরোপীয় মুখাবয়বের দিকে কিছুটা ঝুঁকে ছিল।
জেনেটিক বিশ্লেষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য সামনে এনেছে। গবেষকদের মতে, এই নারীর গায়ের রং সম্ভবত ছিল গাঢ়, চুল কালো এবং চোখও গাঢ় রঙের। বর্তমানে ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে ফর্সা ত্বক বেশি দেখা যায়, তা তখনও বিকশিত হয়নি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ইউরোপের কম সূর্যালোকপূর্ণ পরিবেশে দীর্ঘ সময় বসবাসের ফলে ধীরে ধীরে হালকা ত্বকের বিবর্তন ঘটে। কারণ কম সূর্যালোকে ভিটামিন ডি উৎপাদনের জন্য হালকা ত্বক বেশি কার্যকর ছিল। অর্থাৎ ইউরোপের প্রথম মানুষদের চেহারা আজকের ইউরোপীয়দের মতো ছিল না; বরং তারা আফ্রিকান পূর্বপুরুষদের অনেক বৈশিষ্ট্য বহন করত।
গবেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, চওড়া নাক ও প্রশস্ত মুখ উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার জন্য উপযোগী বৈশিষ্ট্য। আফ্রিকার উষ্ণ পরিবেশে এই ধরনের মুখাবয়ব শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ছিল। তাই জ্লাতি কুন নারীর মুখে এসব বৈশিষ্ট্য পাওয়া তার আফ্রিকান উৎসের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের প্রমাণ বহন করে।
তবে এই গবেষণার সবচেয়ে রহস্যময় দিক হলো নিয়ান্ডারথাল সংযোগ। জেনেটিক তথ্য বলছে, এই নারী এমন এক সময়ে বেঁচে ছিলেন, যখন আধুনিক মানুষ ও নিয়ান্ডারথালদের প্রধান আন্তঃপ্রজননের ঘটনা ঘটার মাত্র ৮০ প্রজন্ম পেরিয়েছিল। অর্থাৎ তার শরীরে নিয়ান্ডারথাল ডিএনএর উপস্থিতি ছিল খুব কাছের অতীতের স্মৃতি। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শরীরে সামান্য পরিমাণ নিয়ান্ডারথাল ডিএনএ রয়েছে, যা মুখের গঠন, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এমনকি কিছু আচরণগত বৈশিষ্ট্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু জ্লাতি কুন জনগোষ্ঠী ছিল এক ধরনের “সাইড ব্রাঞ্চ”—অর্থাৎ মানব বিবর্তনের এমন একটি শাখা, যাদের জিন আধুনিক মানুষের মধ্যে টিকে থাকেনি। ফলে তাদের সঠিক চেহারা ও বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি বোঝা এখনো কঠিন।
এই গবেষণা শুধু একটি মুখের পুনর্গঠন নয়; বরং মানব ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া এক অধ্যায়ের দরজা খুলে দিয়েছে। বহু বছর ধরে ইউরোপের প্রাচীন মানুষের চেহারা নিয়ে যে ধারণা প্রচলিত ছিল, এই আবিষ্কার তা নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। অনেকেই মনে করতেন, ইউরোপে প্রথম আসা মানুষদের চেহারা আজকের ইউরোপীয়দের মতোই ছিল। কিন্তু এই গবেষণা বলছে, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ইউরোপের প্রথম আধুনিক মানুষদের মুখাবয়বে আফ্রিকার স্পষ্ট ছাপ ছিল, এবং তারা ছিল বৈশ্বিক মানব অভিবাসনের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের অংশ।
এই ধরনের মুখ পুনর্গঠন প্রযুক্তি এখন দ্রুত উন্নত হচ্ছে। আগে বিজ্ঞানীরা শুধু হাড়ের গঠন দেখে ধারণা করতেন, কিন্তু এখন জেনেটিক বিশ্লেষণ, ডিজিটাল স্ক্যানিং, থ্রিডি মডেলিং এবং ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজির সমন্বয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ফল পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি ভবিষ্যতে হয়তো আমরা শুধু মুখ নয়, কণ্ঠস্বর, ত্বকের টেক্সচার কিংবা চলাফেরার ধরন সম্পর্কেও ধারণা পেতে পারি।
মানব সভ্যতার ইতিহাস আসলে ক্রমাগত যাত্রা, অভিযোজন ও মিশ্রণের ইতিহাস। আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে আসা আধুনিক মানুষ যখন ইউরোপে পৌঁছায়, তখন তারা নতুন পরিবেশ, নতুন আবহাওয়া এবং নিয়ান্ডারথালদের মতো ভিন্ন মানবপ্রজাতির মুখোমুখি হয়। সেই সংঘর্ষ, সহাবস্থান ও মিশ্রণের ফলই আজকের মানবজাতি। জ্লাতি কুন নারীর মুখ সেই অতীতেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের ইতিহাস কোনো একক জাতি বা অঞ্চলের নয়; এটি পুরো মানবজাতির সম্মিলিত বিবর্তনের গল্প।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক জার্নাল “npj Heritage Science”-এ। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে আরও পুরোনো জীবাশ্ম ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে মানবজাতির অতীত সম্পর্কে আরও বিস্ময়কর তথ্য জানা যাবে। আর সেইসব আবিষ্কার হয়তো আমাদের নিজেদের পরিচয়, শিকড় ও বিবর্তন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।
আপনার মতামত জানানঃ